আফগান সরকারের কঠোর অবস্থান, ঝুঁকিতে মার্কিন-তালেবান চুক্তি



সালমান রাফি শেখ ৷৷

মার্কিন-তালেবান ‘শান্তি আলোচনা’ ছিল দীর্ঘ ও কঠিন, কিন্তু মার্কিন-তালেবান চুক্তির পর যে ‘আন্ত:আফগান’ শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেটা দেখা যাচ্ছে আরও বেশি কঠিন।

তবে, আন্ত:আফগান আলোচনার বিষয়টি যে এখন কঠিন বিষয় হয়ে উঠছে, সেটা শুধু আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ জটিলতার কারণে হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের যদিও আফগানিস্তান থেকে সরে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, এর পরও তারা সবকিছু এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় যাতে ‘যুদ্ধ পরবর্তী’ পরিস্থিতিতেও সেখানে তাদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব বজায় থাকে।

অন্যভাবে বললে, আফগানরা আজ যে ‘সংলাপের স্থবিরতার’ মুখোমুখি হয়েছে, সেটার বড় কারণ হলো অন্তত তিনটি প্রধান পক্ষের মধ্যে ক্ষমতার সংগ্রামটা এখানে দ্রুত প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। এই তিন পক্ষ হলো: যুক্তরাষ্ট্র, তালেবান আর আফগান অভিজাত শ্রেণী।

আফগান অভিজাত শ্রেণি আবার নিজেদের মধ্যে বিভক্ত। ঘানি-আব্দুল্লাহর বিভেদ ছাড়াও বহু আফগান যুদ্ধ কমাণ্ডার এবং রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ রয়েছে, যারা বিভিন্ন সময়ে কাবুল ও তালেবানদের ব্যাপারে তাদের অবস্থান বদলের মাধ্যমে আলোচনার উপর প্রভাব ফেলছে।

একদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র যারা তালেবানদের সাথে চুক্তির বাস্তবায়ন দেখতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনীতি এই চুক্তির উপর নির্ভর করছে। তাদের বর্ধিত আঞ্চলিক নীতিও এর উপর নির্ভর করছে, যেটাকে এখন ‘মধ্য এশিয়া কৌশল’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

এই চুক্তির ভবিষ্যৎ অবশ্য এই মুহূর্তে নির্ভর করছে প্রথম শর্ত পূরণের উপর, পারস্পরিক আস্থা তৈরির জন্য যে ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র আর তালেবানরা একমত হয়েছে। সেটা হলো বন্দি বিনিময়।

কাবুলের অনীহার কারণ হলো তাদের নিজস্ব রাজনীতি – যেখানে তারা তালেবানদেরকে কোনভাবেই আফগান রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিতে দিতে চায় না। কিন্তু তাদের অবস্থানটা এখন যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী অবস্থানে রূপ নিয়েছে। আফগান অভিজাত শ্রেণীর পেছনে বিপুল বিনিয়োগের পর যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদেরকে এ বছর এবং আগামী বছর সহায়তা কাটছাট করার হুমকি দিয়েছে। আর আফগানিস্তানের বাজেটের ৮০ শতাংশই বিদেশী সহায়তার উপর নির্ভরশীল।

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: আফগান সরকার কেন চুক্তি অনুযায়ী চলছে না?

যুক্তরাষ্ট্র যদিও কাবুলকে শান্তি প্রক্রিয়া এবং তালেবানদের সাথে দর কষাকষির বিষয়ে ‘অবগত’ করেছে, কিন্তু কাবুল কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ ছিল না। শুধু তালেবানদের প্রত্যাখ্যানের কারণেই যে কাবুলকে প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছিল, তা নয়, বরং ঘানি সরকারের কোন বৈধতাও ছিল না। তার সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং নির্বাচনের সময়ও অনেকবার পেছানো হয়েছিল।

কাবুল যদিও ‘যৌথ ঘোষণার’ অধীনে চুক্তিকে সমর্থন দিয়েছিল, এবং চুক্তির অংশ না হয়েও এটাকে তারা এগুতে দিয়েছিল কারণ এভাবেই ক্ষমতাসীন ঘানি সরকারের স্বার্থ রক্ষিত হয়েছিল। এখন তারা যেটা নিশ্চিত করতে চায় সেটা হলো তালেবানরা যা চাইবে, তার পুরোটাই যেন তারা না পায়।

বর্তমান ক্ষমতাসীন ‘পশতুন সরকার’ একইসাথে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে রাখতে চায়। আফগানিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতিগত গ্রুপের সাথে বা অন্যান্য ছোট জাতিগত গ্রুপগুরোর সাথে সেটা ভাগাভাগি করাটা তাদের জন্য কঠিন, যদিও তারা অব্যাহতভাবে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির’ বুলি আওড়ে যাচ্ছে।

তালেবানদের বিরুদ্ধে একটা ‘শক্ত অবস্থান’ ধরে রেখেছে কাবুল এবং ঘানির উদ্দেশ্য হলো তার সরকারকে রাজনৈতিকভাবে অপরিহার্য হিসেবে তুলে ধরা। সেই অনুসারে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আব্দুল্লাহকে তালেবানদের সাথে শান্তি প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেয়ার প্রস্তাব দিয়ে তিনি শুধু একটা ‘অন্তর্ভুক্তিরই’ বার্তা দিতে চাচ্ছেন না, একই সাথে সরকারের বৈধতাকেও পোক্ত করতে চাচ্ছেন। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের জায়গাটা অক্ষুণ্ণ রাখতে চান।

আব্দুল্লাহকে মনোনয়ন দেয়ার ঘানির ঘোষণাটি লোভনীয়, কারণ তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন যে: “তার (আব্দুল্লাহ) প্রটোকল হবে ভাইস প্রেসিডেন্টের প্রটোকল পর্যায়ের, তার নিরাপত্তা, বাজেট, তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয় – সব কিছু নিয়ে আলোচনা হতে পারে। আমাদের এখানে পুরোপুরি নমনীয়তা রয়েছে”।

তালেবানরা জানে যে, কাবুল যে রাজনৈতিক খেলা খেলছে, সেটা তাদের ‘বিলম্বিত করার কৌশল’ যেটার মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চায় তারা। কাবুলের সাথে বন্দি বিনিময় আলোচনা থেকে তাদের বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বোঝা গেছে যে, তারা ওয়াশিংটনের মাধ্যমে কাবুলের উপর চাপ দিতে চায়। পুরো শান্তি চুক্তিকে বাতিল করার হুমকি দিয়ে তালেবানরা এখন বল ওয়াশিংটন আর কাবুলের কোর্টে ঠেলে দিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ব্যুরোর প্রিন্সিপাল ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অ্যালিস ওয়েলস সাম্প্রতিক এক টুইটে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক সহায়তা দেয়ার বিষয়টি সেখানে একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার’ গঠনের সাথে জড়িত। এতে বোঝা গেছে যে, কাবুলের রাজনৈতিক খেলা এমনকি ওয়াশিংটনের কাছেও ক্রমেই অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।

ওয়াশিংটনের কাবুল-বিরোধী অবস্থান যদিও তালেবানদের সাথে একই পক্ষে ঠেলে দেয়, কিন্তু এতে কোন সন্দেহ নেই যে শুধুমাত্র তাদের এই অবস্থানের কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোন রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানো যাবে না।

ঘানি যে একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট – যদিও তার প্রতিপক্ষরা এটাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে যাচ্ছে – তবে এই বিষয়টির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে তাকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়াটা কঠিন হয়ে গেছে।

কাবুল এখানে যেহেতু এখন সক্রিয় পক্ষ, তাই যুক্তরাষ্ট্র আর তালেবান উভয়কেই এখন তাদের স্বার্থ ও অবস্থানকে হিসাবে নিতে হবে। যদিও মার্কিন-তালেবান চুক্তি মানতে কাবুল পুরোপুরি অস্বীকার করলে বা মার্কিন-তালেবান চুক্তিকে বদলানোর চেষ্টা করলে তার চরম নেতিবাচক পরিণতি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এ ধরনের পদক্ষেপ নিলে বিদেশী সহায়তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে, ফলে তালেবানদের হাতে পতনের দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে কাবুল।

জাগো প্রহরী/গালিব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য