সারাদেশে ‘ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন’কে প্রতিহত করার ঘোষণা দিলেন অর্নব


জাগো প্রহরী ডেস্ক:

ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন নামের দলটি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের পোষা বিরোধী দল হিসেবে কাজ করছে উল্লেখ করে তাদের প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি রাকিন আবসার অর্নব। তিনি এ নিয়ে একটি দীর্ঘ ফেসবুক স্ট্যাটাস দেন মঙ্গলবার (১২ মে) রাত সোয়া বারোটায়। জাগো প্রহরী টোয়েন্টিফোর ডটকমের পাঠকদের জন্য স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হল।

অর্নব লিখেছেন, “দেশব্যাপী সকল সংগঠকের বাড়িতে পৌঁছে গেছে কাফনের কাপড়। এই নিয়ে বেশ তোলপাড়। এর মাঝে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে বেশ কিছু ব্লগার সহযোদ্ধাদের। জাগরণ মঞ্চে মানুষের ভিড় তখন বেশ কম। রাজশাহীর আলুপট্টি মোড়ে আমরা ধিরে ধিরে এসে জড়ো হচ্ছি। হঠাৎ একটি মটরসাইকেল দ্রুত গতিতে এসে একটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে গেলো। তেমন গুরুতর আহত হইনি কেউ। কাদের মোল্লার রায় প্রায় আমাদের পক্ষে তখন। শুধু ফাঁসির আদেশ আসা বাকি। আমরা ভেবেছিলাম এই ধরনের চোরা হামলা বন্ধের দিকেও বোধহয় সরকার এবার গুরুত্বারোপ করতে পারে। ইতোমধ্যে শোনা গেলো কিছু ইসলামপন্থী সংগঠন আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে আমরা নাকি “ব্লগ দিয়ে ইন্টারনেট চালিয়ে” ইসলাম ধর্মের অবমাননা করছি। কিছুদিন বাদেই দেখা গেলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধন করে উলটো আমাদেরকেই জেলে পুরে দিতে শুরু করা হলো। আমাদের তখন আর বুঝতে বাকি ছিলো না যে আওয়ামী লীগ সরকার তার দ্বিপাক্ষিক খেলা শুরু করে দিয়েছে।

এর ফলাফল হিসেবে পুরো জাতির সামনে আবির্ভূত হলো ২০১৪ সালের ৫ই মে। বাংলাদেশের সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলে ইসলামী শাসনতন্ত্র কায়েম করতে চাওয়া হেফাজত ইসলাম নামে একটি সংগঠন ঢাকা দখল মিশনে অবতীর্ণ হলো। নিরুপায় আওয়ামী লীগ সরকার সকল গণমাধ্যম বন্ধ করে তাদের দমন করতে এবং সংবিধান অক্ষত রাখতে সমর্থ হয়েছিলো। সেদিন এমনটাই বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছিলো বাংলাদেশের মানুষকে।

২০১৮ সালে আমরা নতুন একটি চিত্র দেখতে পাই। চিত্রটি বলার আগে একটা গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক শাখাওয়াত আলী খান আমাদের একটা গল্প শুনিয়েছিলেন। গল্পটা অনেকটা এরকম, ‘একটি লোক একদিন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। সামনে একজন ভিক্ষুককে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেন। ভিক্ষুকটির পায়ের মাংস গলে পচে যাচ্ছে। লোকটি ভাবলেন তার চিকিৎসার প্রয়োজন। তাই ভিক্ষুকটিকে বললেন চলো আমি তোমার পায়ের চিকিৎসা করিয়ে দেব। প্রতিউত্তরে ভিক্ষুকটি জানান তার পায়ের চিকিৎসার দরকার নেই সম্ভব হলে তাকে কিছু টাকা দিয়ে যাওয়ার জন্য। লোকটি জিজ্ঞেস করলেন কেন তার চিকিৎসার দরকার নেই। উত্তরে ভিক্ষুকটি বললেন, তার পায়ের যদি চিকিৎসা করানো হয় তবে তিনি আর ভিক্ষা পাবে না।’

এই গল্পটির শেষে স্যার সবসময় বলতেন, ‘সাম্প্রদায়িকতা হচ্ছে বিশ্বে বিরাজমান সকল ডানপন্থী সরকারে পায়ের সেই ক্ষতের মতন। তাদের যদি ক্ষত না থাকে তবে তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার অথবা ভোট ভিক্ষার মাধ্যমও থাকবে না।’ ঠিক একইভাবে হেফাজত ইসলাম আওয়ামী লীগের পেটের ভিতর ঢুকে হারিয়ে যাওয়ার নাটক মঞ্চায়িত হবার পর সরাসরি ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের নামে নতুন আরেকটি নাটকের সূত্রপাত হয়। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে যখন আওয়ামী লীগ ব্যতীত কোনো সংগঠনকে নির্বাচনী মাঠে দাঁড়াতেই দেওয়া হয় নাই, ঠিক সেই সময় হাতপাখা নিয়ে আবির্ভূত হয় আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় পোষা বিরোধী দল ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন। ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে আওয়ামী লীগ ব্যতীত নির্বিঘ্নে প্রচার কার্য চালিয়েছে একমাত্র এই সংগঠনটি। রাতারাতি জামাত-শিবির, হেফাজত বিলীন হয়ে এই সংগঠনটির শক্তিশালী হয়ে ওঠা এখনো পরিষ্কার নয় বাংলাদেশের মানুষের কাছে।

২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে আবারো প্রায় রাতারাতি আবির্ভাব ঘটে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের একটি ছাত্র সংগঠনের যার নাম ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন। যাদের নামের মাঝেই পরিষ্কার রয়েছে যে তারা একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক ভাবে স্থাপনের লক্ষে কাজ করছে মাত্র। শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করে ব্যবহার করাই হবে যার প্রধানতম লক্ষ্য। যেমনটি করে গিয়েছে ছাত্র শিবির এবং অন্যান্য ধর্মীয় ছাত্র সংগঠনগুলি। অর্থাৎ ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর পুনরুত্থানের লড়াইয়ে ‘ছাত্র বলি মঞ্চ’। ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে আওয়ামী লীগের কাছে চূড়ান্ত ছাড় পেয়েও কূল কিনারা না করতে পেরে প্রায় ভাসমান অবস্থায় সংগঠনটি এসে ভিড়েছে প্রগতিশীলতার চাদরে ঢাকা ‘রাষ্ট্রচিন্তা’ নামক আরেকটা কূল-কিনারাহীন ভাসমান কিছু মানুষের সংগঠনের সাথে।

দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ছাত্র মৈত্রীর সাবেক নেতা সাংবাদিক কাজলসহ রাষ্ট্রচিন্তার তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। এই করোনা পরিস্থিতিতেও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন অব্যাহত রেখেছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। বিগত ১০ তারিখ এই ঘটনার প্রতিবাদে একটি মানব বন্ধনের ডাক দেয় রাষ্ট্রচিন্তা সংগঠনটি। আমার সংগঠন বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীকে সংহতি প্রকাশের জন্য আহ্বান করা হয়। সেখানে উপস্থিত হয়ে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি ইকবাল কবীর লক্ষ্য করেন ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক সংগঠন ইসলামী শাসনতন্ত্রের উপস্থিতি। তাই রাষ্ট্র বিরোধী সংগঠনের সাথে একই মঞ্চে দাঁড়াতে অসম্মত হন এবং ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী ছাত্র মৈত্রীর সকল কর্মী সমর্থকদের বিভ্রান্ত না হওয়ার লক্ষে একটি বিবৃতিও প্রদান করেন। এই বিবৃতি প্রদানের পর থেকেই মূলত আসল ঘটনার সূত্রপাত।

বাংলাদেশের অন্যতম স্বৈরাচার এরশাদ পতন আন্দোলনের প্রধানতম দিশারী এবং একই সাথে উগ্র সাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবিরের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাহসের আঁতুড়ঘর বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীকে সাম্প্রদায়িক এবং স্বৈরাচারী সরকারের মদদদাতা হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন। বদর যুদ্ধের শপথ নিয়ে বাংলাদেশকে বদরের মত রক্তাক্ত প্রাঙ্গণে পরিণত করার লক্ষে ছাত্র মৈত্রীর বিরুদ্ধে প্রায় যুদ্ধে নেমে পড়েছে ইসলামী সাম্প্রদায়িক এই সংগঠনটি।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর একজন সৈনিক হিসেবে কিছু বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা উচিত, বাংলাদেশের স্বৈরাচার এরশাদকে ছাত্র মৈত্রীর সৈনিকেরা যেই সাহসিকতার সাথে বাংলাদেশের ছাত্র সমাজকে সঙ্গে নিয়ে পরাজিত করেছিলো তারা আজ আওয়ামীলীগ স্বৈরাচারী সরকারের পার্ট ওয়ান বিরোধী দল হিসেবে টিকে আছে মাত্র। আর যেই মওদুদীবাদের আগ্রাসনকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে ছাত্রমৈত্রী টিকে ছিল ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে। যেই ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা বিরুদ্ধে ব্রিগেডের অন্যতম নাম ছাত্র মৈত্রী। সেই সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদের ঐতিহ্য যারা ধারণ এবং লালন করে, যারা বাংলাদেশের মাটিকে পাকিস্থান, আফগান, তুরস্ক অথবা বদরের সাজে সাজাতে চায়। বাংলাদেশের সচেতন জনগণ এবং ছাত্র সমাজ, আওয়ামী লীগের সেই পার্ট বি বিরোধীদলের বিপক্ষে পুনরায় ছাত্র মৈত্রীর পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এবং স্বৈরাচার ও তার সাম্প্রদায়িক সকল শক্তির বিরুদ্ধে দুইপাক্ষিক এই লড়াইয়ে বাংলাদেশকে আরও একবার বিজয়ী করে নিয়ে আসাই হবে ছাত্রমৈত্রীর সৈনিকদের বর্তমানের গুরুদায়িত্ব।

বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সকল সৈনিক এবং সমর্থকদের মনে রাখতে হবে বাংলাদেশকে যদি রক্ষা করতে হয় তবে তা একমাত্র ছাত্র মৈত্রীই পারে। এই দ্বিপাক্ষিক লড়াইয়ের নেতৃত্বদানের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করে আনতে হবে। জয় সর্বহারা। জয় হোক বাংলার শ্রমজীবী মানুষের।”

জাগো প্রহরী/এফ আর

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য