শাপলা চত্বর : অপরিণাম দর্শিতার দায়ভার কে নেবে ?


মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ আরমান ৷৷

দীর্ঘদিন যাবত বহুমুখী চক্রান্তের শিকার একজন মজলুম আলেমের নাম মুফতি মুহাম্মদ ওয়াককাস। ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম ঢাকা কেন্দ্রিক তৎপরতা শুরু করার আগে আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী সাহেবের আহবানে জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ায় ঢাকার শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরামকে নিয়ে পরামর্শ সভার আয়োজন করা হয়।

সভার দুই প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ইসলামী রাজনীতির ঝানু দুই মুখ মজলিস নেতা মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী সাহেব এবং ঐক্যজোট নেতা মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব সাহেব। তখনো তারা জমিয়ত নেতার পরিচয় গ্রহণ করেননি।

সভায় মুফতি ওয়াক্কাস সাহেব নতুন কোন ব্যানার তৈরি না করে আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী সাহেবকে অনুরোধ করেন, ‘আপনি নতুন ব্যানার তৈরি না করে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির আমিরের দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেন।'

বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে সেদিন সন্ধ্যায় জামিয়া রাহমানিয়ার আশপাশে পুলিশ অবস্থান নেয় এবং পরদিন সকালে মুফতি ওয়াক্কাস সাহেব রাহমানিয়া থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই তাকে গ্রেফতার করে শেরেবাংলা নগর থানায় নিয়ে যায়। 

একদিন পরেই আল্লামা কাসেমী সাহেবের নেতৃত্বে ‘ঈমান বাঁচাও দেশ বাঁচাও আন্দোলন' নামে নতুন ব্যানার মাঠে নেমে পড়ে এবং তার প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব আমার কাঁধে অর্পিত হয়।

একদিন পর পুলিশ মুফতি ওয়াক্কাস সাহেবকে ছেড়ে দেয়।
ওদিকে আল্লামা শাহ আহমদ শফী সাহেবের খোলা চিঠি পত্রিকায় আসার পর ৯ মার্চ সারা দেশের আলেম-ওলামা হাটহাজারীতে সমবেত হন। হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে নাস্তিক-মুরতাদ বিরোধী আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরদিন নেতৃবৃন্দ ঢাকায় ফিরে মানিকনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ঢাকা মহানগর কমিটি গঠনের প্রস্তুতি সভায় মুফতি ওয়াক্কাস সাহেব প্রস্তাবে আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী সাহেব ঢাকা মহানগর হেফাজতের আহবায়ক এর দায়িত্ব নিতে সম্মত হন। 

রাত সাড়ে আটটায় টিকাটুলির মোড়ে একটি কম্পিউটারের দোকানে বসে আমি ঈমান বাঁচাও দেশ বাঁচাও আন্দোলন এর কার্যক্রম স্থগিত করে ঢাকা মহানগর হেফাজত কমিটি গঠনের নিউজ কম্পোজ করে প্রথম আলো, নয়াদিগন্ত, ইনকিলাব, মানবজমিন আমার দেশ প্রভৃতি দেশের শীর্ষ সারির পত্রিকায় মেইলে দিই এবং যথারীতি গুরুত্বসহকারে নিউজ আসে। 

যদিও মুফতি ফয়জুল্লাহ সাহেব প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলেন তিনি ঢাকা মহানগর হেফাজতের সদস্য সচিব হবেন। কিন্তু তার সেই আশার গুড়ে বালি পড়ে যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব সদস্য সচিবের দায়িত্ব পান।

এর কিছুদিন পর মুফতি ফয়জুল্লাহ সাহেবরা আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী, মাওলানা তাজুল ইসলাম, মাওলানা মঈনুদ্দিন রুহী এবং মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদীর উপস্থিতিতে লালবাগ মাদ্রাসায় মহানগরের সদস্য সচিব পদ পরিবর্তন আনার ছক বাস্তবায়ন করতে চাইলে জমিয়ত নেতা মাওলানা গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম ভাইর পরামর্শে আমরা মিটিংয়ে চতুর্দিক থেকে প্রতিবাদ করি। আল্লামা বাবুনগরী সাহেব হাউজের প্রতিক্রিয়া দেখে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন, ‘আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী আহ্বায়ক এবং মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব সদস্যসচিব নেতৃত্বাধীন যে কমিটি আছে, সেটাই বহাল থাকবে।'

এরপর ৬ এপ্রিলের আগে অনেক কিছু হয়। পর্দার আড়ালে অনেক কিছু প্রত্যক্ষ করি। কীভাবে কীভাবে যেন মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব আর মুফতি ফয়জুল্লাহ ৬ এপ্রিলের আগে এক বিন্দুতে মিলে যান। সেদিন স্টেজে বসেই তারা শাপলা চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করতে চাইলে মুফতি ওয়াক্কাস সাহেব বলেন এভাবে আমাদের শক্তি শেষ হয়ে যাবে। 
আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী সাহেব অবস্থান গ্রহণের পক্ষে যারা ছিলেন তাদেরকে বলেন, আপনারা অবস্থান গ্রহণের যৌক্তিকতা উপস্থাপন করেন। তাহলে আমি অবস্থানের কর্মসূচি ঘোষণা করব। যখন তারা যুক্তি তর্কে পেশে ব্যর্থ হয়, তখন মুফতি ওয়াক্কাস সাহেবের পরামর্শেই পরবর্তী একমাসের জন্য সারাদেশে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। 

৫ মে যত ঘনিয়ে আসে, হেফাজতের উত্তাল তরঙ্গে সারা দেশ যেন কাঁপতে থাকে। আস্তে আস্তে পরামর্শ সভাগুলোতে আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী সাহেব মুফতি সাহেবকে এড়িয়ে যেতে থাকেন। এই বিষয়ে একদিন এশার পরে লালবাগ মসজিদের বারান্দায় মুফতি ওয়াককাস সাহেব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী সাহেবকে বলেন, আপনি ভুল পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন। 

৫ মে শাপলা চত্বরের অস্থায়ী স্টেজে শেষ মুহূর্তেও মুফতি ওয়াককাস সাহেব কাসেমী সাহেবকে বলেন, আপনি ভুল পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন। হেফাজতে ইসলামের সাথে সাথে আলেম-উলামার শক্তিও তছনছ হয়ে যাবে। আমরা যতটা এগিয়েছি, তারচেয়ে অনেক পেছনে চলে যাব। 

সন্ধ্যার আগে প্রোগ্রাম শেষ করার ব্যাপারে মাওলানা আব্দুল লতিফ নিজামী সাহেব এবং মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী সাহেবও আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী সাহেবকে প্রোগ্রামের সভাপতি হিসেবে সমাবেশ শেষ করার অনুরোধ জানান।

৫ মে'র প্রস্তুতি সভায় আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী সাহেব বলেছিলেন, ‘যদি সরকার পড়ে যায় তখন আমরা কী করব?' তখন নব্য জমিয়তী দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নেতা টেবিলে হাত মেরে বলেছিলেন, ‘বাবুনগরী সাহেব! আপনি এটা কি বলছেন? আমরা কি এতদিন ইসলামী রাজনীতি করেছি গরুর ঘাস কাটার জন্য? আমরাই দেশ চালাবো!'

অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, এর কয়েক মাস পর সেই মুফতি ওয়াককাস সাহেব গ্রেফতার হন এবং ১০ মাস জেল খাটেন। 

আরো অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, গত কয়েক বছরে আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী সাহেব এবং আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী সাহেব একাধিকবার যশোর জেলায় দ্বীনী প্রোগ্রামে অংশ নিতে পেরেছেন। কিন্তু যশোরের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও পুলিশ প্রশাসনের বাঁধায় মুফতি ওয়াককাস সাহেব অংশ নিতে পারেন না।

খুবই দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ঢাকার বর্তমান সময়ে প্রধানতম ইসলামী রাজনৈতিক মারকাজ থেকে মুফতি ওয়াক্কাস সাহেবকে কলুষিত করার জন্য বলা হয়েছিল তিনি আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন করবেন। অথচ তাদের সেই মিথ্যার মুখে ছাই মেখে দিয়ে মুফতি ওয়াক্কাস সাহেব ২০ দলীয় জোট থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। কিন্তু নির্বাচনের আগে থেকে নির্বাচনের পরে টানা সাত মাস পর্যন্ত প্রশাসনের বাঁধায় এলাকায় যেতে পারেননি। আজ অবধি তিনি প্রশাসনের বাঁধায় মণিরামপুরের বাইরে যশোরের কোনো দ্বীনী প্রোগ্রামে অংশ নিতে পারেন না।

৫ মে ২০১৩ শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে যা হয়েছে, তার ব্যর্থতা অথবা অপরিণামদর্শিতার দায়ভার উল্লিখিত নেতাদেরকে নিতে হবে। সেখানে শুধুমাত্র মুফতি ফয়জুল্লাহ অথবা মাওলানা মঈনুদ্দিন রুহী নয় বরং প্রোগ্রামের সভাপতি হিসেবে আল্লামা কাসেমী সাহেবকে সবচেয়ে বেশি নিতে হবে। 

লেখক : যুগ্ম মহাসচিব,জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ৷

জাগো প্রহরী/ফাইয়াজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য