সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যা,সেলেব্রেটিরা কেন অসুখী?


মাও. আবদুল্লাহ আল ফারুক ৷৷

আপনারা হয়তো শুনেছেন, সুশান্ত সিং রাজপুত নামের ভারতের বলিউডের এক উঠতি জনপ্রিয় নায়ক গতকাল আত্মহত্যা করেছে। 

অথচ এই নায়ক এই সময়ের বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক। ক্যারিয়ারের সুবর্ণ সময় চলছে। মানুষ সাধারণত জীবনের দুঃসময়ে বা পড়ন্ত সময়ে আত্মহত্যা করে। কিন্তু জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকাবস্থায় আত্মহত্যা করেছে, এমন ঘটনা তুলনামূলক কম। 
আমার মনে অনেক দিন ধরে প্রশ্ন ছিল যে, অর্থ-বিত্ত, খ্যাতি ও জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠার পরও সেলেব্রেটিরা কেন আত্মহত্যা করে?
.
আজ থেকে চার বছর আগে আমি যখন জুনাইদ জামশেদের একটি ভিডিও অনুবাদ করি, তখন সেই প্রশ্নের একটি উত্তর পেয়েছিলাম। কীভাবে পাকিস্তানের এই জনপ্রিয় সিঙ্গার চাকচিক্যের জীবন ছেড়ে দ্বীনের পথে এসেছিলেন, তা জানিয়ে তিনি নিজেই একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছিলেন। বইটি মাকতাবাতুল আযহার থেকে ‘আমি জুনাইদ জামশেদ বলছি’ নামে বেরিয়েছে।

আজ সেখান থেকে সেলেব্রেটিদের ডিপ্রেশন সম্পর্কিত অংশটি তুলে ধরছি। আশা করি, কৌতূহলী মন সেখান থেকে খোরাক পাবে।
.
জুনাইদ জামশেদ বলেন,
আমি মাওলানা তারিক জামিল সাহেবকে বললাম, ‘মাওলানা, একটি প্রশ্ন করতে চাচ্ছি। একজন পাকিস্তানি নওজোয়ানের পক্ষে যেই সুনাম-সুখ্যাতির কল্পনা করাও মুশকিল, তার সব আমি পেয়েছি। কিন্তু আমার ভেতরটা পুরোপুরি ফোকলা। কেউ বাইরে থেকে বুঝবে না, আমার ভেতর কী পরিমাণ শূন্য। আমার বাইরের জীবন দেখে মানুষ মনে করে, আমি বুঝি অনেক সুখী। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমার ভেতরে অনেক কষ্ট। আমি অত্যন্ত অসুখী। কিন্তু কেন সেই দুঃখ আমার ভেতরে দানা বেঁধেছে, তার কারণ আমি জানি না।’

উত্তরে মাওলানা বললেন, ‘তোমার সমস্যা হলো, তোমার ব্যথা হয়েছে হাঁটুর সামনের দিকে। কিন্তু তুমি মলম লাগাচ্ছো হাঁটুর পেছন পার্শ্বে।’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হযরত, একটু খুলে বলুন।’

বললেন, ‘দেখো, আল্লাহ তাআলা মানুষকে দু’টি উপাদান দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। একটি হলো তার দেহ— যা মাটির তৈরি। আরেকটি হলো তার আত্মা— যা সরাসরি আল্লাহপ্রদত্ত। এখন মানুষের দেহ যেহেতু মাটির তৈরি, এজন্যে দেহের যাবতীয় খোরাক তিনি মাটির ভেতর রেখে দিয়েছেন। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে আমাদের খাবার খেতে হয়। কাপড় পরতে হয়। ঘরে বসবাস করতে হয়। এগুলো যেহেতু আমাদের দেহের প্রয়োজন, এজন্যে এই প্রয়োজনগুলো আল্লাহ মাটির মধ্যে রেখেছেন। আর রূহ হলো আল্লাহর দান। এই রূহ আসমান থেকে এসেছে। কাজেই এর খোরাক আসমানে আছে; জমিনের ভেতর নেই। 

মাওলানা তখন আরও বলেন, ‘আমি যদি তোমাকে একটি স্বর্ণনির্মিত রাজপ্রসাদে নিয়ে যাই। আর সেখানে তোমাকে চারদিন বন্দী করে রাখি; আর এ সময়কালে তোমাকে খাবার-দাবার না দেই তখন তোমার কী অবস্থা হবে? 

আমি বললাম, ‘স্পষ্টতই তখন আমি চিৎকার করে বলবো, আমাকে খাবার দাও। বাঁচার জন্যে খোরাক দাও।’

মাওলানা বললেন, ‘ঠিক সেই অবস্থা তোমার রূহের হয়েছে। তোমার দেহ এখন অনেক ভালো ভালো কাপড় পরতে পারছে। দামী গাড়িতে চড়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাচ্ছে। দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকায় বসবাস করছে। তুমি মনে করছো, এতেই তুমি সুখী। অথচ তোমার ভেতর যেই রূহ আছে। তা খোরাক না পেয়ে চিৎকার করছে। হাহাকার করছে। যার ফলে তোমার মাথাব্যথা শুরু হয়ে গেছে। কাজেই তোমাকে এখন তোমার রূহের খোরাক বন্দোবস্ত করতে হবে।’

আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম, ‘এর খোরাক কোথায়’?

বললেন, ‘এই রূহ যেহেতু আসমান থেকে এসেছে। কাজেই এর খোরাক আসমানে আছে। জমিনে নেই। তোমাকে মনে রাখতে হবে, মনের প্রশান্তি, প্রস্বস্তি, শান্তি-সুখ— এগুলোর সম্পর্ক মাটির তৈরি দেহের সঙ্গে নয়। এগুলোর সম্পর্ক আসমান থেকে আসা রূহের সঙ্গে।’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই আত্মার খোরাক কী?’

বললেন, ‘এর খোরাক হলো আল্লাহর কালাম। আল্লাহ যেই বিধান নাযিল করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেই সুন্নত দিয়েছেন, এগুলোই রূহের খোরাক। যতোক্ষণ পর্যন্ত রূহ এই খোরাকগুলো না পাবে ততোক্ষণ পর্যন্ত সে ক্ষুধার্ত থাকবে। এই ক্ষুধার কারণে সে যখন চিৎকার শুরু করবে, হাহাকার করবে তখন অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়ে। তুমি তো একজন মুসলমান। তুমি আত্মার খোরাকের কথা জানো। কিন্তু যারা মুসলমান নয় তারা তো সেই খোরাকের কথা জানে না। যার কারণে তারা আত্মার চিৎকার সামাল দিতে না পেরে কখনও মদ নিয়ে বসে পড়ে। কখনও নেশার জগতে হারিয়ে যায়; কিন্তু এতে তারা চিরস্থায়ী সমাধান পায় না। কাজেই যতোক্ষণ পর্যন্ত তোমার আত্মা খোরাক না পাবে ততোক্ষণ পর্যন্ত সে চিৎকার করবে। আর তুমি অস্থিরতা বোধ করবে। শান্তি পাবে না।’

এতটুকু বলে মাওলানা কুরআন কারীমের সেই বিখ্যাত আয়াত তিলাওয়াত করেন—
أَلاَ بِذِكْرِ اللهِ تَطْمَئِنّ الْقُلُوْبُ
এ আয়াতে মহান আল্লাহ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেছেন— ‘হে সম্পদশালী, হে প্রতাপশালী, হে রাজন্যবর্গ, হে প্রশাসনের আমলা, যদি তোমরা সুখী হতে চাও তাহলে তোমাদেরকে অবশ্যই আমার সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে হবে। বন্ধন তৈরি করতে হবে।’

মাওলানার মুখে এ কথা শুনে আমার দু’চোখ বেয়ে গড়গড় করে অশ্রূ ঝরতে শুরু করলো। এমনিতেই আমি তিন দিন ধরে এই ইজতিমায় আছি। নিয়মিত বয়ান শুনছি। মন-প্রাণ অনেক কোমল হয়ে এসেছে। এ অবস্থায় মাওলানার কথাগুলো আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেলো। অনেক ক্ষণ পর্যন্ত কাঁদলাম।”

-আমি জুনায়েদ জামশেদ বলছি 
পৃষ্ঠা : ২৩-২৫

© প্রখ্যাত অনুবাদক ও লেখক আবদুল্লাহ আল ফারুক এর টাইমলাইন থেকে নেওয়া ৷

জাগো প্রহরী/গালিব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য