সামর্থ্যবান আলেমরা এগিয়ে এলে বস্তুনিষ্ঠ মিডিয়া গড়া সম্ভব


মুফতি এনায়েতুল্লাহ ।।

মিডিয়াকর্মী হিসেবে অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, কওমি ধারার আলেমদের মতো বৃহৎ একটি কমিউনিটির মিডিয়া সমর্থন প্রায় শূন্যের কোটায়। যাও পাওয়া যায়, সংশ্লিষ্ট মিডিয়ার স্বার্থের জন্য; বস্তুনিষ্ঠতার জন্য নয়। আরও দুঃখের কথা হলো- আলেমদের অনেক রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও সংস্থা কার্যকর থাকার পরও বৈরী মনোভাবাপন্ন কোনো মিডিয়ার সমর্থন আনতে পারেনি।

আগ বাড়িয়ে কোনো মিডিয়া তাদের সমর্থনে এগিয়ে গেলেও আলেমদের প্রয়োজনীয় সহায়তা, সমর্থন মেলেনি। মিডিয়ার ক্ষেত্রে তাদের অনেকটা গুটিয়ে থাকার নীতি পরিলক্ষিত হয়। তবে ব্যক্তি পরিচয়ে দু-চার লাইন খবর প্রকাশ, এক দুই মিনিট কাভারেজ আর সামগ্রিক সমর্থন কিন্তু আলাদা জিনিস। এই পার্থক্যটুকু আলেমরা অনুধাবন যত দ্রুত করবেন, তত মঙ্গল।

আমি এ কথা বলব না, আলেমদের মধ্যে সমাজে প্রভাব বিস্তার করে মিডিয়া প্রতিষ্ঠার মতো সামর্থ্যবান কেউ নেই। এটা মনে করারও কোনো কারণ নেই। যে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে বিনা খরচায় আলেমরা শিক্ষিত করে তুলছেন, হাজার হাজার মাদরাসা-মসজিদ প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করছেন- সেখানে তাদের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই।

তাহলে মিডিয়া হচ্ছে না কেন? সরল উত্তর- প্রয়োজনীয় উদ্যোগ আর উদ্যোক্তার অভাব। এক্ষেত্রে আরও কিছু বিষয় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে, সেগুলো হলো- অন্যকে আস্থায় আনতে না পারা, সত্যিকারভাবেই মিডিয়ার প্রয়োজন না বোঝা ও বিরোধীপক্ষের সমালোচনা সইতে না পারার ক্ষমতা।

গত এক দশকের মিডিয়া জগত পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বন্ধ হওয়া একটি দৈনিক ও টেলিভিশন চ্যানেল রাজপথের আন্দোলনে আলেমদের অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে। পাশাপাশি দৈনিক নয়াদিগন্ত ও দৈনিক ইনকিলাব জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থী ঘরানার বলে পরিচিত।

তারাও সময়ে-অসময়ে আলেম-উলামাদের রাজপথের আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু আলেমদের কোনো যৌক্তিক দাবি-দাওয়ার বিষয়ে তারা নিজেদের পলিসির বাইরে কোনো নিউজ করেনি। এ বিষয়ে জনমত প্রভাবিত করার মতো কোনো সংবাদ, মতামত ও লেখনি তারা প্রকাশ করেনি। আলেমদের দুঃসময়ে তারা পাশে দাঁড়ায়নি।

জাতীয়ভাবে আলেম-উলামাদের অবস্থান বিবেচনায় শীর্ষস্থানীয় ও নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে মিডিয়ার যথাযথ গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রয়োজনীয় উৎসাহ ও নির্দেশনা দিলে একটি নয়- কয়েকটি পাঠকপ্রিয় সংবাদপত্র, দর্শকপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল ও অনলাইন করা সম্ভব। এটা অতিরঞ্জিত কোনো ভাবনা কিংবা কল্পনার ফানুস উড়ানো গালগল্প নয়। এমনটা বিশ্বাস না করারও কোনো কারণ নেই। বরং এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। শুধু ডাক দেওয়ার, উদ্যোগ নেওয়ার, কষ্ট স্বীকার করার লোকের অভাব।

ব্যক্তিগতভাবে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-উলামাদের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় দেখেছি, তারা সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব অনুধাবন করেন, এটা নিয়ে আফসোস করেন। এমন আলাপের সাক্ষী আমি একা নই।

আমার মতো অনেক তরুণ আলেমও। ঢাকার অনেক আলেম তো নিয়মিত আলেম, লেখক ও সাংবাদিকদের ডেকে প্রায়ই চায়ের টেবিলে দেশ-ধর্ম, রাজনীতি, সমাজব্যবস্থা নিয়ে মতবিনিময় করেন। পরামর্শ কামনা করেন, কিছু একটা করতে চান। হাল সময়ে ব্যক্তি কিংবা কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে কিছু অনলাইন গড়ে ওঠেছে। কষ্টের বিষয় হলো- এগুলোর পাশেও কিন্তু আলেমরা দাঁড়াননি। আলেম-উলামা কিংবা এই শ্রেণির লোকদের জন্য প্রতিষ্ঠিত এই ছোট ছোট উদ্যোগকে পরিকল্পনা করে আরও বৃহৎ পরিসরে রূপ দেওয়া যেত।

সেই সামর্থ্য আলেমদের আছে কিন্তু এখানেও তাদের নির্মোহতার বিরল উদাহরণ দেখলাম। তাদের জন্য কিংবা পক্ষে বস্তনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে আক্রান্ত হলে, প্রতিবাদ বা সহানুভূতি জানানোর তাগিদের কথা না নাইবা বললাম- অনন্ত তথ্য দিয়ে, একটু ভালো ব্যবহার করেও তো সহযোগিতা করা যায়, সেটাও তাদের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। অথচ ওই সংবাদের বেনিফেসিয়ারি হচ্ছেন তারা।

পক্ষান্তরে ভিন্ন ঘরানার কিংবা মতাদর্শের সাংবাদিক বিপদগ্রস্ত হলে সর্বাত্মকভাবে তাদের পাশে দাঁড়ানোর অসংখ্য নজির রয়েছে। আলেমরা যে একেবারে মিডিয়া বোঝেন না, এমন নয়। বরং তারা প্রতিপক্ষ ঘরানার সাংবাদিকদের অতিমাত্রায় তোয়াজ করা ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়াকে অনেকে কর্তব্য জ্ঞান করেন। কিন্তু তাদের পক্ষের সাংবাদিকদের মূল্যায়নে তারা কুণ্ঠিত। ভাবখানা এমন, ওতো আমার পকেটেই আছে। এটা বলতে দ্বিধা নেই, বেশিরভাগ আলেম, আলেমদের রাজনীতি, তাদের নেওয়া কর্ম পরিকল্পনা ও পরিচালিত সংগঠনসমূহ মূলধারার সাংবাদিক ও মিডিয়া থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। এক্ষেত্রে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে কিছু আলেম সাংবাদিক। যারা মূলধারার গণমাধ্যমে স্বমহিমায় কর্মরত। যদিও আলেম-উলামাদের একাংশ কিংবা ইসলামি রাজনৈতিক নেতাদের অনেকে তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলেন। ফলাফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে। বারবার আক্রান্ত হলেও আলেমদের পক্ষে কোনো প্রভাবশালী মিডিয়া দাঁড়াচ্ছে না। আর এর খেসারত দিতে হচ্ছে করুণভাবে।

জনমত গঠনের ক্ষেত্রে যেসব মাধ্যম প্রবলভাবে প্রভাব ফেলে, তাদের বেশিরভাগই আলেমদের হাতে নেই। ফলে কারণে-অকারণে ইসলামি বিদ্বেষীরা আলেমদের একহাত নেন, অযাচিত প্রশ্ন উত্থাপন করেন, জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা করেন। খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করিয়ে আলেমদের কর্মপন্থাকে দুর্বল করার দুরভিসন্ধি চরিতার্থ করেন। তাদের জবাব দেওয়ার মতো আলেমদের মাঝে অনেক জনপ্রিয় আলোচক ও দক্ষ লেখক থাকলেও তাদের আলোচনার জন্য ডাকা হয় না। তাদের লেখা ছাপানো হয় না। অন্যদিকে তারাও নেতৃস্থানীয় আলেমদের পক্ষ থেকে প্রাপ্য সম্মান ও মূল্যায়ন না পেয়ে ক্ষোভে-হতাশায় হাত গুটিয়ে রাখেন। এর দ্বারায় কিন্তু আখেরে ক্ষতি হচ্ছে আলেমসমাজেরই।

তাহলে উপায়? খুব সহজ। চলমান উদ্যোগগুলোকে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা। আপনার প্রত্যাশামতো হয়তো দশ লাইন লিখেনি, কিন্তু বিরোধিতা তো করেনি, কিংবা মূলধারার গণমাধ্যমতো আপনাকে স্পেস দেয়নি, এই ছোট উদ্যোগগুলোর বদৌলতে আপনার কথা, ম্যাসেজ কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পাচ্ছে। সুতরাং তাদের পেছনে না পড়ে, এগিয়ে দিতে চেষ্টা করা। সেই সঙ্গে মূলধারার মিডিয়ায় কর্মরত আলেমদের পেছন থেকে সাহস যুগিয়ে, আশা-ভরসা দিয়ে, সম্মান ও মূল্যায়ন করা।

মনে রাখতে হবে, আলেমরা দিন দিন মিডিয়া অঙ্গনে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছে। রাজনীতির মারপ্যাচ কাটিয়ে, সুদূরপ্রসারী কল্যাণময় চিন্তাকে সমাজের অলিন্দে পৌঁছে দেওয়ার জন্য মিডিয়ার প্রভাবকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

এর মাধ্যমে আলেমদের সমাজসেবামূলক কাজ, সমাজহিতৈষি ভাবনা ও সমাজের জন্য আত্মত্যাগের বিষয়গুলো সামনে আসবে। ফলে মানুষ উদ্ধুদ্ধ হবে কল্যাণমূলক কাজের। এটাও একটি দাওয়াতি কাজ, দাওয়াতি মিশন। এখন প্রশ্ন হলো- আমাদের আলেম সমাজ দাওয়াতি কাজের এই অমিত সম্ভাবনা নিয়ে কিছু ভাবছেন কি না!

লেখক: সাংবাদিক,বার্তা ২৪

জাগো প্রহরী/এফ আর

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য