ফাতওয়া ও জনৈক নাপিতের গল্প


মুফতি মানসুর আহমাদ ৷৷

দারুল উলুম হাটহাজারীতে ইফতার একেবারে শেষ দিকের কোন এক দরসের ঘটনা। উস্তাযে মুহতারাম মুফতি জসীমুদ্দিন দা.বা. একজন একজন করে আমাদের সবাইকে জিজ্ঞেস করছিলেন- বলো ইফতায় দু'বছর কাটিয়ে কার কী উপকার হলো। এ ধরণের প্রশ্নের জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। 

কিছুক্ষণের জন্য আত্মনিমগ্ন হয়ে ভাবতে শুরু করলাম এ প্রশ্নের উত্তর কী হতে পারে। সহপাঠী ভাইয়েরা একেকজন সংক্ষেপে শুনিয়ে যাচ্ছিলেন ফিকহ ও ফাতওয়ার কিতাব থেকে সবিশেষ উপকৃত হওয়ার একটি দুটি উদাহরণ। একপর্যায়ে হুজুর আমাকে যখন প্রশ্নটি করেছিলেন তখন বলেছিলাম-  আমার কাছে ফিকহি মাসায়েল আগের চেয়ে একটু কঠিন হয়ে গেছে। ইফতা পড়ার আগে কেউ কিছু জানতে চাইলে সহজে বলে দিতে পারতাম। কিন্তু এখন আর কোনো কিছুকে এতো সহজ মনে হয় না। (ছাত্র হিসেবে আলহামদুলিল্লাহ মন্দ ছিলাম না। বার্ষিক পরীক্ষায় আল্লাহর মেহেরবানীতে আমিই প্রথম হয়েছিলাম।)

বন্ধুদের কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন, আমার কথাটা উলটো হয়ে গেছে। বলা উচিৎ ছিল,  দু'বছর ফিকহের উপর মেহনত করে অনেক কিছুই জেনেছি, আয়ত্ত করেছি। ফলে ফিকহি মাসায়েল অনেক সহজ হয়েছে, যতোটা সহজ আগে ছিল না। না বন্ধু! আমি উলটো বলিনি। দু'বছরে আমি একটা ধারণা লাভ করেছিলাম ফিকহের জগত সম্পর্কে। এটি কতটা বিস্তৃত। মাত্র দু'বছর সময় এর জন্য কতটা সামান্য। পুরো বিষয়টি সহজ করার জন্য একটি গল্প বলবো। গল্পটি উস্তাযে মুহতারাম মুফতি কিফায়াতুল্লাহ যিদামজদুহু আমাদেরকে একাধিকবার শুনিয়েছেন। গল্পটি কাল্পনিক হলেও এর শিক্ষাটি বাস্তব।

এক রাজার মাথায় একটা ফোঁড়া হয়েছে। ভেতরে পুঁজ জমা হয়ে পেকে টনটন করছে। রাজা ব্যাথায় অস্থির। রাজার ব্যক্তিগত চিকিৎসককে ডাকা হলো। তিনি ফোঁড়ার অবস্থা ও অবস্থান দেখে চিন্তা করলেন এর চিকিৎসা তো একটিই। একটু কেটে বা ছিদ্র করে পুঁজটা বের করে ফেলতে হবে। কিন্তু এর অবস্থান তো জটিল জায়গায়- মাথায়। ব্যাথা একটু বেশিই হবে। ব্যাথার প্রচন্ডতায় রাজা যদি আমার উপর ক্ষেপে যান তাহলে তো জীবনের ভয় আছে। তাই সে ছলনার আশ্রয় নিল। বললো বাদশা জাহাপনা! সমস্যাটা জটিল। এর চিকিৎসা আমার সাধ্যের বাইরে। বাদশা অন্য চিকিৎসকদের ডাকলেন। তারাও একই রকম চিন্তা করে একই উত্তর দিলো। 

এদিকে মাথার চুল লম্বা হওয়ায় বাদশা নাপিতকে ডেকেছেন চুল কাটাতে। নাপিত বেচারার অনিচ্ছাকৃত ক্ষুরের খুঁচায় ফোঁড়ার চামড়া কেটে পুঁজ সবটুকু বেরিয়ে গেল। অসহ্য ব্যথা থেকে বাদশা আকস্মিক মুক্তি লাভ করলেন। বাদশাহর চিন্তায় এলো, এ নাপিত শুধু নাপিত নয়, বরং দক্ষ একজন চিকিৎসকও । নাপিতকে বললেন, ফোঁড়া জাতীয় রোগে তুমি রাজ্যের সবচে বড়ো চিকিৎসক। পেশাদার ডাক্তারগণ যেখানে ফেল তুমি সেখানে সফল।

নাপিত রাজার স্বীকৃতিকে কাজে লাগিয়ে শুরু করে দিল ফোঁড়ার চিকিৎসা। রোগী এলেই ক্ষুর দিয়ে ক্যাচাং। রাজ্যের রোগীর সিরিয়াল তার এখানে। চিকিৎসা নিয়ে কেউ বাঁচে কেউ মরে। 

এদিকে এক পাশ করা ডাক্তার চেম্বার খুলে রোগীর অপেক্ষায়। কিন্তু রোগী নেই। সব রোগী নাপিতের কাছে। ডাক্তার সাহেব চিন্তা করে একটা কৌশল বের করলেন। তিনি নাপিতের সঙ্গে দেখা করে বললেন, আপনার দ্বারা মানুষের উপকার হচ্ছে এতে আমি খুশি। আমি আপনাকে একটু সহযোগিতা করতে চাই। যেন আপনার মারা যাওয়া রোগীর সংখ্যা কমে যায়। নাপিত বিনাপয়সায় এতো ভালো সহযোগিতা পেতে রাজি হয়ে গেল। 

ডাক্তার সাহেব বললেন, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ কিছু রগ আছে যেগুলো কাটা পড়লে রক্তক্ষরণ হয়ে রোগী মারা যায়। আর সাধারণ রগ কেটে গেলে সমস্যা হয় না। 

এবার তাকে শুনাতে শুরু করলেন, শরীরের কোথায় কয়টা কী ধরণের রগ থাকে। নাপিত আগ্রহী হয়ে শিখতে শুরু করলো। সারা শরীরে রগের বিশাল তালিকা। এত সহজে কি সব মনে রাখা যায়?
এবার আধা শিক্ষিত নাপিত পড়লো নতুন বিপত্তিতে। এখন রোগী এলেই আগের মত ক্ষুর চালিয়ে দিতে পারে না। ভাবতে হয় এ ফোঁড়ার জায়গার রগগুলোর অবস্থা নিয়ে। তার ভুলের কারণে রোগী মারা যেতে পারে- এই ভয়ে তার হাত কাঁপে। অপারগতা প্রকাশ করে সে রোগীদের ফিরিয়ে দেয় ঐ ডাক্তার সাহেবের কাছে। ডাক্তার সাহেবের কৌশল সফল হয়।
গল্পটি বলে হুজুর আমাদেরকে বুঝাতে চাইতেন, আজকাল ফাতওয়ার বিষয়টিকে সহজ মনে করা হয় ফিকহ সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা না থাকার কারণে। এটিকে সহজ মনে করার কোনই সুযোগ নেই। হুজুর আমাদেরকে ইমাম মালেক রহ. এর উক্তিটি শুনাতেন- "ইলমের ক্ষেত্রে হালকা ও সহজ বলতে কিছুই নেই। 

ফাতওয়া প্রদানের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম কত সতর্ক ছিলেন। একজনকে জিজ্ঞেস করলে তিনি পাঠিয়ে দিতেন আরেকজনের কাছে। কোনো সময় সাহাবী পাঠিয়ে দিতেন তাবেয়ীর কাছে। 
কিন্তু এই ফাতওয়া আমাদের কাছে হয়ে গেছে জলবৎতরলং। আল্লাহ আমাদের সকলকে সব ধরণের অসাবধানতা থেকে হিফাজত করুন। আমিন ৷

জাগো প্রহরী/টিআর

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য