নাকবা দিবস: ফিলিস্তিন এখন আরও একা

১৯৪৮ সালের ১৫ মে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসরায়েল আর বিতাড়িত হয় ভূমিপুত্র ফিলিস্তিনিরা। ফিলিস্তিনিদের কাছে দিনটি নাকবা বা মহাবিপর্যয় দিবস হিসেবে পালিত হয় ৷

মারুফ মল্লিক ৷৷

ইতিহাসের কিছু চরিত্র সময়ের পাতায় শঠতার চিহ্ন রেখে যায়। সময়ান্তে বদলে যায় চরিত্রগুলোর অবস্থান। কখনো কখনো তা একেবারেই ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতে অবস্থান করে। ভাবনার খোরাক জোগায়, এভাবেও বদলে যাওয়া সম্ভব! আসলে ইতিহাসের স্বাক্ষীরা বিভ্রান্ত হয়। চরিত্রগুলোর অবস্থান বদল হয় না। সময়ে সময়ে মুখোশ খসে পড়ে কেবল। ফিলিস্তিনকে ঘিরে কিছু আরব দেশের অবস্থান ঠিক ইতিহাসের এই চরিত্রগুলোর মতোই। ১৯৪৮ সালে আরবদেশগুলো একজোট হয়েছিল ইসরায়েলের দখলদারত্বের বিরুদ্ধে। ৭২ বছর পর আরব দেশগুলো আবার একজোট হচ্ছে ইসরায়েলের দখলদারত্বের পক্ষে। শুরু থেকে আরব দেশগুলো ইসরায়েলের পক্ষেই ছিল। তাহলে এত যুদ্ধবিগ্রহ কেন? কারণ হচ্ছে, মাঝে কিছু বেয়ারা শাসক চলে আসায় একটু এদিক–সেদিক হয়েছিল মাত্র। তাতেই যুদ্ধ বেধে একাকার। বরং এসব যুদ্ধ ইসরায়েলকে আরও শক্তিমান করেছে। নতুনভাবে বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। তাই যুদ্ধগুলো যে আসলেই ইসরায়েলের বিপক্ষে ছিল, তা ঠাহর করা মুশকিল।

আরব শাসকদের চারিত্রিক শঠতা অনুধাবন করা খুব সহজ কাজ নয়। এর জন্য ইতিহাসের বাঁক পেরিয়ে একটু উঁকি মারতে হবে। ৭২ বছর আগে ১৫ মে আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা হয়। ১৯৪৮ সালের এই দিন ফিলিস্তিনের ভূমিতে গঠন করা হয় ইসরায়েল রাষ্ট্র। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুর্কি অটোমান (আরবি উসমানিয়া, তুর্কি উথমানিয়া কথাটার ইউরোপীয় উচ্চারণ) সাম্রাজ্যের পতন হলে ফিলিস্তিন নামক ভূখণ্ডটি ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন ফিলিস্তিন থেকে চলে যাওয়ার পাশাপাশি প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে ইহুদিদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে ইউরোপে জায়নবাদী আন্দোলন শুরু হওয়ায় ১৮৮০ সালের দিক থেকেই ইহুদিরা দলে দলে ফিলিস্তিনে এসে বসতি গাড়তে শুরু করে। অবশেষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় ইহুদিদের স্বপ্ন বাস্তবে নেমে আসে। ইহুদিদের যেখানে স্বপ্নের বাস্তবায়ন শুরু ফিলিস্তিনিদের জন্য সেখানে বিপর্যয়ের খুঁটি পোঁতা হয়।

ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ১৫ মে এর পর থেকে ফিলিস্তিনিদের কাছে নাকবা এক মহাবিপর্যয়ের দিন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ইহুদি অভিবাসীরা ওই দিন ফিলিস্তিনিদের বাড়ি ও ভূমি দখল করে নেয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ পর্যন্ত ৭ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনিকে উচ্ছেদ করা হয়। দমন–নিপীড়নের মুখে মাত্র দেড় লাখের মতো ফিলিস্তিনি ওই সময় ইসরায়েলে থাকতে পেরেছিল। বাস্তুচ্যুতদের অধিকাংশই জর্ডান, সিরিয়া ও লেবানের উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নেয়। এরপর থেকে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি আর বন্ধ হয়নি কখনোই। ১৯৪৮ এ শুরু হওয়া এই মহাবিপর্যয় এখনো অব্যহত আছে। সর্বশেষ পশ্চিম তীরকে যুক্ত করার এবং জেরুসালেমকে রাজধানী করার ইসরায়েলি প্রত্যয় মহাবিপর্যয়কে আরও ঘনীভূত করেছে।

নাকবার শুরু দিকে আরব রাষ্ট্রগুলো প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিল, এটা সত্য। কিন্তু তত দিনে ক্ষমতার কোন্দল, দুর্নীত, ভোগবিলাসের কারণে শক্তি ও সামর্থ্য হারিয়ে আরবদের সামরিক শক্তি বলতে কিছুই ছিল না। এর শুরু হয়েছিল অটোমানদের পতনের পর থেকেই। অটোমানদের পতনে আরবদের সহযোগিতা ও ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য। অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে দেওয়ার জন্য ইউরোপীয়রা দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপীয়দের সামনে সেই সুযোগ এনে দেয়।

তুর্কি ও আরব দ্বন্দ্বের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইউরোপের শক্তিগুলো দুর্বল অটোমান সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। মুক্ত হওয়ার স্বপ্নে বিভোর আরবরা ইউরোপীয়দের সঙ্গে হাত মিলিয়ে অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে দিলেও ১৯৪৮ সালে এসে দেখতে পায় নিজেদের ভূখণ্ডই দখলে হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই আবিষ্কার করে এক মহাবিপর্যয়ের উপস্থিতি। এই বিপর্যয় রোধের চেষ্টাও করে আরবরা সফল হতে পারেনি। প্রতিবারই যুদ্ধে ইসরায়েলের ভূখণ্ড কমবেশি বেড়েছে। অধিকাংশ আরব দেশের অন্দরমহলেই ইসরায়েলের গুপ্তচরেরা ঢুকে গিয়েছিল। এখনো গিজগিজ করছে। এমনই এক মোসাদের ছদ্মবেশী গুপ্তচর এলি কোহেনকে সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট আমিন আল হাফিজ ডেপুটি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এলি কোহেন ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে কামেল আমিন তাবেথ নাম ধারণ করে সিরিয়ার রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় ঢুকে পড়েন। বলতে গেলে তিনি একাই সিরিয়ার প্রতিরক্ষা শক্তিকে তছনছ করে দেন। যার ফলাফল হচ্ছে ১৯৬৭ সালের আরব ইসরায়েল যুদ্ধে সিরিয়ার গোলান মালভূমি হারানো।

ফিলিস্তিন বিপর্যয়ের কারণ আরব শাসকেরা বিরোধী অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে প্রকাশ্যে ইসরায়েলে পক্ষে অবস্থান নিতে শুরু করেছে। আরব দেশগুলোকে পাশে পাওয়া ইসরায়েলের জন্য বিশাল কূটনৈতিক সাফল্য। আরব দেশগুলো কার্যত ইসরালেয়ের আঞ্চলিক নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করছে প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে ইসরায়েলের বিশ্বস্ত বন্ধু সৌদি আরব। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় মিসর ও উপসাগরীয় দেশগুলো। এই দেশগুলো এখন হামাস, ফাতাহ আন্দোলন, হেজবুল্লাহ, পিএলওকে ইসরায়েলের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদেরও শত্রু ভাবতে শুরু করেছে। এবং তাদের বিনাশ চাইছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বে আরব দেশগুলোর আর যেন তর সইছে না। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের পথে কাঁটা হয়ে থাকা বিভিন্ন সংগঠনের সমূলে উৎপাটন চাইছেন আরব নেতৃত্ব। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শতাব্দীর চুক্তি যারা মানতে চাইছে না বা পশ্চিমা মডেলে ফিলিস্তিন সংকট সমাধানে বিরোধিতা করছে, তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী সৌদিসহ বিভিন্ন আরব রাষ্ট্র।

আরব নেতাদের এই আগ্রহ হঠাৎ করেই শুরু হয়নি। পাঁচ বছর ধরেই তাদের অবস্থান ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। বরং আরব নেতাদের মধ্যে একধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে নিজেদের ইসরায়েল–ঘনিষ্ঠ প্রমাণের। এই ধরনের আচরণে তারা লজ্জিতও না। মিসরের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ফাতাহ আবদেল সিসি ইসরায়েলের জায়নবাদীদের বেশ প্রিয় শাসক। বিশেষ করে ইসরায়েলের ধর্মীয় নেতা রাব্বি ও জেনারেলদের প্রিয়ভাজন তিনি। জেনারেল সিসি মার্কিন ইহুদি সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনাকালে খোলামেলাভাবেই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও ক্ষমতায় আরোহণে নেতানিয়াহুর সহায়তার কথা বলেছেন। জেনারেল সিসিকে দেখে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান শিখেছেন, কীভাবে ইসরায়েলের সহায়তা নিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে হয়। কয়েক বছর আগে আটলান্টিক ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিন সালমান বলেছিলেন, ‘আমাদের শত্রু হচ্ছে আল–কায়েদা, আইসিস, হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরান।’ আল–কায়েদা ও আইসিসের কথা বিন সালমান মুখ রক্ষার জন্য বলেছেন। নতুবা হামাস, হেজবুল্লাহ ও ইরান এসব আরব রাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শত্রু।

সৌদি শাসকদের মুখপাত্র আল রিয়াদ পত্রিকা এক নিবন্ধে বলেছে, এই শত্রুদের মোকাবিলা ও পরাজিত করার জন্য ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি ও সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই। ইরানকে মোকাবিলা করতে ইসরায়েলের নেতৃত্বে জোট গঠন করতে আরব শাসকেরা বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। তাই অদূর ভবিষ্যতে এই ধরনের কোনো আঞ্চলিক জোট হলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। বরং এর জন্য তারা গাজা ও পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের হাতে সঁপে দিতেও প্রস্তুত।

বিশ্বাসঘাতকতার এক মূর্তপ্রতীক হচ্ছে আরব শাসকেরা। এত দিন পর্দার আড়ালে কথাবার্তা হলেও এখন পুরোপুরি ঘোমটা খুলে ইসরায়েলের দখলদারত্ব, উচ্ছেদ, নির্যাতন, খুনকে বৈধতা দিয়ে যাচ্ছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই আরব শাসকেরা জায়নবাদীদের পক্ষেই কাজ করছেন। ফিলিস্তিনে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম এবং প্রধান কাজ ছিল অটোমানদের পতন ঘটানো। এ ছাড়া ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব ছিল না। এর জন্য প্রয়োজন ছিল আরবদের পাশে পাওয়া। আরবরা অটোমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে ইউরোপ ও জায়নবাদীরা যা প্রত্যাশা করছিল, ঠিক সেই কাজটিই করে দেয়। তাই ইসরাইলের সঙ্গে আরব শাসকদের সম্পর্কের উষ্ণতা বৃদ্ধিতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। বরং ধাপে ধাপে তাদের সম্পর্ক আরও পরিষ্কার হচ্ছে—এই যা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই উষ্ণতা চূড়ান্ত নাকবার দিকে নিয়ে যাচ্ছে ফিলিস্তিনকে।

ড. মারুফ মল্লিক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

জাগো প্রহরী/গালিব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ