‘দিরিলিস আরতুগ্রুল’ দেখা কোনোভাবেই জায়েজ নয় : মামুনুল হক


জাগো প্রহরী : তুরস্কে নির্মিত বিশ্বে আলোচিত টিভি সিরিজ ‘দিরিলিস আরতুগ্রুল’ বা যে কোন ধরণের নাটক বা টিভি সিরিজ দেখা ইসলামী শরিয়ত অনুসারে জায়েজ হবে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার শাইখুল হাদিস মুফতি মামুনুল হক।

ফেসবুকে মাওলানা মামুনুল হকের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ‘জীবন ঘনিষ্ট’ বিভিন্ন প্রশ্নোত্তর পর্বের লাইভ প্রোগ্রামে তিনি একজনের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ উত্তর দেন।

তিনি বলেন – এ ধরণের টিভি সিরিয়ালগুলোতে যেভাবে নারীদের বেপর্দাভাবে উপস্থাপন করা হয় এবং বিভিন্নভাবে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করাসহ ইসলামী শরিয়ত কোনোভাবেই সমর্থন করে না এমন কাজ করা হয় তাতে এগুলো দেখার কোনো বৈধতা ইসলামে নেই।

দিরিলিস আরতুগ্রুল নিয়ে দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া :

বিশ্ববিখ্যাত ইসলামি বিদ্যাপিঠ দারুল উলুম দেওবন্দের অনলাইন ফতোয়া বিভাগে জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছেন, দিরিলিস আরতুগ্রুল দেখা জায়েজ আছে কিনা। ‘মিডিয়া বিপ্লবের এ যুগে ক্রমশই বাড়ছে নাটক-সিনেমা আসক্তি। তাই নাটক-সিনেমা আসক্ত এ প্রজন্মের জন্য তুরস্কে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামি ইতিহাস নির্ভর দিরিলিস আরতুগ্রুল নামে একটি টিভি সিরিয়াল নির্মাণ করা হয়েছে।

২০১৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৯ এর মে পর্যন্ত তুরস্কের সরকারি টেলিভিশনে ধারাবাহিকভাবে সম্প্রচারিত হয়। ১৫০ ভলিউমের এ ধারাবাহিকটির প্রতিটি পর্বের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় দু’ঘণ্টা করে। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগানো এ সিরিজটির প্রতি বিশেষভাবে ঝুকতে দেখা গেছে মুসলিম তরুণদের। সাধারণের পাশাপাশি মুসলিম সেলিব্রেটিরাও এ সিরিয়ালে আসক্ত।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘সিরিয়ালে দর্শকের মনে রঙ ছড়াতে প্রেম-ভালোবাসার চিত্রনাট্য ছাড়াও বেগানা মেয়েদেরও দেখানো হয়েছে। অপরদিকে প্রায় প্রতিটি ভলিউমে দোয়া, নামাজসহ ইসলামি বিভিন্ন সংস্কৃতিও তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান ছাড়াও তুরস্কের বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা রয়েছেন এর পৃষ্ঠপোষকতায়। বর্তমানে এর প্রতি মানুষের মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি দেখে ইউটিউব ঘেঁটে ও মানুষের মুখে শুনে এ ব্যাপারে শরয়ি বিধান জানতে চাই। মদের পরিবর্তে যেভাবে অন্যান্য পানীয় পান করা জায়েজ, অশ্লীলতায় ভরপুর অন্যান্য ফিল্মের বিপরীতে এ সিরিয়াল বৈধতা পাওয়ার কোন সুরত আছে কি?’

দারুল উলুম দেওবন্দের জবাব

‘নাটক অথবা ফিল্ম যাই বলিনা কেন, তাতে ভিডিওগ্রাফী, নাচ-গান ও বেগানা নারীদের উপস্থিতি বিদ্যমান। যার সবই শরিয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ। ছবি নির্মাতাদের ব্যাপারে হাদিসের স্পষ্ট ভাষ্য- ছবি নির্মাতাদের কিয়ামতের দিন প্রচণ্ড শাস্তি দেয়া হবে। এবং সে যা তৈরি করেছে তাকে জীবন দিতে বলা হবে। (সহিহ বুখারি, ছবি নির্মাণকারীদের শাস্তি সম্পর্কিত হাদিস :৫৯৫)

মিউজিকের ব্যাপারে নবুয়তের পাক জবানে উচ্চারিত হয়েছে ‘আল্লাহ তায়ালা আমাকে পৃথিবীবাসীর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। এবং অনর্থক কাজ, খেলাধুলা ও গান-বাজনার সরঞ্জামাদি ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছেন।’ (মিশকাত শরিফ, শাস্তি ও মদ সম্পর্কিত হাদীস, তৃতীয় অধ্যায়)

বেগানা নারীদের সাথে পর্দার ব্যাপারে হাদিসে যা বর্ণিত হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মুসলিম শাসকদের জীবনীনির্ভর নাটক ও সিরিয়ালের আরেকটা ক্ষতির দিক হল অনেকেই এসব সিরিয়াল দেখাকে গুনাহ মনে করেন না; অথবা কেউ কেউ এই গুনাহকে হালকা মনে করেন। আর গুনাহকে গুনাহ মনে না করা বা হালকা মনে করা কবিরা গুনাহ। এছাড়াও ধারাবাহিক সিরিয়াল দেখতে গিয়ে সময়ের অপচয়, নামাজ কাযা হওয়াসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে অমনোযোগী হওয়ার সমূহ সম্ভবনা থাকে। যা সব অনিষ্ঠ ও অশান্তির মূল বলেই বিবেচিত। কোন বৈধ খেলাধুলার প্রতি আসক্তি ফরজ, ওয়াজিব পালনে অলসতা সৃষ্টি করলে তাও নাজায়েজ বলে গণ্য হয়। আর ইতিহাসনির্ভর সিরিয়ালগুলোতে দর্শক চাহিদা বাড়াতে অনেক ক্ষেত্রে ইতিহাসের প্রধান চরিত্রগুলোর ব্যাপারে মিথ্যার আশ্রয় নেয়ার সম্ভবনা থাকে।

এককথায় প্রশ্নে উল্লেখিত সিরিয়ালগুলোতে ভিডিও, মিউজিকসহ নারীর অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকায় তা দেখা নাজায়েজ। গুনাহকে হালকা মনে করে তা দেখা, ফরজ ওয়াজিব পালনে উদাসীনতাসহ অন্যান্য গুনাহে লিপ্ত হওয়ার সম্ভবনা থাকায় তা হারাম। আপনার শেষ কথার প্রেক্ষিতে নিবেদন, এ সিরিয়ালগুলো অশ্লীল সিনেমা থেকে বাঁচার মাধ্যম হতে পারে না। কারণ এই সিরিয়াল নিজেই শরিয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ। বলা যায়, দুটোতেই বিষ মেশানো একটাতে একটু কম আরেকটাতে বেশি। তাই দুটো থেকেই বেঁচে থাকার চিন্তা করা অবশ্যক। আর এ থেকে বাঁচা মানুষের ইচ্ছা শক্তির উপরই নির্ভর করে। অবৈধ পন্থা অবলম্বনের কোন প্রয়োজন নেই।’

প্রসঙ্গত : বিশ্বব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয় দিরিলিস: আরতুগ্রুল (তুর্কী: Diriliş: Ertuğrul দিরিলিস: এরতুগ্রুল বা পুনরুত্থান: এরতুগ্রুল) হল মেহমেত বোজদাগ ও কেমাল তেকদেন কর্তৃক নির্মিত একটি তুর্কি ঐতিহাসিক অ্যাডভেঞ্চার টেলিভিশন ধারাবাহিক নাটক, যার নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন এনজিন আলতান দোজায়তান।

ইস্তাম্বুলের বেয়কোয জেলার রিভা গ্রামে এর চিত্রধারণ করা হয়। ২০১৪-এর ১০ই ডিসেম্বর তুরস্কের টিআরটি ১ টেলিভিশনে প্রথম সম্প্রচারিত হয়। ২০১৬ এর ১৪ই নভেম্বর থেকে বাংলাদেশের একুশে টেলিভিশনে সিরিজটির বাংলা সম্প্রচার শুরু হয় “সীমান্তের সুলতান” নামে এবং একই বছর ২৩শে ডিসেম্বর এর সম্প্রচার স্থগিত করা হয়।

পরবর্তীতে বাংলাদেশের মাছরাঙা টিভিতে ২ এপ্রিল ২০১৭ থেকে “দিরিলিস আরতুগ্রুল” নামে পূনরায় এর সম্প্রচার শুরু হয়। ওঘুজ তুর্কিদের ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে এটি নির্মিত হয়েছে, যা ১৩ শতাব্দীর মধ্যভাগে উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম উসমানের পিতা এরতুগরুল গাজীর জীবনকে তুলে ধরে। উসমানের জীবদ্দশায় এই সময়কালের প্রাধান্য অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হলেও এই সময়কালই তার মৃত্যুর পর পরবর্তী ছয় শতাব্দীর জন্য উসমানের রাজবংশের অধীনে একটি বিশ্বময় সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পথকে প্রশস্ত করেছিল।

জাগো প্রহরী/গালিব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য