এক বিবাহে তছনছ বাইতুশ শরফের দরবার


মুনশী নাঈম : করোনাক্রান্ত হয়ে ২০ মে, বুধবার বিকেলে ইন্তেকাল করেছেন বায়তুশ শরফের পীর আলামা শাহ মোহাম্মদ কুতুবুদ্দিন। রাজধানীর ধানমন্ডি আনোয়ার খান মডার্ন হসপিটাল লিমিটেডের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন তিনি। একইদিন ইন্তেকাল করেছেন বাইতুশ শরফ দরবার মসজিদের খতিব মাওলানা নুরুল ইসলাম। একই দিনে পরপর দুজন বড় বড় ব্যক্তি ও রাহবার হারিয়ে শোকে ম্রিয়মাণ হয়ে আছে দরবার। আচমকা কেনো ঝড়ে তছনছ হয়ে যাওয়া বিবর্ণ বস্তুভিটার মতো।

বাইতুশ শরফের পীর কাদের সংস্পর্শে এসে করোনাক্রান্ত হয়েছিলেন, এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য হয়নি। এর পেছনে জড়িয়ে আছে এ দেশের করোনাক্রান্ত বিখ্যাত ধনাঢ্য এক পরিবারে বাগদান অনুষ্ঠানের গল্প।

এস আলম পরিবারে বাগদান অনুষ্ঠান

চলতি মে মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশজুড়ে যখন লকডাউন চলছিল, তখন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের মেয়ে জেবা জামান চৌধুরীর সঙ্গে এস আলম পরিবারের আরেক সন্তান ও ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সামাদ লাবুর ছেলে আতিকুল আলমের বাগদান সম্পন্ন হয়। সরকারি নির্দেশনার কারণে আলোচিত এ বাগদান অনুষ্ঠানের কথা সাধারণ মানুষ না জানলেও আনু্ষ্ঠানিকতার কমতি ছিল না। নগরের সার্সন রোডে মন্ত্রীর বাসভবনে ঘরোয়া এ বাগদান অনুষ্ঠানে দুই পরিবারের অর্ধশতাধিক লোকের আপ্যায়নের ব্যবস্থাও ছিল।

এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ এবং তার পরিবারের সবাই চট্টগ্রামের ধনিয়ালাপাড়াস্থ বায়তুশ শরফ দরবারের পীর মাওলানা কুতুব উদ্দিনের ভক্ত ও অনুসারী। এস আলম পরিবারের সদস্যরা যে কোনো শুভ কাজে পীর মাওলানা কুতুব উদ্দিনের দোয়া নিতেন। তাদের পারিবারিক সব অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থাকতেন। বাগদানের অনুষ্ঠানেও যোগ দিয়েছিলেন বায়তুশ শরফের পীর মাওলানা শাহ কুতুব উদ্দিন। তিনি মোনাজাতের মাধ্যমে বর-কনের দাম্পত্য জীবনে শান্তি কামনা করেন। বর-কনে পীরের পা ছুঁয়ে সালাম করেন, দোয়া নেন।

ওই বাগদান অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার পর করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন সাইফুল আলম মাসুদের মা ৮৫ বছর বয়সী চেমন আরা বেগম, এস আলম গ্রুপের পরিচালক রাশেদুল আলম, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সামাদ লাবু, পরিচালক মো. শহীদুল আলম, পরিচালক ওসমান গণি ও ৩৬ বছর বয়সী এক নারীসহ মোট ৯ সদস্য। তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া বায়তুশ শরফের পীর মাওলানা শাহ কুতুব উদ্দিনও করোনায় আক্রান্ত হন।

এক বিবাহে তছনছ দরবার শরীফ

২০ মে রাজধানীর ধানমন্ডি আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাওলানা শাহ কুতুব উদ্দিনের মৃত্যু হয়। একদিন পর ২২ মে রাতে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে মারা যান এস আলমের বড় ভাই ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের পরিচালক মোরশেদুল আলম।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রামে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মাওলানা কুতুব উদ্দিনের করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়েছিল। চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বীকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ল্যাবে করা নমুনা পরীক্ষায় উনার করোনাভাইরাস পজিটিভ এসেছে বলে আমাদের জানানো হয়েছে।’ চট্টগ্রাম নগর পুলিশের বিশেষ শাখার উপ কমিশনার আবদুল ওয়ারিশ বলেন, ‘আমরা প্রতিবেদন পেয়েছি উনার কোভিড-১৯ পজিটিভ ছিল। তিনি যেখানে যেখানে গিয়েছিলেন, সেসব জায়গার খোঁজ নিচ্ছি আমরা।’

আল্লামা শাহ মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন ৯ মার্চ ১৯৩৯ সালে তিনি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বায়তুশ শরফ দরবারের তৃতীয় পীর। পাশাপাশি তিনি ছিলেন নগরীর দেওয়ানহাট এলাকার বায়তুশ শরফ কামিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের শরিয়াহ সুপারভাইজারি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। চট্টগ্রামসহ সারাদেশে মাওলানা কুতুব উদ্দিনের অসংখ্য ভক্ত রয়েছে। ২০ মে, তিনি যেদিন ইন্তেকাল করেন, একই দিনে ইন্তেকাল করেন বাইতুশ শরফ দরবার মসজিদের খতিব মাওলানা নুরুল ইসলাম।

একটি বিয়ে তছনছ করে দিলো বাইতুশ শরফ দরবার। কেড়ে নিলো বড় বড় দুজন ব্যক্তিত্ব। শুধু দরবার নয়, এস আলম গ্রুপের এই বাগদান অনুষ্ঠান থেকেই পুরো এস আলম পরিবারে ছড়িয়েছে করোনা। সর্বশেষ গত ২৮ মে নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এই পরিবারের আরেক পুত্রবধূ ইশরাক আরা জাহান রাফিকা। তিনি করোনায় মৃত মোরশেদুল আলমের পুত্রবধূ।

সদ্যপ্রয়াত পীর মাওলানা শাহ মোহাম্মদ কুতুব উদ্দীনের পর বায়তুশ শরফ দরবারের নতুন পীর হিসেবে মনোনীত হয়েছেন মাওলানা আব্দুল হাই নদভী। দরবারের চতুর্থ পীর হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেন তিনি। নগরীর দেওয়ানহাট ধনিয়ালাপাড়ায় কেন্দ্রীয় বায়তুশ শরফ মসজিদে ২৩ মে আসরের নামাজের পর তাকে পীর হিসেবে ঘোষণা দেয় বায়তুশ শরফ দরবারের অঙ্গসংগঠন মজলিশে ওলামা বাংলাদেশ।

জাগো প্রহরী/গালিব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য