তালেবানের নিরঙ্কুশ বিজয় কেন চায় না পাকিস্তান?


সালমান রাফি শেখ  |    

সময়টা যদি নব্বইয়ের দশক হতো, তাহলে পাকিস্তান ‘তালেবান আধিপত্যের’ আফগানিস্তান চায় বলে যে যুক্তি দেয়া হচ্ছে, তাতে হয়তো কিছু সারবস্তু থাকতো। ২০২০ সালে বসে এ ধরনের কথা বলার অর্থ হলো পাকিস্তানের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে অতিরঞ্জিত করার পাশাপাশি আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা ও সেখানে ইরান, চীন ও রাশিয়ার মতো বেশ কিছু আঞ্চলিক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বুঝতেও ব্যর্থ হওয়া।

সেটা শুধু এই পরিস্থিতিটাকে সুনির্দিষ্টভাবে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানোর ব্যাপারে পাকিস্তানের সক্ষমতাকেই সীমিত করে দেবে না, একই সাথে তালেবানদের রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনাকেও কমিয়ে দেবে, যেমনটা নব্বইয়ের দশকে হয়েছিল।

ভারতীয় মিডিয়াসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মিডিয়া সম্প্রতি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে যে, ‘পাকিস্তানী জিহাদী যোদ্ধারা’, বিশেষ করে যারা (নিষিদ্ধ ঘোষিত) সংগঠন লস্করে তৈয়বা ও জয়শে মোহাম্মদের সাথে জড়িত, তারা আফগানিস্তানে তালেবানদের সাথে মিলে লড়াই করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ‘আত্মসমর্পণের’ জন্য চাপ দিচ্ছে, যাতে তারা দেশটাকে তাদের হাতে ছেড়ে দিয়ে যায়। রিপোর্টগুলোতে বলা হয়েছে যে, তালেবানদের পক্ষে সামগ্রিক সামরিক বিজয় অর্জনের জন্য এটা হলো পাকিস্তানের পরিকল্পনা। 

তবে, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: পাকিস্তান কি একটা পুরোপুরি তালেবান বিজয় চায়? বেশ কিছু কারণ আছে, যেগুলো দিয়ে বোঝা যায় যে, পাকিস্তান সেটা চায় না। 

পাকিস্তান যদিও আফগান প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি জড়িত, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য দুই দশকের পুরনো যুদ্ধের ইতি টানা বা আফগানিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির বিনিময়ে তালেবানদেরকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা নয়। উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধ ও শান্তি চুক্তির বৃহৎ প্রেক্ষাপটকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা। 

ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কের অবনতি হওয়ার কারণে ইসলামাবাদের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভালো সম্পর্কের সুবিধা অনেক। আফগান যুদ্ধের ব্যাপারে একটা ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানে সাহায্য করার কারণে পাকিস্তানের উপর থেকে এফএটিএফের মানি-লণ্ডারিং ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের অভিযোগই শুধু সরে যায়নি, একইসাথে এটা পাকিস্তানকে দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহযোগিতাগুলো পুনর্বহালের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছে, ২০১৮ সাল থেকে যেগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। 

আসলে, শুধু সাহায্য বা সহযোগিতার বিষয়টিই এখানে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। পাকিস্তানের মতো একটি দেশ, যেটা মহামারীর দ্বারা মারাত্মকভাবে আক্রান্ত এবং যেখানে অর্থনীতির অবস্থা আগে থেকেই নড়বড়ে, সেখানে নিজেকে অক্ষত রাখা এবং বিদ্যমান বাণিজ্য সম্পর্কের সম্প্রসারণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

যুক্তরাষ্ট্র বহু দশক ধরে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে চলে আসছে। চীন পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় আমদানি অংশীদার হলেও, যুক্তরাষ্ট্র হলো পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য। ২০১৮-১৯ সালে, যুক্তরাষ্ট্র ছিল পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় বাজার এবং সেখানে রফতানির পরিমাণ ছিল পাকিস্তানের মোট রফতানির ১৬ শতাংশ। 

ব্যবসায়ী ও রফতানিকারকরা যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আরও ‘ভালো’ সম্পর্ক তৈরির কথা ভাবছে এবং বাণিজ্যের পরিমাণ ৬ বিলিয়ন ডলার থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছে, এবং পাকিস্তানের অর্থনীতি যেখানে মহামারীর কারণে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির আশঙ্কায় রয়েছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইতিবাচক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্বকে কোনভাবেই খাটো করে দেখার উপায় নেই। 

যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে, পাকিস্তান থেকে তাদের আমদানির অংশটুকু খুব বড় কিছু নয় বা এমনকি তাদের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশও নয়। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২.৩৭ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে এবং এর মধ্যে পাকিস্তানের রফতানির পরিমাণ ছিল মাত্র ০.১৬%। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে ছিল চীন (৫০৫ বিলিয়ন ডলার), মেক্সিকো (৩১৪ বিলিয়ন ডলার), কানাডা (৩০০ বিলিয়ন ডলার), জাপান (১৩৬ বিলিয়ন ডলার), এবং জার্মানি (১১৮ বিলিয়ন ডলার)। এই তালিকায় পাকিস্তানের অবস্থান ৫৯তমতে। 

পাকিস্তানের দিক থেকে এই রফতানির পরিমাণ সামান্য হ্রাস পেলেও সেটা হবে বড় ধরনের আঘাতের মতো। সে কারণে প্রশ্নটা হলো: অর্থনৈতিক স্বার্থ মেটানোর জন্য কি করা যেতে পারে?

আফগান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তি এবং তারা এখন যুদ্ধ শেষ করতে চাচ্ছে এ জন্য তাদের যে পাকিস্তানের সাহায্য প্রয়োজন – এই বাস্তবতাটা পাকিস্তানকে যথেষ্ট না হলেও কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিয়েছে, পাকিস্তান যেটাকে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারণের ব্যাপারে কাজে লাগাতে পারছে। 
এতে কোন সন্দেহ নেই যে পাকিস্তান তাদের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের রফতানি যদি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটা উৎস হয় এবং পাকিস্তান যেহেতু সেটা হারাতে চাইবে না, সে কারণে পাকিস্তানকে আফগানিস্তানে তাদের ভূমিকাটা এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে মার্কিন স্বার্থ সেখানে নষ্ট না হয়। 

সৌভাগ্যজনক দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্র নিজেও যুদ্ধে তালেবানদের আংশিক বা পূর্ণ পরাজয় কামনা করছে না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতা ও সামরিক কমান্ডারদের কাছেও এটা যথেষ্ট স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সামরিক সমাধান এখানে কোনভাবেই সম্ভব নয় এবং একমাত্র আলোচনা– যেটা তালেবানদেরকে আবশ্যিকভাবে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে– সেই আলোচনার মাধ্যমেই কেবল আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যাবে একে একটা আকার দেয়া যাবে। 

কার্যত, এই সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পরিবর্তনটাই মূল কারণ যেটার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তালেবানদের সাথে সম্পাদিত দোহা শান্তি চুক্তিটি মানার জন্য কাবুলকে প্রায় চাপ দিয়েছে। 

এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কৌশলটা পাকিস্তানের নিজেদের কৌশলের সাথে মিলে গেছে। তালেবানরা রাজনীতিতে ফিরে আসলে পাকিস্তান তাদের পশ্চিম সীমান্তকে নিরাপদ করে তুলতে পারবে এবং ঘন ঘন শত্রুতা ও সঙ্ঘাতের অবসান ঘটাতে পারবে। তাছাড়া ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় যে সব আফগানিস্তান-ভিত্তিক সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো সক্রিয় রয়েছে, তাদের মোকাবেলার ক্ষেত্রেও ভালো অবস্থানে থাকবে পাকিস্তান। 

এ কারণে, তালেবানরা যদি কাবুলের ক্ষমতায় না-ও যেতে পারে এবং নির্বাচনী রাজনীতির দ্বারা তাদের নিয়ন্ত্রণ সীমিত হয়ে থাকে, এতে কোন সন্দেহ নেই যে, পাকিস্তান এখনকার চেয়ে তখন অনেক ভালো অবস্থানে থাকবে, যদিও কাবুল ইসলামাবাদের চেয়ে নয়াদিল্লীর অনেক কাছাকাছি (এবং এ কারণেই নয়াদিল্লী অব্যাহতভাবে তালেবানদের রাজনীতিতে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায় ফিরে আসার বিরোধিতা করে যাচ্ছে)। 

এই বৃহৎ প্রেক্ষাপটে দেখলে পাকিস্তান এককভাবে তালেবান আধিপত্যের আফগানিস্তান গড়ার দিকে চলেছে– এমন ভাবনাটা হবে ভুল। বাস্তবতাটা হলো পাকিস্তান একমাত্র আঞ্চলিক দেশ নয়, যারা আফগানিস্তানের সাথে জড়িত রয়েছে। চীন, রাশিয়া ও এমনকি ইরান যদিও তালেবানদের সাথে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, কিন্তু তারাও চায় না যে, তালেবানরা সামরিকভাবে সবকিছু দখল করে নির্বাচনী রাজনীতি ও সংবিধানকে দমন করুক এবং আফগানিস্তানে নিজেদের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করুক। 

পাকিস্তান কি এর পরও কাবুলে এককভাবে তালেবান সরকার গঠনের চেষ্টা করবে যেখানে এ রকম একটা কৌশল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সাথেই তাদের সম্পর্ক নষ্ট করবে না, বরং রাশিয়া, ইরান ও চীনের সাথেও সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে?

ইসলামাবাদ নিশ্চিতভাবে এ ধরনের কৌশলের পরিণতি সম্পর্কে সজাগ রয়েছে এবং সে কারণে এরই মধ্যে তারা চেষ্টা শুরু করেছে যাতে তালেবানদের সাথে আফগানিস্তানের অন্যান্য পক্ষগুলোর আলোচনা হয়, এবং সেটা যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়।

জাগো প্রহরী/ফাইয়াজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ