ইতিহাসে তিউনিসিয়ার মহামারি


আইনুল হক কাসিমী ৷৷

১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দ। 
মুহররমের ১৭ তারিখ। 
তিউনিসিয়ায় দেখা দেয় মহামারি। তিউনিসীয় লোকমুখে যার নাম ছিল–হলুদ বাতাস। এটি ভারত উপমহাদেশে প্রকাশ পাওয়া মহামারি–কলেরার এক অংশবিশেষ ছিল। পাহাড়, সাগর, নদী, নালা, অরণ্য, মাঠ পেরিয়ে; দূষিত বায়ুর গায়ে ভর করে হানা দিয়েছিল সুদূর তিউনিসিয়ায়। এই কলেরার ইতিহাস বড় হৃদয়বিদারক। আজ নাহয় থাক; আরেকদিন বলা যাবে। 

হলুদ বাতাস এতোটাই ভয়াবহ ছিল যে, যে-ই আক্রান্ত হতো এই মহামারিতে, সাথে সাথে তার ডায়রিয়া আর বমি শুরু হয়ে যেত। পাশাপাশি চেহারা হলুদবর্ণ ধারণ করে ফেলত। ব্যস, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুনিয়া ছাড়তে হতো। আর বাঁচলেও বড়োজোর কয়েকদিন। এরপর মরতেই হতো। মহামারিতে খুব কমই লোক জীবন নিয়ে বাঁচতে পেরেছিল। বেঁচে যাওয়াটা আল্লাহর বিশেষ রহমত বৈ আর কিছু ছিল না। তিউনিসিয়ার ইতিহাসে এরকম ভয়ংকর মহামারি আর কখনও দেখা যায়নি।

তখন তিউনিসিয়ার সম্রাট ছিলেন আহমদ বাই বিন মুস্তফা (১৮৩৭-১৮৫৫)। কিছু চিকিৎসকের পরামর্শে রাজধানীতে এসেই তিনি জনসমাগম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। সম্রাট নিজে খুব ভড়কে গিয়েছিলেন। নাজানি তিনি মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান! এজন্য অত্যন্ত কড়া ব্যবস্থাপনায় হোম কোয়ারেন্টাইন যাপন করতে লাগেন। কিন্তু জনসমাগম নিষিদ্ধ করলে কী হবে, একসময় রাজধানী কায়রাওয়ানে এসে হানা দেয় হলুদ বাতাস! মারা যায় অসংখ্য লোক। 

যারা অবস্থাপন্ন ছিল, তারা তো চিকিৎসা চালিয়ে যেতে সক্ষম ছিল। কিন্তু বিপদে পড়ে গিয়েছিল দারিদ্র্যপীড়িতরা। চিকিৎসা করতে তারা ছিল অক্ষম। এগিয়ে আসেন দিলদার চিকিৎসকগণ। তারা বিনামূল্যে দরিদ্রদের চিকিৎসা দিয়ে মহত্বের পরিচয় দেন। সম্রাট আহমদ বাইও এক্ষেত্রে দোহাতে পয়সা খরচ করেন। ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে তিনি দরিদ্রদেরকে খাদ্য, কাপড় ও ওষুধের যোগান দেন। 

প্রায় আটমাস পর্যন্ত মহামারির প্রকোপ ছিল সাধারণ। কিন্তু শাবান মাসে গিয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। দৈনিক দুইশতাধিক লোক মারা যেতে থাকে। এমনকী দেশের অনেক নামকরা আলেম পর্যন্ত মারা যান। বলতে গেলে, তিউনিসিয়া মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। বাতাসে ভেসে বেড়াতে থাকে লাশের গন্ধ। দাফন করতে করতে জীবিতদের হাত অবশ হয়ে আসে। মৃত্যুর বিভীষিকায় সকলের চেহারাই বিবর্ণ হয়ে যায়।

শাইখ আবু নুখবা মুস্তফা বিন আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ বায়রাম ছিলেন তখন তিউনিসিয়ার একজন খ্যাতিমান আলেম, ফকিহ ও বুজুর্গ। তিনি পরামর্শ দিলেন–এমন ৪০ জন নেককার লোক; যাদের নাম মুহাম্মদ, তাদেরকে একত্র করা  হোক। এরপর তারা যাইতুনাহ জামে মসজিদে জড়ো হয়ে, সকাল থেকে দুপুরবেলা পর্যন্ত ৪০ বার সুরা ইয়াসিন পাঠ করবে। এবং সম্মিলিতভাবে অশ্রুবিগলিত নয়নে দুআ করবে। কী দুআ করবে–তিনি নিজ হাতে লিখে দিলেন। 

শাইখের পরামর্শ মোতাবেক ৪০ জন ব্যক্তি যাইতুনাহ জামে মসজিদে জড়ো হয়ে আমল করেন। এরপর হাত তুলে ফরিয়াদ করেন সেই সত্ত্বার দরবারে, যিনি বিপদগ্রস্তের ফরিয়াদে সাড়া দেন বলে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহর মহিমা বুঝা দায়, এরপর থেকেই আস্তে আস্তে মুহামারির প্রকোপ কমতে থাকে। মৃত্যুর সংখ্যাও হ্রাস হতে শুরু করে। এভাবে একসময় একেবারে নির্মূল হয়ে যায়। 

পুনশ্চ : এটি স্রেফ একটি ইতিহাস। করোনাভাইরাসের এই দুঃসময়ে আমল বাতলানোর কোনো প্রেসক্রিপশন নয়। লকডাউন উপেক্ষা করে আবার ৪০ জন মিলে আমল করতে লেগে যাবেন না। পুলিশের প্যাঁদানি খেলে আমি কিন্তু দায়ভার নেব না।

সূত্র : إتحاف أهل الزمان بأخبار ملوك تونس وعهد الأمان--২৭৬, ইবনে আবুজ জাইয়্যাফ

জাগো প্রহরী/ফাইয়াজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য