রমজানে মহামারি : ইতিহাস কী বলে?


আইনুল হক কাসিমী ৷৷

৭৪৮ খ্রিষ্টাব্দ। ১৩১ হিজরি। 
উমাইয়া খিলাফতের প্রদীপ তখন নিভু নিভু করছে। খিলাফতের দণ্ডমুণ্ড বাগিয়ে নিতে আব্বাসিরা মরিয়া হয়ে উঠেছে। চারিদিকে তাদের প্রজ্বলিত বিদ্রোহের আগুনের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকাচ্ছে দিনদিন। মরণোন্মুখ উমাইয়া খিলাফতের খলিফা তখন মারওয়ান বিন মুহাম্মদ। এমনই এক ক্রান্তিলগ্নে খিলাফত মস্তবড় এক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। বসরায় দেখা দেয় প্লেগের মহামারি। ইতিহাস যাকে 'মুসলিম ইবনে কুতাবাইবা মহামারি' নামে চেনে। কারণ, এ মহামারিতে প্রথমেই যে ব্যক্তি মারা যান, তার নাম ছিল মুসলিম ইবনে কুতাইবা। 

মহামারির প্রাদুর্ভাব শুরু হয় রজব মাসে। শাবান অতিক্রম করে গিয়ে গড়ায় রমজানে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, রমজানে মহামারির প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করে। বসরা থেকে ছড়ানো মহামারি আর বসরায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; পুরো খিলাফতেই ছড়িয়ে পড়ে। গড়ে প্রতিদিন একহাজার মানুষের জানাজা পড়তে হতো! এমনকী একদিন তো অবস্থা এমন হলো যে, সেদিন প্রায় ৭০ হাজার লোক মারা গেল! অবশ্য আল্লাহর অপার মহিমায়, এ মহামারি শাওয়ালে খতম হয়ে গিয়েছিল। 

উল্লেখ্য, উমাইয়া খিলাফত তার শুরু থেকে শেষ অবধি যে মুসিবতের সম্মুখীন হয়, সেটি ছিল প্লেগের মহামারি। পুরো খিলাফতকে লণ্ডভণ্ড করে দেয় একের পর এক মহামারি। এবং এক্ষেত্রে বলির পাঠা ছিল দামেশক। দামেশকে যেন মহামারির প্রকোপ লেগেই থাকত। যখনই মহামারি দেখা দিত, তখনই উমাইয়া খলিফারা মুক্তবাতাসের খুঁজে চলে যেতেন মরুভূমিতে। বসত গাড়তেন সেখানে। আর এ কারণেই খলিফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিক ইরাকের রাসাফায় এসে ঘর নির্মাণ করেছিলেন। 

৭৪৮ সালে সংঘটিত কুতাইবা ইবনে মুসলিম মহামারিই ছিল উমাইয়া খিলাফতের শেষ মহামারি। এর দুবছর পর ৭৫০  সালে আব্বাসিরা খিলাফত দখল করে। এজন্য ঐতিহাসিকগণের মতে, উমাইয়া খিলাফত পতনের পেছনে অন্যতম নেয়ামক হিসেবে যে যে বস্তু কাজ করেছিল, তন্মধ্যে একটি ছিল উমাইয়া খিলাফতকালে একের পর এক বিধ্বংসী মহামারি। যাইহোক, আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, আব্বাসি আমলে বলতে গেলে মহামারি একেবারে অপ্রতুল হয়ে গিয়েছিল। এটাকে কেন্দ্র করে একটি চমৎকার কাহিনি বর্ণিত আছে–

শামের একটি মজলিসে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন কোনো এক আব্বাসি শাসক। বক্তৃতার এক পর্যায়ে তিনি বললেন–তোমরা আল্লাহর প্রশংসা করো এজন্য যে, যেদিন থেকে আমরা খিলাফতের দায়িত্ব নিলাম, সেদিন থেকেই তিনি তোমাদের ওপর থেকে মহামারির গজব উঠিয়ে নিলেন। মজলিসে ছিল একজন বেপরোয়া লোক। সে বলে উঠল–আরে, আল্লাহ এত বে-ইনসাফ নন যে, আমাদের কপালে মহামারি ও তোমাদেরকে–একই সাথে এই দুই মুসিবত একত্রিত করবেন! 

পুনশ্চ : মুসলিম ইবনে কুতাইবা মহামারির প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল রমজান মাসে। মারা গিয়েছিল রোজ হাজারজনের মতো। বর্তমান বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসও রমজানের নাগাল পেয়ে গেছে। ভয় হয়, নাজানি কী হয়! হে মালিক! পানাহ চাই তোমার কাছে। 

সূত্রাবলি : 
[১] বাজলুল মাউন ফি ফাজলিত তাউন : ৩৬৩, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি। 
[২] আন-নুজুমুজ জাহিরাহ ফি মুলুকি মিসর ওয়াল কাহিরাহ : ১/৩৯৬, আল্লামা ইবনে তাগরি বারদি। 
[৩] আত-তাউন ফিল আসরিল উমাওয়ি : ৬৪, আহমাদ আদাওয়ি।

জাগো প্রহরী/গালিব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য