শাইখুল হাদীস রহ. এর সাথে মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামীর কারাবরণের স্মৃতি


এহসানুল হক ৷৷

আজ ১৯ রমজান। ২০১২ এর এই দিনে আমরা হারিয়েছি শাইখুল হাদীস আজিজুল হক রহ. কে। পবিত্র রমজান মাসে শুধু শাইখুল হাদীস রহ. নন, খতিব উবায়দুল হক রহ. মাওলানা মুহিউদ্দীন খানসহ অনেক বরেণ্য আলেম পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। এই তালিকায় সর্বশেষ যোগ হলেন, মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী। আমরা তাদের সবাইকেই শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। 

শাইখুল হাদীস রহ. এর স্মরণে কিছু লিখার ইচ্ছা আমার আগে থেকেই ছিল। ভেবেছিলাম ২০১২ সনের ১৯ রমজান আমাদের কেমন কেটেছিল সেই কথা লিখবো। কিন্তু নেজামী সাহেবের ইন্তেকালের পর আমার ইচ্ছাটা বদলাতে হলো। স্মৃতির পাতায় জ্বলজ্বল করতে থাকা শাইখুল হাদীস রহ. এর সাথে মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী সাহেব এর সাথে কারাবরণের স্মৃতি পাঠকের সামনে তুলে ধরার লোভ আমি সংবরণ করতে পারলাম না।

২০০১ বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। উলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে সবচেয়ে সফল আন্দোলন এই সময় হয়েছিল। বিরোধীদলগুলো চারদলীয় জোটের ব্যনারে তখন রাজপথেই ছিল। এমন সময় ফতোয়া রক্ষার দাবিতে উলামায়ে কেরাম রাজপথে চলে আসলে আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। 

৩ ফেব্রুয়ারি হরতালের দিনই গ্রেফতার হন মুফতি আমিনী রহ.। পরদিন ছিল রংপুরে চারদলীয় জোটের সমাবেশ। গ্রেফতারি পরওয়ানা মাথায় নিয়েই সমাবেশে যোগ দেন তৎকালীন আন্দোলনের শীর্ষনেতা শাইখুল হাদীস রহ.। সমাবেশ থেকে ফেরার পথেই গ্রেফতার হন তিনি, সঙ্গে আরও গ্রেফতার হয়েছিলেন আব্দুল লতিফ নেজামী, মুফতি ইজহারসহ আরও অনেকেই।

সেদিনের স্মৃতিচারণ করে মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামি বলেন, রংপুর থেকে চারদলীয় জোটের মহাসমাবেশ শেষ করে আমরা ঢাকার পথে রওয়ানা হওয়ার পর পথে আমাদেরকে জানানো হলো যে মুফতি আমিনী সাহেব গ্রেফতার হয়েছেন। এক গাড়িতে শাইখুল হাদীস সাহেব, মুফতি ইজহার সাহেব, মাওলানা সাখাওয়াত সাহেব, এ আর এম আব্দুল মতিন সাহেব, আমি ও হুজুরের এক খাদেম আব্দুল মুমিন ছিলাম। 

আমরা তখন মুফতি আমিনী সাহেবের গ্রেফতারের খবর শুনেছি। আমরা গ্রেফতার হব কি হব না এটা তখনও আমাদের মাথায় নেই। আমরা যখন ঢাকার পথে অনেক দূর এগিয়ে এসেছি তখন প্রথমে এক জায়গায় থামানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, আমরা বুঝতে পারিনি যে আমাদেরকে গ্রেফতারের চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা ডাকাত-টাকাত মনে করেছিলাম। কিন্তু গাজীপুর চন্দ্রা এসে দেখি রাস্তা একেবারে কয়েকটা ট্রাক এলোপাথারি ফেলে ব্লক করে রাখা হয়েছে। আমাদের গাড়ি তখন বাধ্য হয়েই থেমে গেল। আর থামতে না থামতেই হাজির হয়ে গেল ডিবি পুলিশ। আমাদের গাড়ির সবাইকেই গ্রেফতার করা হলো।

সেখান থেকে আমাদেরকে গাড়িসহ নিয়ে আসা হলো গুলশান থানায়। আমরা সবাই এক সাথেই থাকলাম। পর দিন আমাদেরকে গুলশান থানা থেকে কোর্টে আনা হলো। আমাদেরকে কোর্টে হাজির করা হয়নি, আমরা হাজতখানার মধ্যেই ছিলাম। জামিন হলো না। হাজতখানার ভেতরে আমিনী সাহেবসহ আরও যারা গ্রেফতার হয়েছিলেন তাদের সবার সাথে দেখা হলো। সেখান থেকে জেলখানা। জেলখানায় আমরা দুই তিনদিন থাকলাম। শাইখুল হাদীস সাহেব, মুফতি আমিনী সাহেব, মুফতি ইজহার সাহেব, জুনাইদ আল হাবিব, সাখাওয়াত সাহেবসহ আমরা সবাই একসাথেই ছিলাম। পরে আমাদেরকে বরিশাল ও আমিনী সাহেবকে রংপুর পাঠিয়ে দেয়া হয়।

বরিশালের পথে যেদিন রওনা হলাম সেদিনের কথা মনে পড়ে। শাইখুল হাদীস সাহেবকে একটা মাক্রবাসে উঠানো হলো। আমাদেরকে তখন হ্যান্ডকাফ পরানো হয়েছিল। এসব জায়গায় হ্যান্ডকাফ পড়ানোর নিয়ম হলো একটা দুইজনকে পরানো হয়। তারা শাইখুল হাদীসের মত এত বড় আলেম, এত বৃদ্ধ একজন মানুষের হাতে হ্যান্ডকাফ লাগাতে দ্বিধাবোধ করেনি। একটার মধ্যে দুইজন করে তো, হুজুরের সাথে আমাকে দিল। শাইখুল হাদীস সাহেবের বাম হাত আর আমার ডান হাতে তারা হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিল। মাইক্রোবাসে হুজুর ডানপাশে আর আমি বাঁপাশে বসেছি। তখন এমন অনেক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখতে হয়েছে। বরিশালের পথে ছুটলো গাড়ি। আমাদের গাড়ি যখন ফেরীতে উঠলো, শাইখুল হাদীস সাহেব তখন বাথরুমে যেতে চাইলেন। হুজুরকে এ অবস্থায় ধরে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। হুজুরতো পরিচিত মুখ। সারা দেশবাসী হুজুরকে চিনে। সমস্ত মানুষ ভীড় করে সেই দৃশ্য দেখছিল।  

জেলের সময়টা আপনাদের কেমন কেটেছিল জানতে চাইলে মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী বলেন, জেলের সময়টা আমাদের খারাপ কাটেনি। আমরা হাসি আনন্দেই দিন কাটিয়েছি। আমাদেরকে ফাঁসির সেলে রাখা হয়েছিল। ফাঁসির সেলে নিরাপত্তা একটু বেশি। সাধারণত আসামিকে কেউ দেখতে গেলে তখন আসামিকে গেটে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু ফাঁসির আসামিদের কাউকে দেখতে গেলে তাদেরকে গেটে আনা হয় না। বরং দর্শনার্থীকে ফাঁসির সেলের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। অবশ্য আমাদেরকে তারা গেটে নিয়ে আসতো। ফাঁসির আসামীদের সেল থেকে অন্যান্য সেলগুলো সম্পূর্ণ আলাদা। 

জেলখানার একটা নিয়ম হলো সপ্তায় সপ্তায় তারা জায়গা পরিবর্তন করে। এক সপ্তাহ আমি শাইখুল হাদীস সাহেবের সাথে থাকতে পেরেছিলাম। কাছ থেকে দেখেছি হুজুরের সবর, ধৈর্য। এত কষ্ট কিভাবে তিনি হাসি মুখে বরণ করেছিলেন তা আমার দেখার সুযোগ হয়েছিলো। আমাদের জেলখানার সময়ে আরেকটা মনে পড়ার মত দৃশ্য হয়েছিল, আমাদের যখন জামিন হলো তখন আমাদের সাথেরই আরও কিছু মানুষের জামিন হলো না। শাইখুল হাদীস সাহেব, আমিনী সাহেব, মুফতি ইজহার সাহেব, আমার, তারপর সাখাওয়াত সাহেব এর জামিন হলো। কিন্তু কিছু মানুষের জামিন হলো না। তখন অন্যদের ছেড়ে আসতে কি পরিমাণ কষ্ট যে হয়েছিল তা ভোলার মতো না।

আমাদের আকাবিরগণ দ্বীন ইসলামের জন্য এভাবেই ত্যাগ স্বীকার করেছেন। জেল জুলুম সহ্য করেছেন কিন্তু কখনো বাতিলের সাথে আপোষ করেননি। তাদের আপোষহীন চেতনা আমাদের বুকেও ধারণ করতে হবে। তাদের দেখানো পথে চললেই আসলে সফলতা। শাইখুল হাদীস ও আব্দুল লতিফ নেজামী দুইজনই আজ আমাদের মাঝে নেই। ইসলামের খেদমতে তাদের এই ত্যাগ ও কুরবানিকে আল্লাহ পাক কবুল করেন। এবং তাদের জান্নাতের উচুঁ মাকাম দান করেন।

লেখক : সহকারী সম্পাদক,মাসিক রাহমানী পয়গাম ৷

জাগো প্রহরী/ফাইয়াজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য