করোনা পরিস্হিতি ও কওমি মাদরাসা : কিছু নিবেদন


শিহাব সাকিব ৷৷

কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় আরবি শাওয়াল মাসের প্রথম দশকে। এখন আমরা শাওয়ালের ২য় দশক অতিক্রম করছি।

সবকিছু থমকে দাঁড়িয়ে আছে। কবে নাগাদ স্বাভাবিক হতে পারে, কেউ বলতে পারছে না। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। দিন দিন করোনাভাইরাসে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। সেই সঙ্গে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা।

এই মুহূর্তে সরকারের পক্ষ থেকে শুধু ভর্তি করার অনুমতি পাওয়া গেছে। কিন্তু ক্লাস শুরু কবে হবে, সেটার কোন সিদ্ধান্ত হয়নি এখনও। দায়িত্বশীলদের বক্তব্য থেকে খুব দ্রুত যে খুলছে না, সেটা স্পষ্ট।

২.
গত শিক্ষাবর্ষের সমাপনী পরীক্ষা হয় নি। তার আগেই মাদ্রাসাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। সামনে আরও কী সংকটের ভেতর দিয়ে যেতে হবে, জানা নেই। সবই আল্লাহর ইচ্ছা। অতএব হতাশ হওয়া যাবে না।

ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার জন্য দোয়া ইসতেগফার জারি রাখতে হবে। সব ধরণের গুনাহ বর্জন করতে হবে, বিশেষ করে যেসব গুনাহ ব্যাপক আজাব গজবের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং আল্লাহ ক্রোধকে বাড়িয়ে দেয়।

৩.
ইতিহাসে এমন চিত্র এই প্রথম নয়। যুগে যুগে অসংখ্য মহামারি হয়েছে। দারুল উলুম দেওবন্দে দুটি মহামারি হানা দিয়েছিল প্রতিষ্ঠার একদম শুরুর দিকে এবং এমন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল যাতে প্রতিকূল পরিবেশে দাঁড়ানো এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অস্তিত্ব সংকটে পড়ে গিয়েছিল।

বাহ্যত মনে হয়েছিল ঘুরে দাঁড়ানো আর সম্ভব হবে না। ভারতবর্ষে মুসলিমদের পুনর্জাগরণের স্বপ্ন অঙ্কুরেই শেষ হয়ে যাবে। প্রতিষ্ঠার ২য় বছর ১২৮৪ হিজরিতে দুই মাস আর ১২৮৬ হিজরিতে দীর্ঘ পাঁচ মাস মাদ্রাসার সব কার্যক্রম বন্ধ ছিল। অধিকাংশ ছাত্র শিক্ষক ভাইরাসে আক্রান্ত হন এবং বাড়িতে চলে যান।

মাদরাসার শুভানুধ্যায়ীরাও ছিলেন পরিস্থিতির শিকার। কিন্তু তারা বিচলিত হন নি, নৈরাশ্য তাদের স্পর্শ করতে পারেনি। যখনই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে ছাত্র শিক্ষক সবাই মাদরাসায় চলে এসেছেন এবং প্রাণান্তকর পরিশ্রম করে পাঠদান সম্পন্ন করেছেন।

বিস্ময়কর ব্যাপার হল প্রথম মহামারির সময় ১২৮৪ হিজরিতে বিদেশি ছাত্র সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল। সেই সঙ্গে অনুদানও আশাতীত বৃদ্ধি পেয়েছিল। ১২৮৩ হিজরিতে চাঁদা ওঠেছিল ৬৪৯ রুপি আর মহামারির বছর ১২৭৫ রুপি!

৪.

শিক্ষার্থীরা লকডাউনের এই সময়কে ছুটি মনে করবেন না বরং সুযোগ মনে করবেন এবং পড়ালেখায় ব্যস্ত থাকবেন। পেছনের যে সব পড়া অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে তা পূর্ণ করবেন, যে সব বিষয়ে দুর্বলতা রয়েছে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করবেন।

নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে ভূমিকা হিসেবে যা পড়ানো হয় তা পড়ে ফেলবেন। যে সব নতুন বিষয় পড়ানো হবে, তার প্রাথমিক পরিচিতি ও সাধারণ জ্ঞান অর্জন করবেন। নতুন বর্ষের কিতাব পরিচিতি ও প্রাথমিক অধ্যয়ন সম্পন্ন করবেন। এসব বিষয়ে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের পরামর্শ নিবেন।

আশা করি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও এবিষয়ে উদ্যোগী হবেন এবং ছাত্রদের দিক নির্দেশনা পেশ করবেন। বিশেষ করে হিফজ বিভাগ ও প্রাথমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে একটু বাড়তি মনোযোগ দিবেন।

৫.
যখন আল্লাহতায়ালা সবকিছু স্বাভাবিক করে দিবেন তখন দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হবে এবং এই ক্ষতিটা পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে বিরতিগুলো একদম সীমিত করে ফেলতে হবে। সম্ভব হলে বার্ষিক পরীক্ষা পিছিয়ে দেয়া যেতে পারে। তবুও যেভাবেই হোক চলতি শিক্ষাবর্ষের পড়াশোনা সমাপ্ত করতে হবে।

৬.
আল হাইয়াতুল উলইয়ার অধীনে অনুষ্ঠিতব্য দাওরা পরীক্ষার্থীদের জন্যে প্রস্তুতি শেষ করার এ এক মহা সুযোগ। কবে কখন করোনাভাইরাস শেষ হবে আর পরীক্ষা হবে, এ কথা ভেবে একদম উদাসীন হওয়া যাবে না। যত পড়বেন ততই লাভ। সর্বোচ্চ নাম্বারের আশায় কোমর বেঁধে লেগে যান পড়াশোনায়।

৭.
করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও অভিজ্ঞ ডাক্তারদের পরামর্শ মেনে চলুন। সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করুন। অবহেলা করবেন না। স্বাস্থ্য বিধিসহ সরকারি সব নির্দেশনা লক্ষ্য রেখে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করুন।

মনে রাখবেন, আপনার অবহেলা শুধু আপনার নয়, অন্য অনেকের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

৮.
এই মুহূর্তে তাকদিরের বিশ্বাসকে আরও মজবুত করুন। দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন, ভাল মন্দ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়। তার ইচ্ছার বাইরে কোন কিছুই হয় না। তিনি যা চান তাই হয়, তিনি যা চান না তা হয় না।

করোনা সংক্রমিত হয় আল্লাহর ইচ্ছায়। অতএব আক্রান্ত হয়ে গেলে আল্লাহর ফায়সালা হিসেবে মেনে নিব, খুশি মনে। দোয়া করব এবং চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করব।

৯.
আর্থিক অনেক ক্ষয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে জনসাধারণের অনুদানের ওপর নির্ভর মাদরাসাগুলোকে। দীর্ঘ সময় মাদরাসা বন্ধ থাকায় অনুদান সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

শিক্ষার্থীদের থেকেও কোন ধরণের প্রদেয় নেয়া হচ্ছে না। তাছাড়া দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্যে জাকাত ও সদকাতুল ফিতরের অর্থ সংগ্রহ করা হয় রমজানে। করোনা পরিস্থিতির কারণে এবার তা ওঠানো প্রায় সম্ভব হয়নি।

অতএব সামর্থবান দীনদরদী ভাই বোনদের কাছে বিনীত নিবেদন সংকটাপন্ন মুহূর্তে দীনী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে দাঁড়ান এবং অনুদানের হাত বাড়িয়ে দিন। আল্লাহতায়ালা আপনাদেরকে উত্তম বিনিময় দান করবেন। আমিন ৷

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

জাগো প্রহরী/মাহফুজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ