মাওলানা নেজামীর অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার



জাগো প্রহরী : মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী রহ. ৮৪ বছরের জিন্দেগিতে ইসলামী রাজনীতিতে প্রায় ৬০ বছর ধরে সক্রিয় ছিলেন ৷ সময়ে সময়ে রাজনীতির মারপ্যাচ দেখেছেন ও বুঝেছেন ৷ বর্তমানে যারা ইসলামী রাজনীতি করছেন,তাদের জন্য তার সাক্ষাৎকারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ৷ ইতিহাস থেকে পথচলার পাথেয় ৷

হযরতের অপ্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন মুফতি আমিনী সাহেব রহ. এর নাতি,বর্তমানে জামেয়া আল-আজহার মিশরে অধ্যয়ণরত আশরাফ মাহদী ৷ প্রথম পর্ব সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ জাগো প্রহরীর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

তাঁর সাথে আমার সর্বশেষ আলাপের দিনটা ছিল ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯। রাজনীতির বিভিন্ন অধ্যায় নিয়ে নেজামী রহ. এর দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চেয়েছিলাম সেদিন। নিজের ব্যাপারেও কথা বলেছিলেন। সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরলাম-আশরাফ মাহদী 


আশরাফ : রাজনীতিতে আপনার আগমন কিভাবে? মূলধারার রাজনীতিতে কবে থেকে সক্রিয় হয়েছেন?

নেজামী : মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছি স্বাধীনতার পর। যখন বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সুযোগ তৈরী হয়েছিল। কিন্তু এর অনেক আগে থেকেই রাজনীতির ময়দানে আমার বিচরণ শুরু। ছাত্র জমানায় আমি জমিয়তে তলাবায় আরাবিয়ার সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। 

আশরাফ : জমিয়তে তলাবা বলতে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসুদ সাহেবরা যেই সংগঠন করতেন সেটা?

নেজামী : না, সেটা ভিন্ন সংগঠন। ১৯৬১ সালের কথা। তখন নরসিংদীর যে মাদরাসায় আমি পড়তাম সেখানে ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিলাম। আর মেধবীদের সংগঠন হওয়ায় তলাবায়ে আরাবিয়া আমাকে খুজে নেয়। ১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরে তলাবায়ে আরাবিয়ার একটি কাউন্সিল হয়েছিল। সভাপতি হয়েছিলেন মাওলানা মহিউদ্দিন খান সাহেব। বাংলা ও আসামে এই ছাত্র সংগঠনটা তখন বেশ পরিচিত। তাছাড়া এখন যেমন ছাত্র সংগঠনের কাজই হচ্ছে রাজনৈতিক কোন দলের লেজুরবৃত্তি করা, তখন সেরকম ছিল না। তলাবায়ে আরাবিয়া একটি আদর্শিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতির চর্চা করতো। সেকারণে তৎকালীন নেযামে ইসলামের নেতারাও তাই এই সংগঠনের সাথে যুক্ত শিক্ষার্থীদের কদর করতেন। আমরাও তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখতাম। খতিবে আযম, আতহারী আলী খান ও মৌলভী ফরিদ আহমদ তখন নেযামে ইসলামের বড় নেতা।

আশরাফ : নেযামে ইসলাম পার্টির রাজনীতি তখন কেমন দেখেছেন?

নেজামী : নেযামে ইসলাম শব্দটা প্রথমে জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের একটা শ্লোগান ছিল। পরবর্তীতে এই নামে একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম তৈরী করা হয়।
এবং নেযামে ইসলামের ব্যানার থেকেই ১৯৫৪ সালে গঠিত যুক্তফ্রন্টে মুসলিম লীগের সাথে জোট করে জমিয়ত নেতারা। কিন্তু ওলামায়ে কেরামের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে এই জোট দিয়ে ইসলামী নেযামের দিকে যাওয়া সম্ভব না। 

তখন জমিয়তকে আরো বড় পরিসরে সংগঠিত করতে নেযামে ইসলাম পার্টিকে সামনে আনা হয়। যাতে এই সংগঠনের মধ্যে এসেই জেনারেল শিক্ষিত ইসলামপন্থীরাও রাজনীতি করার ও নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পায়। কোন জোটে যাওয়ার প্রয়োজন না হয়।

আশরাফ : পার্টিতে সে সময় ওলামাদের অংশগ্রহণ কেমন ছিল?

নেজামী : নেযামে ইসলাম পার্টিতে পাকিস্তানের ওলামারা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ না করলেও এটাকে নিজেদের দল ভাবতেন। নেযামে ইসলাম থেকেও রাজনৈতিক সভাগুলোতে ওলামাদের গুরুত্ব সহকারে দাওয়াত দেওয়া হত। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৮ পর্যন্ত সময়টা ছিল নেযামে ইসলামের স্বর্ণযুগ। বহু এমপি, মন্ত্রী, স্পিকার এই দলের নেতাকর্মী ছিলেন। ইসলামী রাজনীতিতে তখন তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। জামায়াতে ইসলামী তখন মাত্র সংগঠিত হচ্ছে। ১৯৫৬ সালে জামায়াত দাওয়াতী কার্যক্রমের মাধ্যমে মাঠে এসেছিল।

আশরাফ : একই দল থাকার পরও জমিয়ত ও নেযামে ইসলাম পার্টি পৃথক কেন হয়? নেযামে ইসলাম পার্টি পাকিস্তানের রাজনীতি করার পরও তাদের উইং জমিয়তের সাথে শেখ সাহেবের ভাল সম্পর্ক কিভাবে গড়ে উঠে?

নেজামী : এটা আরো পরের ঘটনা। আসলে নেযামে ইসলাম যে জমিয়ত থেকে এসেছে সেই জমিয়ত পরবর্তীতে অতটা সক্রিয় ছিল না। নেযামে ইসলাম পার্টির জমিয়ত ছিল জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম। যা পাকিস্তান জমিয়ত বলে পরিচিত। এ দলের আলেমগণ থানবী সিলসিলার সাথে ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

আর ১৯৬৭ সালে মুফতি মাহমুদ রহ. যে জমিয়ত গঠন করেন তার সাথে মাদানী সিলসিলার ঘনিষ্ঠতা ছিল। যার উত্তরসূরী এখন পাকিস্তানের মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেব।

এটা মূলত ভারতে মাদানী রহ. এর জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের সিলসিলা। এই জমিয়তের সাথে থানবী সিলসিলার জমিয়ত বা নেযামে ইসলামের দূরত্ব সেই ৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় থেকেই ছিল। অতএব ১৯৬৭ সালে নতুন করে পৃথক হওয়ার মত কিছু ছিল না।

আশরাফ : এই সিলসিলাগত পার্থক্যের প্রভাব স্বাধীনতা পূর্ব রাজনীতিতে পড়েছিল?

নেজামী : বলা যায়। কারণ মাদানী সিলসিলার জমিয়তের সাথেই শেখ সাহেবের ভাল সম্পর্ক ছিল। তবে সে সময় মাহমুদ রহ এর জমিয়ত শুধুমাত্র দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করত। রাজনীতি করতো না। মুফতি মাহমুদ রহ. শেখ সাহেবের সাথে বেশ কয়েকবার মিটিংও করেছেন। এবং পূর্ব  পাকিস্তানের জমিয়তের নেতকর্মীদের শেখ সাহেবের পক্ষে থাকতে বলেছেন। যার ফলে স্বাধীনতার পর অন্য সমস্ত ইসলামী সংগঠনের রাজনীতি নিষিদ্ধ হলেও জমিয়তকে শেখ সাহেব দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দিয়েছিলেন।

আশরাফ : থানবী ধারার ওলামায়ে কেরাম বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই কেন রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়েছিলেন? নেযামে ইসলাম পার্টি কি তাহলে ওলামাদের আস্থা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল?

নেজামী : গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছো। এর পেছনে আসলে অনেকগুলো কারণ ছিল। পাকিস্তানের সামরিক শাসনের ফলে দেশে সুস্থ রাজনীতির পরিবেশ বিনষ্ট হয়। এবং ওলামাদের আস্থাহীনতার  বড় কারণ ছিল নেযামে ইসলামের বিভক্তি। পাকিস্তানের সামরিক সরকার যখন নির্বাচন দেওয়ার চিন্তা শুরু করে তখন রাজনৈতিক দলগুলো পুনরায় সংগঠিত হতে থাকে। নেযামে ইসলামের নেতাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়, জোট করবে নাকি স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে যাবে। একপক্ষের মতে, যেহেতু অনেকদিন দেশে রাজনীতির পরিবেশ ছিলনা তাই এখন সকল ইসলামপন্থীরা একত্রিত হয়ে জোট করলে আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যাবে। অন্যপক্ষের মতে, নেযামে ইসলামের ব্যানারের উপরই আস্থা রাখা উচিত। এই মতবিরোধকে কেন্দ্র করে অনেক ওলামারা তখন নিস্ক্রিয় হয়ে যান। পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের নিয়েও ওলামাদের মাঝে বিরক্তি ছিল। ইয়াহইয়া খানের বিরুদ্ধে শামসুল হক ফরিদপুরি সাহেবের হুংকার তো আমরাই দেখেছি।

আশরাফ : তাহলে ওলামাদের নিস্ক্রিয়তা কি স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে থেকেই ছিল?

নেজামী : পরিস্থিতির কারণে স্বাধীনতার আগে থেকেই অনেক ওলামারা রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়গুলো থেকে দূরে সরে যান। এটা সাধারণ জনগণ থেকে নিয়ে শুরু করে অনেক বড় বড় বুদ্ধিজীবীদের বেলাতেও ঘটেছে। যেটাকে অনেক বাম বুদ্ধিজীবীরা এখন একাত্তরের নিস্ক্রিয়তা বলে ওলামাদের দোষ দিতে চায়। এই নিষ্ক্রিয়তা আসলে যুদ্ধের এক বছর আগে থেকেই শুরু হয়েছিল।

আশরাফ : সত্তরের নির্বাচনে নেযামে ইসলামে শেষ পর্যন্ত তাহলে কি ভূমিকায় ছিল? বিভক্তির ফলাফল কি দাড়ায়?

নেজামী : এমন বিপর্যয়ের সময় বিভক্তির চড়ামূল্য দিতে হয় নেযামে ইসলাম পার্টিকে। ১৯৬৯ সালে নির্বাচনের আগে ইসলামী সমমনা দল নিয়ে একটা "ইসলাম পসন্দ" জোট হয়৷ যেখানে নেযামে ইসলামের একদল নেতারা ছিলেন। আরেকদল চলে যায় পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক লীগ(পিডিবি)তে। আরেকদল থেকে যান নেযামে ইসলামে। পিডিবির নেতৃত্বে ছিলেন মুসলিম লীগের নুরুল আমীন সাহেব। নেযামে ইসলামের প্রবীণ নেতা সৈয়দ মোসলেহ উদ্দিন সাহেব ও মাওলানা ফরিদ আহমদও চলে আসেন পিডিবিতে।
৭০ এর নির্বাচনে একই সিটে আতহার আলী সাহেব নেযামে ইসলাম থেকে ও মোসলেহ উদ্দিন সাহেব পিডিবি থেকে দাড়িয়েছিলেন। অথচ দুইজনই নেযামে ইসলামের নেতা ছিলেন। এইসব কারণে নির্বাচনে নেযামে ইসলামের ভরাডুবি হয়। মুসলিম লীগের অনেক নেতাকে সাথে নিয়ে পিডিবিও সুবিধা করতে পারেনা। শেখ সাহেব তখন একাই আওয়ামীলীগ ধরে রাখেন। একক নেতৃত্বে দলকে জিতিয়ে আনেন।

আশরাফ : সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামিলীগের বিরোধীদল হওয়ার কারণে নেযামে ইসলাম পার্টিকে অনেকে "স্বাধীনতা বিরোধী" বলতে চায়। এটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

নেজামী : এখানে একটা ব্যাপার বুঝতে হবে, রাজনৈতিক বিরোধিতা আর সশস্ত্র বিরোধিতা এক জিনিষ না। নেযামে ইসলাম স্বাধীনতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে কোন অবস্থান নেয়নি। ব্যক্তিগতভাবে নেযামে ইসলামের কেউ কেউ পাকিস্তানপন্থী ছিলেন। শেখ সাহেব তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছিলেন। এরপর ক্ষমাও করেছেন। আর পার্টির মধ্যে থেকে কেউ স্বাধীনতার বিরোধিতাকে নেযামে ইসলামের অবস্থান বলতে পারেনি। কারণ ৭০ এর নির্বাচনে শেখ সাহেব জেতার পর আওয়ামিলীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে আহ্বান জানিয়েছিল নেযামে ইসলাম। অফিশিয়াল স্টেটমেন্টও দেওয়া হয়েছিল। এটাই নেযামে ইসলামের দলীয় অবস্থান ছিল। 

আশরাফ : তাহলে এই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যগুলো হাইলাইট কেন করা হল না? 

নেজামী : দেশের পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ায় তখন বক্তব্যগুলো সেভাবে সামনে আসেনি। অস্থিরতা শুরু হওয়ার পর আরো অনেক জরুরী বিষয়ও স্পষ্ট করা যায়নি। যেমন শেখ সাহেবের ৭ই মার্চের ভাষন স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা বক্তব্য ছিল নাকি জিয়ার ২৭ মার্চের ঘোষণার মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা এসেছে এটাও অস্পষ্ট ছিল। যুদ্ধের মত রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়ের সময় একটা রাজনৈতিক দলের বক্তব্য অত হাইলাইট করার সুযোগ থাকেনা।

আশরাফ : এবার তাহলে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে আপনার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের আলোচনায় আসা যাক...
নেজামী : হ্যা চলো। এই শফিক! ওদেরকে চা দিছো?...

চলবে... ( ১ম পর্ব শেষ )

জাগো প্রহরী/ফাইয়াজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য