ইসরাইলে ইসলামি দলের উত্থান : কী হতে চলেছে?


সাইফুল খান | 

সম্প্রতি ইসরাইলে একটি ইসলামি দলের উত্থান নিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় বেশ হইচই পড়ে গেছে। খোদ ইসরাইলি ভূখণ্ডে একটি কনজারভেটিভ ইসলামিক পলিটিকাল মুভমেন্টকে লিবারেল ইসলামিস্ট, ওয়েস্টার্ন থিংকট্যাঙ্ক প্রায় সমান্তরাল চোখে দেখছে ও বিশ্লেষণ করছে। শুধুমাত্র চরমপন্থী ইসরাইলি ও তাদের সমমনারা এর বিরোধিতা করছে। মজার ব্যাপার হলো, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এদিক থেকে ব্যতিক্রম। তবে তা রাজনৈতিক স্বার্থে। যদিও তাদের অ্যান্টি ইসলামিক এক্সট্রিমিজম পরীক্ষিত।

ইসলামিক পার্টিটির হিব্রু নাম রেশিমা আরাভি এমেউলেদেত (HaReshima Haravit Hameuledet) সংক্ষেপে রাম (Raam). আরবি নাম কাইমা আল আরাবিয়্যা আল মুওয়াহাদ্দা (Qaima Al-Arabiyya Al-Muwahadda)।

রাম পার্টির প্রতিষ্ঠা ১৯৯৬ সালে। দলটির প্রধান নেতা মানসুর আব্বাস। তিনি নিজেকে ইসরাইলি আরব হিসেবেই পরিচয় দেন। এই রাম পার্টি এর আগে নেসেট নির্বাচনে ১৯৯৯ সালে ৫টি আসন পেয়েছিল। ইসরাইলের ভেতরে এখনো প্রায় ২০ ভাগ ফিলিস্তিনি আরব বসবাস করে। এদের মধ্যে বেদুইন

মুসলিম, খ্রিস্টান, দ্রুজ জাতি অন্যতম। তখন এই রাম পার্টিকে নিয়ে তেমন হইচই হয়নি। কিন্তু ইসরাইলের শেষ নির্বাচনেও আগের চারবারের মতো কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। নেসেটের ১২০ আসনের মধ্যে ৬১ আসন লাগে সরকার গঠন করতে। কিন্তু সর্বোচ্চ ৩৭ আসন পেয়েছে লিকুদ পার্টি। কোয়ালিশন এমন একপর্যায়ে পৌছেছে যে রাম পার্টি তার চার আসন নিয়ে যেদিকে যাবে তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে এবং সরকার গঠন করবে। এজন্য বিশ্বমিডিয়া মানসুর আব্বাসের রাম পার্টিকে কিংমেকারও বলছে। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি লিকুদ পার্টির সাথে শর্ত সাপেক্ষে, দেনদরবারের মাধ্যমে কোয়ালিশন গড়বেন।

মিডিয়া এই রাম পার্টিকে হামাসের সাথে তুলনা করছে এবং ইসরাইলের অভ্যন্তরে মুসলিমদের একধরনের বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে বিভিন্ন বিশ্লেষণী প্রতিবেদন পড়লে তাই মনে হবে।

আমি এই এই বিষয়ে লেখার আগে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবর ও আর্টিকেল পড়েছি যা ফ্রান্স, ব্রিটিশ, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক। তাদের প্রত্যেকেরই বয়ানের পাটাতন প্রায় অভিন্ন। এগুলো হচ্ছে Al jazeera, Times of Israel, France24.com, Jewidhvirtuallibrary.org, BBC, CNN.

তাই আরেকটু নিশ্চিত হতে আমি যোগোযোগ করলাম আকরাম আবু মাদির সাথে। আকরাম আবু মাদি ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের হেবরনের বাসিন্দা। আমার সাথে তার পরিচয় অনলাইনে কয়েক বছর আগে। তাকে আমি প্রশ্ন করলাম, মোটামুটি আলাপ হলো। পরিশেষে তিনি এই পার্টির জন্য একটা বিশেষ বিশেষণ ব্যবহার করলেন। সেটা হচ্ছে ইসলামিক জায়োনিস্ট।

রাম পার্টিকে আরো গভীরভাবে পড়তে গিয়ে দেখলাম তারা তাদের আইডোলজিতে প্রায় সাতটি পয়েন্ট তুলে ধরেছেন। যার কিছু পয়েন্ট তাওহিদের জায়গা থেকে পরস্পর বিরোধী। যেহেতু ইসলামের কোনো লিবারেল ফর্ম নেই।

তাদের পয়েন্টগুলো হচ্ছে-

১. কনজারভেটিজম

২. ইসরাইলি-আরব ইন্টারেস্ট

৩. টু স্টেইট সলুশ্যন

৪. এন্টি জায়োনিজম

৫. ইসলামিজম

৬. সোশ্যাল কনজারভেটিজম

৭. অ্যান্টি এলজিবিটি

নিচে থেকে আলাপ শুরু করলে এলজিবিটিকে (Lesbian, Gay, Bisexual,Transgender) পৃথিবীর কোনো আহলে কিতাব সমর্থন করে না। এমনকি তাওরাতের ওল্ড, নিউ কোনো টেস্টামেন্টই এটাকে সমর্থন করে না।

এক্ষেত্রে অ্যান্টি জায়োনিস্ট ইহুদি খ্রিস্টানরাও মুসলিমদের মতই কঠোর। তবে জায়োনিস্টরা এটাকে সমর্থন ও অর্থায়ন দুটিই করে। সোশ্যাল কনজারভেটিজম আর কনজারভেটিজমের মূলত তেমন পার্থক্য নেই। এখানে ট্র্যাডিশন, কাস্টমস, রিচুয়ালের বিষয়গুলো আসে। যা খুঁজলে তাদের জীবনে বহু অনৈসলামিক ট্র্যাডিশন পাওয়া যাবে। এন্টিজায়োনিজম, ইসলামিজম, ইসরাইলি-আরব ইন্টারেস্ট, টুস্টেইট সলুশ্যন এই চারটির মধ্যেই কনফ্লিক্ট। কুরআন ও তাওরাত বলছে, ইহুদিদের কোনো স্থায়ী রাষ্ট্র হবে না। এই বিশ্বাসে অনেক অ্যান্টি জায়োনিস্ট ইহুদিও ইসরাইলবিরোধী আন্দোলন করে, ইসরাইলের পতাকা পোড়ায়। এদের একটা সংস্থাও আছে নাম - IJAN (International Jewish anti-Zionist Network) তারা ইসরাইলের পতাকায় আগুন ধরিয়ে স্লোগান দেয়।

অতএব ইসরাইল নামক রাষ্ট্র এবং জাতীয়তাবাদ মেনে নিয়ে ইসলামিজম প্রতিষ্ঠা, অ্যান্টি জায়োনিস্ট হওয়া অবান্তর। রাম পার্টির মাধ্যমে ইসরাইল তাদের অপকর্মগুলোকে ইনস্টিটিউশনালী বৈধতা দেয়াতে পারবে। মিডলইস্ট রেজিমের শেখদের সাথে ইসরাইলের দরকষাকষিতে মধ্যস্থতায় ভালো ভূমিকা নিতে পারবে। নেসেটে নির্বাচন, ইসরাইলি জাতীয়তাবাদ মেনে রাজনীতি করা, নেতানেয়াহুর সাথে মিলেমিশে সরকার গঠন করার অর্থ দাঁড়ায় অতীতের সমস্ত আগ্রাসন ও সন্ত্রাসের বৈধতা দেয়া। এটা কখনোই সম্ভব না কোনো গর্বিত ইসরাইলি মুসলিম গাজাবাসীর রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ইসরাইলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করবেন।

জাগো প্রহরী/এফজে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য