সিনহা হত্যা: দায়ী পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তারের দাবি সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের


জাগো প্রহরী : অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহতের ঘটনায় দায়ী সব পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তারের দাবি তুলেছেন সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারা।

বুধবার (৫ আগস্ট) ঢাকায় রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (রাওয়া) এক সংবাদ সম্মেলন থেকে এই দাবি জানানো হয়।

পুলিশের গুলিতে সিনহার মৃত্যু নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে বুধবার কক্সবাজারে বিরল এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদের দুই বাহিনীর পরস্পরের প্রতি আস্থা রাখার ঘোষণা দেওয়ার মধ্যে রাওয়ার এই সংবাদ সম্মেলন হয়।

সিনহা ‘হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন’ দাবি করে রাওয়ার চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর খন্দকার নুরুল আফসার কক্সবাজারের পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহারের দাবি জানান।

তিনি বলেন, “ওসি প্রদীপকে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে প্রেরণসহ এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সকল আসামিকে গ্রেপ্তার করতে হবে।”

গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সিনহা। তিনি ‘তল্লাশিতে বাধা দিয়েছিলেন’ বলে পুলিশের ভাষ্য। তবে পুলিশের এই ভাষ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছ।

সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস বাদী হয়ে বুধবার টেকনাফের হাকিম আদালতে বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলি এবং টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাসসহ মোট নয় পুলিশ সদস্যকে আসামি করে মামলা করেছেন।

সিনহা একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের উদ্দেশ্যে কক্সবাজার গিয়েছিলেন। ঘটনার সময় তার সঙ্গী সিফাতকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র আইনে মামলাও করেছে পুলিশ।

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা গুলি করতে উদ্যত হলে এসআই লিয়াকত আলি গুলি ছুড়েছিলেন বলে পুলিশ যে বক্তব্য দিয়েছে, তা উড়িয়ে দেন রাওয়া চেয়ারম্যান আফসার।

তিনি বলেন, এএসএফ রিক্রুট করতে হলে তাকে ১০টি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। এরপরেও আরও তিন স্তরের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই কেবল এসএসএফে যোগদানের অনুমতি মেলে। এসব পরীক্ষার মধ্যে তার ৫ সেকেন্ডে ৮টি গুলি করার দক্ষতা আছে।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা অনুযায়ী সিনহা দুই হাত উঁচু করে সারেন্ডার করেছিল জানিয়ে সাবেক সেনা কর্মকর্তা আফসার বলেন, “তাকে ধরে বেঁধে ফটাফট গুলি করে দিয়েছে।”

সংবাদ সম্মেলনে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের সাবেক প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) ও চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) মো. মইনুল ইসলাম বলেন, “ক্রসফায়ার এবং গুম এ জিনিসটা আমরা এ সমাজে দেখছি বেশ দীর্ঘকাল যাবৎ চলে আসছে।

“মাঝে মাঝে এ নিয়ে ফায়দা লুটছে অন্যান্য কেউ। কেউ ব্যাক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য আবার অন্য কারও স্বার্থ হাসিলের এটা করা হচ্ছে। এটা নিয়ে বাণিজ্যও হচ্ছে। আমার মনে হয় ওই একটা যে অভ্যাস যা দাঁড়িয়ে আছে দীর্ঘদিন যাবৎ, এটা কেউ না করছে না। আস্পর্ধা তারা পেয়েই যাচ্ছে।”

বিজিবির সাবেক মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মইনুল মনে করেন, কক্সবাজারে কিছু ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ জন্ম হয়েছে, তারাই সিনহাকে হত্যা করেছে।

অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বেড়েই চলেছে। এই একটি ঘটনার বিচার দ্রুত নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এটা কিছুটা হলেও ঠেকানো যাবে।

রাওয়া চেয়ারম্যান আফসার ঘটনার সাক্ষী সিফাতের বিরুদ্ধে ‘কাল্পনিক’ ও ‘বানোয়াট’ মামলা দায়েরে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। আগামী তিন মাসের মধ্যে সিনহা হত্যাকাণ্ডের বিচার করে দোষিদের ফাঁসি কার্যকরের দাবিও জানান তিনি।

“সকল সাক্ষীর দীর্ঘ মেয়াদী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সাক্ষীদের পরিচিত বা আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমেও যেন কোনো চাপ সৃষ্টি না করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।”

সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পরেও সিনহার শরীরে সামরিক পোশাক থাকার যে কথা বলা হচ্ছে, সে বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে রাওয়ার চেয়ারম্যান বলেন, “সিনহার শরীরে ছোপ ছোপ গেঞ্জি পরা হান্টিং ড্রেস ছিল। হান্টিং বুট পরা ছিল। হান্টিং বুট আর হান্টিং ড্রেস সামরিক পোশাক নয়।”
সিনহার মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরুর পাশাপাশি ২০ পুলিশ সদস্যকে ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। সিনহার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রাওয়া চেয়ারম্যান বলেন, “প্রধানমন্ত্রী, যিনি সরকার প্রধান এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালেয়ে দায়িত্বে আছেন। তিনি সার্বিক বিষয়গুলোতে অবহিত আছেন এবং যথাযথ দিক-নির্দেশনা দিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার সম্পন্ন করে সশস্ত্রবাহিনীর সকল সদস্যদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ বন্ধ করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনবেন বলে আশা করছি।”

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেউ যেন কোনো ‘রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি’ বাস্তবায়ন করতে না পারে, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সশস্ত্রবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের নিরাপদ ও মর্যাদাসম্পন্ন জীবনযাপনের সার্বিক সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য ভিন্ন মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।

“আমাদের আমৃত্যু সম্মান ও সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চিত করার দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে,” বলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর আফসার।

পুলিশকে সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসাবে গড়ে তুলতে সংবিধান অনুযায়ী ‘জবাবদিহিমূলক আইন’ প্রণয়ন করে বাহিনীটিতে পুনর্গঠনের আহ্বান জানান তিনি।

রাওয়ার হেলমেট হলে এই সংবাদ সম্মেলনে এই দাবিগুলো উত্থাপন করে রাওয়া চেয়ারম্যান বলেন, দাবি-দাওয়া পূরণ না হলে ‘প্রয়োজন অনুযায়ী’ যে কোনো ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলবেন তারা।

প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করায় এবং সেনাপ্রধান বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ায় সংবাদ সম্মেলনে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।

“তবে এরপরেও যদি বাস্তবায়ন না হয়, আশা পূরণ না হয়, এরপর আমরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হব,” বলেন আফসার।

“আমরা ডিসিপ্লিনড ফোর্স। ইচ্ছা করলেই রাস্তায় নেমে উচ্ছৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করতে পারি না। আশা করি, সরকার বুঝতে পেরে দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন। আর ঠিকমতো কাজ হলে রাস্তায় নামার প্রশ্ন আসে না।”

জাগো প্রহরী/ফাইয়াজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য