আল্লামা বাবুনগরীর বিরুদ্ধে প্রচার করা একটি ছবি ও তার বাস্তব কাহিনী


ইনআমুল হাসান ফারুকী ৷৷

২০১৮ সালের রমজানে আল্লামা বাবুনগরী হাটহাজারী মাদরাসার চাঁদা কালেকশন করতে ঢাকায় যান। প্রায় ১০ দিন হুজুর ঢাকাতেই ছিলেন এবং মাদরাসার জন্য কালেকশন করেন।

মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী সাহেব আমাদেরকে জানালেন, পুরানা পল্টনের সুবহান ম্যানশনে এস.এম.এম নামে একটি নতুন কুরিয়ার সার্ভিস চালু হয়েছে। সে কুরিয়ার সার্ভিসের মালিকদের একজন মাওলানা হানিফ সাহেব। যার বাড়ি হাটহাজারীতে, তিনি কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পানীর পক্ষ থেকে হাটহাজারী মাদরাসার জন্য কিছু অনুদান দেয়ার ইচ্ছে পোষণ করেন। অনুদান গ্রহণের জন্য তিনি আল্লামা বাবুনগরীকে তার অফিসে আমন্ত্রণ জানান এবং সে উপলক্ষ্যে মাওলানা হানিফ সাহেব ইফতারেরও আয়োজন করেন।

২০১৮ সালের ১৯ রমজান। ঐদিন এসএমএম অফিসে যাওয়ার জন্য সময় ঠিক করা হলো । অন্যান্য কালেকশন শেষ করে আসরের পরে হুজুরকে নিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসটির অফিসে যাই। তারা হুজুরকে দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হোন। কোম্পানির সকল শেয়ার হোল্ডার সেখানে ইফতারের জন্য উপস্থিত হন এবং সবাই তাদের রিলেটিভদের আমন্ত্রণ জানান। 

সেদিন ছাত্রসমাজের ইফতার মাহফিলে আজিজুল হক ইসলামাবাদী সাহেবের প্রোগ্রাম ছিলো । তিনি বক্তব্য দিয়ে হুজুরের সাথে ইফতার করার জন্য চলে আসেন। 
ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে একজন ব্যক্তি আসলো। আমি তাঁকে চিনতাম না। উপস্থিত অফিসের একজন ডাইরেক্টর আওয়ামী লীগ নেতা জানালেন তিনি সাঈদী সাহেবের ছেলে শামীম সাঈদী।শামীম সাঈদী জুনায়েদ বাবুনগরী সাহেব হুজুরকে নিজের পরিচয় দেন, বাবুনগরী সাহেব হুজুর তাকে চিনতেন না। তিনি হুজুরের পায়ের কাছে বসেন। 

মাগরীবের নামাজের পর শামীম সাঈদী জুনায়েদ বাবুনগরী হুজুরের সাথে কথা বলতে চান। তিনি বাবুনগরী হুজুরের পাশে বসা অবস্থায় ওনার এক সহকারী আমাদের সকলের অজান্তে ছবি তুলে ফেলেন। তখন বাবুনগরী হুজুর বিষয়টা জানতে পেরে তার ওপর প্রচন্ড রাগ করেন এবং ছবিটি ডিলেট করতে বলেন।

তিনি বললেন, ছবিটা শুধু স্মৃতির জন্য তোলা হয়েছে। অন্য কিছু না। তখন উপস্থিত আজিজুল হক ইসলামাবাদী সাহেব আমি (ইনআমুল হাসান) তাকে ছবিটি ডিলিট করার জন্য বললে তিনি বললেন "আচ্ছা ডিলিট করে দিচ্ছি"। কিন্তু তা ডিলিট করেন নাই

ইফতার মাহফিলে শামীম সাঈদীর উপস্থিতিতে বাবুনগরী হুজুর  বিব্রতবোধ করছিলেন। মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদীও শামীম সাঈদী উপস্থিত হওয়ায় বিরক্তি প্রকাশ করেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে মাদরাসার জন্য অনুদানের চেকটি গ্রহণ করে আমরা সেখান থেকে দ্রুত চলে আসি। 

এটা ছিলো এস,এম,এম কুরিয়ার সার্বিস কোম্পানির একটি ইফতার মাহফিল। মোটেও জামাত শিবিরের মিটিং ছিল না। এখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লোক উপস্থিত ছিলেন। আওয়ামী লীগের অনেক রাজনৈতিক নেতাও এখানে ছিলেন। যদি জামাত শিবিরের বৈঠক হত এত দলের লোক আসতেন না।
দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে তারা ছবিটি ডিলেট করেনি  বরং মিথ্যা কথা বলেছে। এটাই ছিলো ছবির মূল কাহিনী

আরো দুঃখজনক বিষয় হল, রমজানের কিছুদিন পরই শামীম সাঈদী বাবুনগরী হুজুরের সাথে সেদিন ইফতারের সময়ে তোলা ছবিটা ফেসবুকে ছেড়ে দেন। এই কারণে পরের বছর হুজুর আর সেখানে অনুদানের জন্য যাননি। 

এখন প্রশ্ন হলো, ২০১৮ সালের এই ছবিকে পুঁজি করে এখন কেন নানা মিথ্যা কল্প কাহিনী সাজানো হচ্ছে? কেন সরকার বিরোধী প্রমাণ করার জন্য মিডিয়ায়  মিথ্যা নিউজ করানো হচ্ছে এবং বাবুনগরী হুজুরকে জামাতি বানানোর মিথ্যা পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ইফতার মাহফিলে বসার কারণে যদি হুজুর জামাতি হন তাহলে সেখানে অনেক অনেক বড় আওয়ামী লীগের নেতারাও ছিলো তাহলে তো হুজুরকে আওয়ামীলীগও বলা যাবে? 

আসলে এগুলো চক্রান্তমূলক করা হচ্ছে। হুজুরকে আমরা চিনি। উনি সারাজীবন জামাতের বিরুদ্ধে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। বাবুনগরী হুজুর মৌদুদী সাহেবের ভ্রান্ত মতবাদের বিরুদ্ধে এখনো সব সময় ছাত্রদেরকে ক্লাসে আলোচনা করেন। এখনো বাবুনগরী হুজুর তার বয়ান বক্তৃতায় ও লিখনীতে জামাতের ভ্রান্ত মতাদর্শ সম্পর্কে জাতিকে সচেতন করে আসছেন। গত ১ লা জানুয়ারী ২০২০ সনে দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসার বার্ষিক মাহফিলে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতির বিশাল সমাবেশে মৌদুদী ভ্রান্ত মতাদর্শ সম্পর্কে চুল-ছেঁড়া বিশ্লেষণ করেছেন। 

কিন্তু বিষয় হলো যখন ২০১৮ সালে শামীম সাঈদী ফেসবুকে ছবিটি পোস্ট করেছিলো। এতদিন কেন কোন প্রশ্ন করা হলোনা? কিছু তাহকিক না করে ৩ বছর পর এই ছবি সামনে আনা হলো একটি বিশেষ মুহূর্তে ? আর গোপন বৈঠক বলে সেই পুরান ছবি ফেসবুকে প্রচার করে আলেম ও মানুষদেরকে বিভ্রান্ত করার একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন চলছে।

একটি কুচক্রী মহল হুজুরকে সমালোচিত করার জন্য এই ছবিটি দিয়ে জল ঘোলাটে করার জন্য বিভিন্ন পায়তারা করে যাচ্ছে। অথচ বিষয়টি সম্পুর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও অবাস্তব ।

আরেকটি আজীব ব্যাপার, মাসুদ সাঈদীর সাথে বৈঠকের যে কথাটি কুচক্রী মহল প্রচার করেছে তারা সম্পূর্ণ মিথ্যাবাদী। কারণ মাসুদ সাঈদী নামক কাউকে বাবুনগরী হুজুর চিনেনও না, কখনো নামও শুনেননি, দেখাও হয়নি।  কথাবার্তা বৈঠক এটা তো কল্পনা প্রসূত এবং দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মুক্তির ব্যাপারে কোন দাবী বাবুনগরী হুজুর কখনো করেননি এবং করবেনও না। 

আসল কথা হলো, যারে দেখতে নাইরে তার চলন বাঁকা। জেনে রাখুন সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ডেকে সাময়িক সুবিধা নেয়া যায়। কিন্তু সত্য একদিন কথা বলবে।

মোটকথা হলো, একটি কুচক্রি মহল নিজেদের কুপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ২০১৮ সনের ইফতার মাহফিলের এ ছবিটি প্রচার করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে। যেসব চিহ্নিত ষড়যন্ত্রকারীরা এসব কাজ করছে শামীম সাঈদীসহ আরো বহু মানুষের সাথে তাদেরও ছবি রয়েছে। এবং অনলাইনে তাদেরও ছবি ভাইরাল হয়েছে। বাবুনগরী হুজুরের সাথে শামীম সাঈদীর ছবি থাকার কারণে যদি বাবুনগরী হুজুর জামাতি হয়ে যান তাহলে ঐসব ষড়যন্ত্রকারীরাও তো বড় জামাতি কারণ জামাতের অনেকের সাথে তাদেরও ছবি রয়েছে । 

আমি দীর্ঘ পাঁচ বছর যাবত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী হুজুরের খেদমতে থেকে দেখেছি- বাবুনগরী হুজুর সদা সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল-অবিচল আছেন, আমরণ থাকবেন, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ সবাইকে মিথ্যা থেকে বাঁচার তাওফীক দান করুন, আমিন। 

লেখক : In'amul Hasan Faruqi,
একান্ত খাদেম-আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী হাফিযাহুল্লাহু। 
২১/৫/২০২০ খ্রিস্টাব্দ , বৃৃৃৃহস্পতিবার ৷

জাগো প্রহরী/গালিব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ