ঝুলানো রুটি : শত জনমের উসমানি সভ্যতা


আইনুল হক কাসিমী ৷৷

নিজের খাবার বিলিয়ে দেব অনাহারীর মুখে--এই গুণটি যদি কোনো জাতির কপালে তকমা এঁটে দিতে হয়, তাহলে সে জাতি সম্ভবত তুর্কি-উসমানি। এরা বড় মহৎপ্রাণ। তাদের প্রতিটি কাজে ছিল মহত্বের পরিচয়। অভাবীদের ব্যাপারে সবসময় দৃষ্টি রাখত তারা। প্রতিবেশীকে উপোষ রেখে নিজে পরিতৃপ্ত হয়ে রাতযাপনকারী ব্যক্তি মুমিন নয়--এই হাদিসের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়েই তারা অভাবীদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত। তুর্কিদের মধ্যে এ সভ্যতা আজও অম্লান। 

বাজার থেকে রুটি কিনতে গেলেও তারা অভাবীদের খেয়াল করত। প্রয়োজনের অতিরিক্ত রুটি খরিদ করে, অতিরিক্তগুলো দোকানের ঝুলানো ঝুড়িতে ভরে রাখত। যাতে অভাবী কেউ এসে হাত লাগিয়ে রুটি নিয়ে যায়। আর প্রতিটি দোকানে ঠিকই একটা ঝুড়ি লটকানো থাকত। গরিবদের জন্য আলগানো রুটি তুলে রাখার জন্য। গরিবদের জন্য তুলে রাখা এই রুটিকে 'askıda ekmek' বা 'ঝুলানো রুটি' বলা হতো। 

উসমানিদের এই রীতি আজও তুরস্কে বিদ্যমান।তবে লটকানো ঝুড়ির বদলে সে জায়গা দখল করে নিয়েছে পলিথিনের ব্যাগ। এখনও তুরস্কের রুটির দোকানদাররা দোকানে একটি পলথিনের ব্যাগ রেখে দেয়। ক্রেতারা রুটি কিনে কিছু রুটি সেই ব্যাগে ভরে রাখে, গরিবদের জন্য। বিবিসির একজন রিপোর্টার লিখেছেন, তিনি নিজে ইস্তাম্বুল শহরের এশীয় অংশে দেখেছেন, একজন ক্রেতা দুটি রুটি কিনে একটি ব্যাগে ভরে রেখে গেছেন। 

উসমানিদের এই স্বর্ণোজ্জ্বল সভ্যতা তুরস্কের সীমানা পেরিয়ে আজ ছড়িয়েছে সুদূর ইউরোপে। ইতালিতে আজও অনেকেই  কফির কাপ কিনলে অতিরিক্ত আরেকটি কাপ কিনে ঝুলিয়ে রাখে। যাতে প্রয়োজনগ্রস্থ কেউ সেটা নিতে পারে। ইতালিয়ানদের এই মানবিক সভ্যতা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু এই সভ্যতা যেহেতু উসমানিদের থেকে প্রাপ্ত, সেহেতু আসল প্রশংসার হকদার উসমানিরাই। কারণ, উসমানি সাম্রাজ্য তার শৌর্যবীর্যকালে ইতালিরও একাংশ শাসন করেছিল। আর তখন থেকেই এ সভ্যতা ইতালিতে স্থানান্তরিত হয়েছিল। 

যুক্তরাষ্ট্রের ভারমেন্ট রাজ্যের মিডলবুরি কলেজের অধ্যাপক পেভিহ আরমানুস 'মধ্যপ্রাচ্যে ইসলাম-খ্রিষ্টীয় সম্পর্ক ও খাদ্যের ইতিহাস' নামক গবেষণাললব্ধ প্রবন্ধে লিখেছেন--

ঝুলানো রুটির এই সভ্যতার শেকড় রয়েছে উসমানি আমলের সাথে। এবং এই সভ্যতার ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে ইসলামের পাঁচটি রুকনের অন্যতম জাকাতের সাথে। আবার তুরস্কে খাবারদান করা একটা আলাদা গুরুত্ববহন করে। কেননা, ইসলামি বিশ্বাসমতে, রুটির সাথে জীবনের সম্পর্ক রয়েছে। আর জীবন বাচানোর তাগিদ হলো একটি সম্মানি বিষয়। সুতরাং খাদ্যগ্রহণের ক্ষেত্রে রুটির প্রয়োজনীয়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

যুগের পালে দিনবদলের হাওয়া লেগেছে। এজন্য আগের সবকিছুই এখন যুগোপযোগী হয়ে সামনে আসছে। তুরস্কের দোকানে লটকানো ঝুড়ির 'ঝুলানো রুটি'র সভ্যতাকেও চির অম্লান রাখার ডাকও আজ ছড়িয়ে পড়েছে  আকাশসংস্কৃতিতে। ইন্টারনেটে
yemek.com নামে একটা তুর্কি সাইট আছে। এখানে তুর্কিদের এই বলে উদ্বুদ্ধ করা হয়--'এসো, যারা ফুটপাতে জীবনযাপন করে এবং রুটি খরিদ করার সামর্থ রাখে না, আমরা তাদের সাহায্য করি'। 

পুনশ্চ : আমিও বলি, এসো! তুর্কিদের এই সভ্যতা থেকে আমরাও শিক্ষাগ্রহণ করি। যারা কিছু খেতে পারে না, তাদের মুখে যথাসাধ্য খাবার তুলে দিই। আর এটা হতে পারে লকডাউনে অচল বিশ্বের এই দুঃসহ সময়ে। 
---------
সূত্রাবলি : 
https://bit.ly/2YGohky (তুর্কপ্রেস)
 ttps://bbc.in/2YUl0yv (বিবিসি-আরবি)

জাগো প্রহরী/ফাইয়াজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য