জনাব গোলাম মওলা রনির কিছু ভ্রান্ত চিন্তা


খালেদুজ্জামান খালেদ ৷৷

ইদানিং সাবেক সাংসদ জনাব গোলাম মওলা রনি-র ফেসবুক ষ্ট্যাটাস নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে এটা নিয়ে প্রচণ্ড ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন। করোনা নিয়ে তিনি যা লিখেছেন তা নিঃসন্দেহে কুরআন বিকৃতির নামান্তর। আসলে তিনি যে ধরনের মডারেট মুসলিম তাতে তার দ্বারায় এ ধরনের লেখা অসম্ভব কিছু নয়। 

প্রায় পাঁচ মাস পূর্বের কথা। পল্টন তোপখানা রোডস্থ মেহজাবিন টাওয়ারের বার তলায় তার অফিসে গিয়েছিলাম। যোহরের সময় ছিলো। একসঙ্গে যোহরের নামায আদায় করি। এরপর পরিচয় দিয়ে তার রুমে প্রবেশ করি। প্রায় পৌনে এক ঘন্টার মত সময় দেন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয়। চা নাস্তা করিয়েছেন। অল্প সময়ের মধ্যে নিজের ব্যক্তিগত অনেক চিন্তাধারা শেয়ার করেন। নিজের ছেলের বিয়ের ব্যাপারে ঘটকালির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু পাত্রী পক্ষ রাজি না হওয়ায় তার সে কাজ করে দিতে পারিনি।

সে সময় তার কিছু চিন্তাধারার সঙ্গে আমি দ্বিমত পোষণ করি। তার একটি চিন্তা ছিলো ইসলাম ধর্মের নিজস্ব কোনো সংস্কৃতি নেই। ধর্ম স্রেফ কিছু বিশ্বাস ও আচার আচরণের নাম। প্রত্যেক অঞ্চল ও জাতির সংস্কৃতি তাই যা তারা যুগ যুগ ধরে পালন করে আসছে এবং সময় ও যুগের চাহিদায় তা পরিবর্তনশীল। 

আমি তার এই অস্পষ্ট ও অপূর্ণ ব্যাখ্যার সঙ্গে প্রচন্ড দ্বিমত পোষণ করলাম। আমি বললাম, তাহলে, আরবের উকাজ মেলায় বংশ গৌরবগাথা কবিতা প্রতিযোগিতা, সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সৎ মাকে পিতার পরিত্যক্ত সম্পদের ন্যায় বন্টন করে নেয়া, পালকপুত্রসহ ইত্যাদি যেসব রীতিনীতি আরব সমাজে যুগযুগ ধরে চর্চিত হয়ে আসছিল ইসলাম সেগুলোকে নিষিদ্ধ করল কেনো? 

অগ্নিপূজার ইরান, আর ইয়াযগিরদ পূজার পারস্যের সঙ্গে ইসলামের সংঘাত লাগলো কেনো? মদীনায় হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ সাঃ কেনো মদীনাবাসীদের পূর্ব পালিত মেহরাজান দিবস নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দুই ঈদ উদযাপনের রীতি চালু করলেন? 

তাহলে হযরত উমর ফারুক রাযি. এর ইয়্যাকুম ওয়া যিয়্যাল আয়াযিম তথা তোমরা অনারবি আচার ও প্রথা থেকে বেঁচে থাকো এর অর্থ কি? ইসলাম কি প্রত্যেকটি জাহেলী ও ইয়াহুদী প্রথার বিরুদ্ধাচরন করার নির্দেশ দেয়নি? 

পরিশেষে বললাম, ধর্মকে ঘিরেই বিভিন্ন অঞ্চলে সংস্কৃতি ও সভ্যতা গড়ে উঠেছে। ধর্ম ছাড়া আপনি কোনো সংস্কৃতি সভ্যতা দেখতে পাবেন না। তবে কাল পরিক্রমায় ধর্ম বিকৃত হওয়ার পাশাপাশি সংস্কৃতি ও সভ্যতাও বিকৃত হয়েছে। ভারতবর্ষ কেন্দ্রিক সকল সভ্যতার গোড়া ও উৎস জৌন ও হিন্দু ধর্মাচার। 

তার মতে ভারতের মুসলমানদের জীবনাচার আর ইরান ও আরবের মুসলমানদের জীবন পদ্ধতি এক হবে না। বাঙ্গালী নারীদের পর্দাপ্রথা আর আরবের পর্দাপ্রথা এক নয়। শালীন পোশাক পরিধান করে বাঙ্গালী নারীরা যেকোনো বাঙ্গালী প্রথা পালন করতে পারে। যে নারী বাংলাদেশে শাড়ী পড়বে সে নারী আরবে গিয়ে হিজাব আমেরিকায় গিয়ে তাদের পোশাক পরিধান করতে পারে। 

আমি বললাম, তাহলে কি আমরা এদেশে বসে পেশাব আর ইউরোপে গিয়ে দাঁড়িয়ে পেশাব করব? আরবে গিয়ে দাড়ি বড় রেখে আমেরিকায় গিয়ে সে দাঁড়ি কেটে ফেলতে পারব? তাহলে ইসলামের স্বকীয়তা থাকল কোথায়?  

ইসলামের স্বকীয়তা যেনো অনৈসলামিক কৃষ্টি কালচার দ্বারা পরিবর্তন না হয় এজন্য মুসলমানদের জন্য দারুল হারব বা অমুসলিম দেশে বসবাস করার বিষয়ে ইসলামের স্বতন্ত্র মাসয়ালাই আছে। আমি তাকে বললাম, অন্তত ইন্টারনেট থেকে শায়খ সালিহ আর-মুনাজ্জিদের ফতোয়া দেখলেই বুঝতে পারবেন বিষয়টি কতটা স্পর্শকাতর। 

যাইহোক তার কথাবার্তা দ্বারা বুঝলাম তিনি স্যার সাইয়েদ আহমদের মডারেট ইসলাম ও মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির সর্বধর্ম সমন্বয়ের চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত।

লেখক : বিভাগীয় সম্পাদক,মাসিক মদীনা ৷

জাগো প্রহরী/ফাইয়াজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য