ভগ্নহৃদয়ের কান্না ও একটি সতর্কবার্তা


শেখ ফজলুল করীম মারুফ ৷৷

ইসলাম গোটা মানবজাতিকে মাদউ মনে করে। কাউকে শত্রু নয় বরং সকলের প্রতি মমতা ও দায়বোধ অনুভব করে। কেউ শিরক করলে, কুফুরি করলে, কবিরাহ গুনাহ করলে বা ইসলামের বিরোধিতা বা ইসলামের শুদ্ধমতের বাহিরে গেলে ইসলাম যতটা না ক্ষুব্ধ হয় তারচেয়ে অনেক বেশি ব্যাথিত হয়।

আর একজন দাঈ? একজন দাঈ কতটা ব্যাথিত হয় তার উদাহরণ রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। 

মানুষের হেদায়েতের জন্য রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতো বেশি ব্যাকুল ছিলেন যে, আয়াত নাজিল হয়েছে,

فَلَعَلَّكَ  بَاخِعٌ نَّـفْسَكَ عَلٰٓى اٰثَارِهِمْ اِنْ لَّمْ يُؤْمِنُوْا بِهٰذَا الْحَـدِيْثِ  اَسَفًا

যদি তারা এই বিষয়বস্তুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করে, তবে তাদের পশ্চাতে সম্ভবতঃ আপনি আক্ষেপ করতে করতে নিজের প্রাণ নিপাত করবেন। (সূরা আল কাহফ (الكهف), আয়াত: ৬)

উম্মাহ এর প্রতি ব্যাথিত হৃদয় নিয়ে ব্যাকুল হয়ে ভগ্ন হৃদয়ে বিনয়ের সাথে  মাধুর্যপূর্ন ভাষায় যুক্তি সন্নিবেশিত দাওয়াতই ইসলামের প্রধান চালিকা শক্তি। এর ওপরে ভিত্তি করেই ইসলাম পৃথিবীর সবচেয়ে বর্ধনশীল ধর্মে পরিনত হয়েছে। এবং দ্রুততার সাথে বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব জয় করেছে।

ইসলাম পৃথিবীতে প্রভাব বিস্তার করার জন্য সবচেয়ে বেশি যে অস্ত্র কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছে তাহলো "উত্তম ব্যবহার"। 

রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলা হয়েছে,
وَمَاۤ اَرْسَلْنٰكَ اِلَّا رَحْمَةً لِّـلْعٰلَمِيْنَ
আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি।
وَاِنَّكَ  لَعَلٰى خُلُقٍ عَظِيْمٍ
আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।

ইসলাম গোটা বিশ্বের সকলকে মাদউ মনে করে। তাদের প্রতি মমত্ববোধ করে। তার হেদায়েতের জন্য উৎকণ্ঠিত হয়ে থাকে। সেজন্য যত বড় পাপী বা অবাধ্যই হোক না কেন ইসলাম তার সাথে নম্রভাষায় কথা বলার নির্দেশ দেয়। আয়াত নাজিল হয়েছে,

فَقُوْلَا لَهٗ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهٗ يَتَذَكَّرُ اَوْ يَخْشٰى
অতঃপর তোমরা তাকে নম্র কথা বল, হয়তো সে চিন্তা-ভাবনা করবে অথবা ভীত হবে। (সূরা ত্বোয়া-হা (طه), আয়াত: ৪৪)

ফেরআউনের মতো অবাধ্য ও পাপীর সাথে নম্রভাষায় কথা বলার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে হজরত মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মতো শীর্ষ একজন নবী ও রাসুলকে।

আর তর্ক করার ক্ষেত্রে ইসলামের মুলনীতি জানিয়ে আল্লাহ বলেন,

اُدْعُ اِلٰى سَبِيْلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ  وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ‌ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِىْ هِىَ اَحْسَنُ‌ؕ اِنَّ  رَبَّكَ هُوَ اَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيْلِهٖ‌ وَهُوَ اَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِيْنَ

আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহবান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে উত্তমরূপে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন উত্তম পন্থায়। নিশ্চয় আপনার পালনকর্তাই ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে বিশেষ ভাবে জ্ঞাত রয়েছেন, যে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে এবং তিনিই ভাল জানেন তাদেরকে, যারা সঠিক পথে আছে। (সূরা আন নাহল (النّحل), আয়াত: ১২৫)

এই হলো ইসলাম। ইসলামের এই চরিত্র দিয়েই ইসলাম বিশ্ব জয় করেছে। এই অস্ত্র এতো বেশি কার্যকর যে, তাতারিদের মতো মানব সভ্যতার সবচেয়ে হিংস্র জনগোষ্টিকেও এই অস্ত্র প্রয়োগ করে এক শতাব্দীর মধ্যে ইসলামের রক্ষকে পরিনত করে ফেলা সম্ভব হয়েছে।

অথচ আমরা?
কারো সাথে মতের ভিন্নতা হলেই হামলে পড়ি। বিশ্রি, অলেখ্য, অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি শুরু করি। নাম বিকৃত করি, নানা ভাবে ট্রল করি। আগ্রাসী শব্দ প্রয়োগ করি, উস্কানিমূলক কথা বলি। সাম্প্রতিক মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী দা. বা. এর ব্যাপারে, এর আগে মুহতারাম জাকির নায়েক দা.বা. সম্পর্কে, মুহতারাম মাওলানা সাদ হাফিজাহুল্লাহ সম্পর্কে, আহলে হাদিস বিতর্কে, জামায়াতে ইসলামী বিতর্কে আমরা যা করেছি তা ইসলামের দাঈ চরিত্রের সাথে কোনভাবেই যায় না। আমাদের আচরন ইসলামের সবচেয়ে সফল কালজয়ী পন্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সর্বশেষ রাষ্ট্রচিন্তার একটি মানববন্ধন নিয়ে ছাত্রমৈত্রীর সাথে সৃষ্ট বিতর্কের প্রেক্ষিতে কেউ কেউ যে আচরন করেছেন তাতে আমরা লজ্জিত হয়েছি। ইসলামপন্থী হিসেবে তাদের কাছে আমরা ছোট হয়ে গেছি। এই বিতর্কে শুরু থেকেই আমরা ভালো অবস্থানে ছিলাম। আমাদের হয়ে তাদের মধ্য থেকে অনেকেই কথা বলছিলো। তাদের আচরনের কারণে তারা দেশের চিন্তক শ্রেণীর পক্ষ থেকেই প্রশ্নের মুখে পড়ছিলো। কিন্তু ইসলামপন্থী পরিচয় দিয়ে কেউ কেউ এমন সব আচরন করেছেন যার দ্বারা তাদের অবস্থানের পক্ষেই যুক্তি মজবুত হয়েছে।

আপনার এই ট্রল, বিকৃতি, ব্যক্তি আক্রমণ, আগ্রাশী শব্দ প্রয়োগ কেবল সংগঠনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে নাই বরং ইসলামপন্থাকেও নেতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। আপনার এই আচরন কেবল সংগঠনেরই ক্ষতি করে না বরং ইসলামের মাধুর্যকে, ইসলামের সৌন্দর্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আপনার একটি আচরনের কারণে যখন কেউ ইসলামকে অসহিষ্ণু বলে মন্তব্য করে তখন  এর অর্থ কি দাড়ায় তা বুঝতে পারেন?

রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারাটা জীবন অকথ্য নির্যাতন সহ্য করে ইসলামের যে সৌন্দর্য ও মাধুর্যময় পরিচিতি গড়ে তুলেছেন তা আপনার আচরনে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কোন মুখ নিয়ে আপনি তাঁর সামনে দাড়াবেন? ভেবে দেখেছেন? 

আমি আর সহ্য করতে পারছি না। ইসলামের সবচেয়ে কার্যকর উপকরণকে যারা এভাবে নষ্ট করে, রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রক্ত-ঘামে তৈরি করা ইসলামের সৌন্দর্যের যারা ক্ষতি করে তাদেরকে আমি আর সহ্য করতে পারছি না।

যারা এগুলো করছে তাদের কাছে ভগ্ন হৃদয়ের বিনীত আবেদন করছি। যদি তারা আমার আবেদনে সাড়া না দেন তো আমার কি করার আছে? তাদেরকে তো আমি জোড় করতে পারবো না। কিন্তু আমি তাদেরকে বয়কট করতে পারবো। 

এখন থেকে যিনি কাউকে নিয়ে কোন রকম ট্রল, বিকৃতি, ব্যক্তিগত আক্রমণ, আগ্রাশী শব্দ প্রয়োগ বা উস্কানিমূলক, খোঁচা দিয়ে পোস্ট করবেন তাদেরকে আমি ফেসবুকে ব্লক করবো ইনশাআল্লাহ। 

এতে কোন উপকার হবে কিনা জানি না তবে আমি তো ইসলামের সৌন্দর্যহানী হওয়া দেখা থেকে মুক্তি পাবো। এটাই আমার শান্তি।

আল্লাহ আমাকে দিয়ে দ্বীনের কোন ক্ষতি হওয়া থেকে রক্ষা করুন।

লেখক : আলেম,গবেষক ও সমাজ চিন্তক

জাগো প্রহরী/ফাইয়াজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য