এবার করোনায় আক্রান্ত মন্ত্রী এমপির সংখ্যা বাড়ছে

করোনায় আক্রান্ত সংসদ সদস্যরা- ফাইল ছবি
জাগো প্রহরী : প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ রূপ নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। গোটা বিশ্বকে থমকে দেওয়া অদৃশ্য এই ভাইরাস থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোনো শ্রেণির মানুষই। বিশ্বজুড়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সারি লম্বা হয়েই চলেছে। এরই মধ্যে দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তালিকায় যুক্ত হয়েছেন মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদ সদস্যসহ রাজনীতিক, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, চিকিৎসক,পুলিশ, সাংবাদিক, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীসহ সব পর্যায়ের মানুষ। আক্রান্ত ও মৃত্যুর তালিকায় শুরুতে তুলনামূলকভাবে অন্য শ্রেণি-পেশার মানুষ বেশি আক্রান্ত হলেও এখন সেই তালিকায় বিশিষ্টজনরাও চলে আসায় দেশজুড়ে উদ্বেগ-আতঙ্কের মাত্রা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সস্ত্রীক করোনায় আক্রান্ত। তার এপিএসও আক্রান্ত। কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর ঊশৈসিং। বান্দরবান থেকে টানা ছয়বার নির্বাচিত এই সংসদ সদস্যকে এরই মধ্যে সামরিক হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে আসা হয়েছে। ৬০ বছর বয়সি পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর ঊশৈসিংয়ের পারিবারিক সূত্র গণমাধ্যমকে জানায়, তিনি আগে থেকেই শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। তার ডায়াবেটিসও রয়েছে।

করোনায় আক্রান্ত হওয়া সংসদ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন—যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনের রণজিত্ কুমার রায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের এবাদুল করিম, জামালপুর-২ আসনের ফরিদুল হক খান, চট্টগ্রাম-১৬ আসনের মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী ও চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনের মোছলেম উদ্দিন আহমেদ। এই পাঁচ জনই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য। সংসদ সদস্যদের মধ্যে পুরো পরিবারসহ করোনা আক্রান্ত হন মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী ও মোছলেম উদ্দিন। পরিবারের ছয় সদস্যসহ মোস্তাফিজুর রহমানের বাড়ির মোট ১১ জন করোনায় আক্রান্ত। আক্রান্তদের মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমানের স্ত্রী, বড়ো মেয়ে, বড়ো মেয়ের স্বামী, তিন নাতি ও দুই গৃহকর্মী রয়েছেন। আর মোছলেম উদ্দিনের পরিবারসহ একত্রে ১০ জন করোনায় আক্রান্ত হন। আক্রান্তদের মধ্যে তার স্ত্রী, ছেলে ও নাতিসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা রয়েছেন।

আওয়ামী লীগের আরেক এমপি শহীদুজ্জামান সরকার (নওগাঁ-২) করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন। সাবেক হুইপ শহীদুজ্জামান সরকারই প্রথম ব্যক্তি, এমপিদের মধ্যে যিনি প্রথম কোভিড-১৯ আক্রান্ত হন।

শ্বাসকষ্টসহ করোনা উপসর্গ নিয়ে গতকাল সোমবার দুপুরে সিএমএইচে ভর্তি হয়েছেন সিলেট-২ আসনের গণফোরামের এমপি মোকাব্বির খান। গণফোরামের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোশতাক আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, গতকাল সংসদে মোকাব্বির খানের বক্তব্য রাখার কথা ছিল। তিনি ন্যাম ভবনেই ছিলেন, সেখানে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট অনুভব করায় তিনি দুপুরে সিএমএইচে ভর্তি হন। তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কি না সেটি পরীক্ষার জন্য নমুনা নেওয়া হয়েছে।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির পর ব্রেইন স্ট্রোক করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। শনিবার তিনি মারা যান। যদিও মৃত্যুর আগে পরীক্ষায় করোনা নেগেটিভ এসেছিল প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিমের। করোনায় আক্রান্ত হয়ে একই দিন মৃত্যুবরণ করেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। গতকাল মারা গেছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন কামরান। করোনায় আক্রান্ত হয়ে তিনি সিএমএইচে চিকিৎসাধীন ছিলেন। কামরানের স্ত্রী আসমা কামরানও করোনায় আক্রান্ত।

এর আগে করোনায় মারা যান বিগত বিএনপি সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আনোয়ারুল কবির তালুকদার। রাজনীতিবিদদের মধ্যে আনোয়ারুল কবির তালুকদারই প্রথম করোনায় প্রাণ হারান। এছাড়া করোনায়া মারা গেছেন জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক সদস্য কামরুন্নাহার পুতুল ও আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক এমপি হাজি মকবুল হোসেন। আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি ফেনীর নিজাম হাজারীর বড়ো ভাইও করোনায় মারা গেছেন। একই দিন পুত্রের মৃত্যু সংবাদে মারা যান তার বৃদ্ধা মা।

এদিকে, করোনায় মারা গেছেন আওয়ামী লীগের এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর স্ত্রী বেগম সাহান আরা আবদুল্লাহ। আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেত্রী ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন দুই সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম নাদেলও করোনা আক্রান্ত। তিনি বাসায় থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন, এখন অনেকটা সুস্থ। করোনায় আক্রান্ত হয়ে ১১ জুন মারা গেছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও দলটির ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন আহমেদ বাবুল। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শনিবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এই পর্যন্ত বিএনপির ঢাকা মহানগরের উত্তরের সাধারণ সম্পাদক আহসানউল্লাহ হাসানসহ ৫৬ জন নেতাকর্মী মারা গেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন দলের ১২১ জন নেতাকর্মী।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে এরই মধ্যে মারা গেছেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। সানবিমস স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা নিলুফার মঞ্জুরও করোনায় মারা যান। ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য নাজমুল করিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শাকিল উদ্দিন আহমেদও প্রাণ হারিয়েছেন করোনায়। এছাড়া পানি বিশেষজ্ঞ এম এ সামাদ, এস আলম গ্রুপের পরিচালক মোরশেদুল আলম, পপুলার গ্রুপের চেয়ারম্যান তাহেরা আক্তার, নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী খোকন সাহা, ব্র্যাকের পরিচালক আফতাব উদ্দীন আহমদ, সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের প্রতিষ্ঠাতা মো. ইমামুল কবীরও করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

করোনার ছোবলে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে মারা গেছেন সাবেক সচিব এম বজলুল করিম, অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়া অতিরিক্ত সচিব তৌফিকুল আলম, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের পরিচালক (যুগ্মসচিব) মো. ফখরুল কবির, উপকর কমিশনার সুধাংশু কুমার, রাজস্ব কর্মকর্তা খোরশেদ আলম, খাদ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা উৎপল হাসান ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক জালাল সাইফুর রহমান প্রমুখ। গত শনিবার দিবাগত রাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের নতুন সচিব আবদুল মান্নানের স্ত্রী কামরুন নাহার করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সিএমএইচে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান। বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্মব্যবস্থাপক আশরাফ আলী, রূপালী ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক সহিদুল ইসলাম খান, সোনালী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার মাহবুব এলাহী, সিটি ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের মুজতবা শাহরিয়ার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদসহ বেশ কয়েকজন ব্যাংক কমকর্তাও করোনায় মৃত্যুবরণ করেছেন।

সর্বশেষ, প্রতিরক্ষাসচিব আবদুল্লাহ আল মহসিন চৌধুরী করোনায় আক্রান্ত হয়ে সিএমএইচে ভর্তি রয়েছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের সচিব মো. আলী নূর ও তার স্ত্রী নাসরীন আক্তারও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত।

জাগো প্রহরী/গালিব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য