রক্তের আঁচড়ে লেখা ৫ ই মে; আমার স্মৃতিতে


জুবায়ের রশীদ ৷৷

সেদিন বৃষ্টি ছুলো। গুড়িগুড়ি। রাত ক্রমশ ফুরিয়ে যাওয়ার ঢের পূর্বেই রাহমানিয়ার ভবন এবং সাতমসজিদ চত্বর ছিলো লোকারণ্য। ওই রাতে ঘুমাইনি; আমাদের মনে পড়ে। বিস্তীর্ণ রাত আমরা ব্যস্ত ছিলাম। ফজরের সালাত প্রতিদিনের অভ্যেসের খানিক আগেই পড়ে বের হয়ে পড়ি। মিছিলে মিছিলে। শ্লোগানে শ্লোগানে। আমাদের হাতে ছিলো কালিমাখচিত লাল সবুজের পতাকা। সাতমসজিদ থেকে শিয়া মসজিদ হয়ে আমরা গাবতলি আমিন বাজারের দিকে যাই। 

দুপুর পর্যন্ত ছিলাম গাবতলি। দিবসের প্রথম সংঘাত হয়েছিলো এখানেই। এমপি আসলাম তার বিরাট দলবল নিয়ে এসেছিলো। মাওলানা মামুনুল হক সাহেব ছিলেন আমাদের লিডার। হুজুরের নেতৃত্বে এমপি আসলামকে আমরা ধাওয়া করি। পরে তারা পালিয়ে যায়। 

জোহরের সালাত আদায় করে মতিঝিলের উদ্দেশ্য হাঁটতে থাকি। গাবতলি থেকে মতিঝিল এ পুরো পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিই। ক্লান্ত ছিলাম কিন্তু মনোবল ছিলো শক্ত। শারীরিকভাবে নেতিয়ে পড়লেও চেতনা ছিলো অফুরন্ত। তাই দীর্ঘ পথ স্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত করে রেখেছিলাম। 

আমাদের মিছিলটি যখন বিজয়নগর এলাকায় প্রবেশ করে তখন দেখি চারপাশের পরিবেশ ঘোলাটে। জনতা ছত্রভঙ্গ। এদিক-সেদিক দৌড়াদৌড়ি করছে। আমাদের মিছিলটি ছোট হয়ে যায়। একই ক্লাসের ক'জন আমরা আছি একসাথে। বাকিরা ছত্রভঙ্গ হয়ে কোথায় যেনো চলে গেছে। ঢাকার পথঘাট তেমন চিনি না। গেল বছর মফস্বল থেকে ঢাকা এসে ভর্তি হয়েছি। বিক্ষিপ্ত অবস্থা দেখে আমি ভয় পেয়ে যাই। তখন মোবাইল ব্যবহার করি না বিধায় ভয়টা আরো জড়িয়ে ধরেছে। তাই যেকোনো মূল্যে ক্লাসমেটদের থেকে পৃথক হওয়া যাবে না এমন একটা পণ করি। 

কিন্তু ওরাও তেমন চিনে না পথঘাট। একটা দিশেহারা অবস্থায় আমরা সামনের দিকেই এগুতে থাকি। আমাদের সাথে যে বড় মিছিলটি এসেছিলো তাদের প্রায় সকলেই কাকরাইল মসজিদে চলে যায়। পরে জানতে পারি আমাদের প্রাথমিক অবস্থান থেকে কাকরাইল মসজিদ বেশ কাছেই ছিলো। জামিয়া রাহমানিয়ার যারা কাকরাইল মসজিদে আশ্রয় নিয়েছিলো তারা অক্ষত ছিলো পূর্ণ।

আমরা ক'জন ক্রমশ সামনে এগুতে থাকি। কিন্তু যতোই সামনে যাচ্ছি পরিস্থিতি ততোই অবনতি দেখছি। হঠাৎ একটা বিশৃঙ্খলার ভেতর পড়ে যায়। দেখি সামনে থেকে একদল জনতা দৌড়ে আসছে। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে আমরা দাঁড়িয়ে যাই। তখনই একের পর এক টিয়ারশেল এসে আমাদের সামনে পড়তে থাকে। নাকমুখ প্রচণ্ড জ্বলতে থাকে। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। সকলের সাথে দৌড়ে আমরা একটা গলির ভেতর ঢুকে পড়ি। তখন বেশ কষ্ট হচ্ছে অনুভব করি। কী করব বুঝতে পারছি না। তখন কজন তরুণ তারা ব্যাগ থেকে ক্লোজআপ পেস্ট বের করে আমাদের হাতে হাতে লাগিয়ে দিয়ে বলে মুখে মেখে দিতে। আমরা তাই করি। ধীরে ধীরে চোখমুখের জ্বলন কমে আসে। 

দিশেহারা হয়ে আমরা বিজয়নগর মসজিদে ঢুকে পড়ি। দারুণ ভয় কাজ করছিলো। মসজিদের তিনতলায় গিয়ে এককোণে বসে পড়ি। অযু করে আসরের সালাত করি। নামাজ শেষ করে মসজিদের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। তখন দুচোখে যা দেখেছি তা ছিলো আমার জন্য অবিশ্বাস্য। একে একে আহত জনতাকে কোলেপিঠে করে নিয়ে আসছে। কারো মাথা থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে। কারো পা হয়ে গেছে এফোঁড়ওফোঁড়। আহত মানুষের ক্রমাগত সারি দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি। নিদারুণ ভয় আমাকে অক্টোপাসের মতো পেঁচিয়ে ধরে। স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। এদিকে বুভুক্ষু খিধে দিশেহারা হয়ে যাচ্ছি। মনে পড়ে, এর এক মাস পূর্বে লংমার্চের দিন ছিলো আমাদের জন্য ছিলো অফুরন্ত খাবার পানীয়। কিন্তু আজ সামান্য ক্ষুধা মেটানোর মতো খাবার নেই। একে আল্লাহর পরীক্ষা ছাড়া আর কী বলব। বদরের পর উহুদে যেমন হয়েছিলো মুসলিম বাহিনীর। আল্লাহই সর্বজ্ঞানী।

মাগরিবের সালাত পড়ে বসে আছি। হঠাৎ চারদিকে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। কিছু মানুষ রাস্তার বড় বড় গাছগুলো কেটে ফেলছে। কেউ ঢোল পেটাচ্ছে। হইহট্টগোল দ্বিগুণ হচ্ছে। এরা কারা ছিলো ঠিক জানি না। অনুমান করে বলা শ্রেয় বোধ করছি না। সন্ধ্যার ঘনায়মান অন্ধকার পরবর্তী বিজয়নগর ছিলো প্রকৃত রণক্ষেত্র। কয়েক গাড়ি পুলিশ প্রবেশ করে। এলোপাতাড়ি গুলি আর গ্যাস ছুড়তে থাকে। মসজিদের সামনে বড় একটি ভবন ছিলো। আহা! চোখে দেখেই তাই বলছি, তাদের উপর পুলিশ সেদিন নারকীয় তাণ্ডব চালায়। সরাসরি পায়ে ঠেকিয়ে গুলি করছে। সেদিন তাদের তাণ্ডব থেকে বাদ যায়নি মসজিদও। আর মসজদটি ছিলো লোকারণ্য। মসজিদের দুই ও তিনতলায় গ্যাস ছুড়ে। জানালার কাঁচ ভেদ করে মেঝেতে এসে আছড়ে পড়ে। 

রাত প্রায় দুটো নাগাদ মসজিদেই ছিলাম। তখন হঠাৎ খবর আসে, এলাকার ছাত্রলীগের ছেলেপেলে মসজিদে আক্রমণ করতে আসছে। সন্ধ্যার দিকে স্থানীয় ছাত্রলীগ অফিস পুড়িয়ে দিয়েছে কারা যেনো। খবর পেয়ে আমরা আরো দিশেহারা হয়ে পড়ি। একে তো সারাদিনের ক্লান্তি, মনে জেঁকে বসা ভয় সেইসাথে প্রচণ্ড ক্ষুধা। অনেকটা নিথর হয়ে পড়ে আছি। কারো সাথে যোগাযোগও করতে পারছি না। খবর পাওয়ার পরও চুপচাপ শুয়ে আছি। একটু পর মসজিদের মুয়াজ্জিন এসে পুনরায় খবর দিয়ে গেলো। বললো, মসজিদ থেকে বের হয়ে সমাবেশ স্থলে চলে যেতে। পথঘাট নিরাপদ বলে মসজিদের মুয়াজ্জিন আমাদের আশ্বস্ত করে। 

একে একে সকলে মসজিদ থেকে বের হয়ে যাচ্ছে দেখে আমরা বের হওয়ার জন্য নিচে নেমে আসি। ভয়ে জবুথবু হয়ে আমরা অন্ধকার পথ ধরে হাঁটতে থাকি। ঠিক কোনদিক দিয়ে শাপলাচত্বরে গিয়েছি বলতে পারব না। একে তো রাস্তা অচেনা তার উপর রাতের আলোহীন অন্ধকার। 

শাপলাচত্বরে পা রাখতেই শুরু হয় সাড়াশি অভিযান। অদূর থেকে পুলিশ জলকামান ও গ্যাস ছুড়ছে। জীবনের সকল আশা তখন ছেড়ে দিয়ে জনতার সাথে সামনে এগুতে থাকি। দৌড়ে যাওয়ার কোনো উপায় ছিলো না। কারণ, আমাদের সামনে আরো অগণিত মানুষ। পিঁপড়ার গতিতে সবাই একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে এগুচ্ছে যে যতোটুকু পারছে। আর সাউন্ড গ্রেনেড! প্রথমবার যখন মাথার উপর সাউন্ড গ্রেনেডের আওয়াজ শুনি সহসা দাঁড়ানো থেকে মাটিতে বসে পড়ি। কী বিকট ধ্বনি। আত্মাকে নড়বড়ে করে দেয়।

শাপলাচত্বর তখন জনশূন্য। এতো অগণিত মানুষ কোথায় আশ্রয় নিয়েছিলো সে রাতে জানি না। আমি একটি ব্যাংকের নিচতলায় আত্মগোপন করেছি। অসংখ্য মানুষে গিজগিজ করছিলো ব্যাংকটি। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছিলো তখন। পুলিশের ছোড়া গ্যাসে চোখমুখ ভারি জ্বলছিলো। কলমের শক্তি নেই আমাদের সে মুহূর্তের বর্ণনা দেওয়ার। কিন্তু এখানেও শেষ রক্ষা হলো না। কিছুক্ষণ পরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেশ অনেকগুলো গাড়ি ব্যাংকের সামনে এসে জড়ো হয়েছে। তাদের ধারণা ছিলো, ব্যাংক লুট হবে। একযোগে ব্যাংকের ভেতর গ্যাস ও জলকামান ছুড়তে থাকে। মোটা কাঁচ ভেদ করে বিকট শব্দে ভেতরে প্রবেশ করছে। সর্বাধিক কষ্ট হয়েছিলো তখন। পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় গ্যাসের যন্ত্রণা ছিলো আমার জন্য অবর্ণনীয়। উপায় না দেখে চোখ বন্ধ করে ব্যাংকের ভেতর থেকে বাহিরে বেরিয়ে আসি। অসংখ্য র্যাব পুলিশ চারদিক ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। বের হতেই শুরু হয় এলোপাতাড়ি লাঠিচার্জ। দৌড়াতে থাকি আর পিঠে পড়তে থাকে একের পর এক লাঠির আঘাত। আল্লাহ বাঁচিয়েছেন, তখন তারা গুলি ব্যবহার করেনি। পুরো রাস্তায় আগুন জ্বলছিলো। কোনোরকম নিজেকে বাঁচিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছি।

সেখান থেকে বের হয়ে আরেকটি ভবনের ভেতর প্রবেশ করি। গেইটের নিচ দিয়ে মাটি হেঁচড়ে প্রবেশ করি। তখন জামার পেছেন পুরোটা রক্তে মেখে যায়। আহত কেউ হয়তো এখান দিয়ে প্রবেশ করেছে এবং তখনই রক্তে মাটি ভিজে যায়। পূর্ব থেকে আরো অনেকে আশ্রয় নিয়েছিলো সেখানে। সকাল পর্যন্ত এখানেই ছিলাম। 

ভোরে বের হয়ে যখন রাস্তায় নামি, দেখি এ এক অচেনা শহর। পুরো রাস্তা পানিতে ভেজা। এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আধ পোড়া অসংখ্য সামগ্রী। ঢাকাকে সেদিন পুড়ে যাওয়া একটি বস্তি মনে হয়েছিলো। 

সেই কালো রাতে দূর গ্রামে আমার মা জ্ঞান হারিয়ে ছিলেন। আমরা দুই ভাই ওই আলোহীন শাপলাচত্বরে প্রজ্বলিত আগুনের পাশ দিয়ে জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে ক্রমাগত দৌড়াচ্ছিলাম। বাবাও এসেছিলেন নরসিংদী থেকে। তিনি অবশ্য বিকেলের আগেই বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। আমার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিলো না কোথাও। তখন মোবাইল ব্যবহার করতাম না। রাহমানিয়া সহ সম্ভাব্য সকল জায়গায় যোগাযোগ করছিলেন বাবা। কিন্তু না কোথাও কোনো সন্ধান নেই। এদিকে সন্ধ্যার পর থেকেই টেলিভিশনে প্রচারিত হচ্ছে নরসিংদীর জুবায়ের সহিসংতায় নিহত হওয়ার খবর। মা দাদি সবাই কাঁদে আমার জন্য। বাবা অশ্রুভেজা চোখে বুকে সান্ত্বনা দেন তাদের। সকালে যখন মাদরাসা ফিরি আমার পাঞ্জাবির পেছনে দলা পাঁকানো রক্ত। কিছুটা ভেজা, স্যাঁতসেঁতে। সেই রক্ত আমার না। আমার কোন ভাইয়ের তাও জানি না। রক্ত সর্বকালে সর্বজনে একই রঙ ধারণ করে। 

দিনটি ফিরে এসেছে। প্রতি বছর ফিরে আসবে। ইতিহাসেরর শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই। এখানেই লুকিয়ে আছে দিবসের পরাক্রমতা। শাপলা যুগ যুগ জীয়ে। জীয়ে চেতনায়। জীয়ে সাহসে। 

রক্তের আঁচড়ে রচনা করেছি যে ইতিহাস, খুনের মহিমায় লেখা হয়েছে যে ইন্তেফাদা, শহীদের বুকের কালিতে আঁকা হয়েছে চিরন্তন যে ছবি, আমরা তা হৃদয়ে ধারণ করে বেঁচে থাকতে চাই। আমাদের ইতিহাস ভুলে যাবে যারা আমরা ভুলে যাব তাদের। আমাদের ইতিহাস মুছে ফেলতে উদ্যত হবে যে হাত আমরা তা অক্ষত রাখব না। প্রয়োজনে ফের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে। কতো দালাল দুশমন কতো শত্রু ও স্বজাতি গাদ্দারকে কালের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছি আমরা তার ইয়ত্তা নেই। আমাদের একটিই কালিমা। এ কালিমা কাউকে কোনোদিন থামতে দেয়নি আমারও থামব না। আমাদের ইশতেহারে মৃত্যুই শেষ কথা নয়। 

পরদিন পত্রিকার পাতায় শহীদ জুবায়েরের নাম ছাপা হলো। তার বাড়িও ছিলো নরসিংদী। আমি জুবায়েরের মা বাবা দাদিরা ফিরে পেয়েছে আমাকে। কিন্তু পায়নি সেই জুবায়েরকে তার মা বাবা সাথী ও বন্ধুরা। সেই ভয়াল রাতে শহীদ হওয়া জুবায়েরদের জন্য প্রার্থনা। শাহাদাতের মাকাম দান করুন আল্লাহ।

জাগো প্রহরী/ফাইয়াজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য