করোনায় মহাসংকটে বিপুল ক্ষতির মুখে ভারত


জাগো প্রহরী : দিল্লি, কলকাতা, চেন্নাই, ভেলোর, বেঙ্গালুরু সহ ভারতের বড় শহরগুলোর বেসরকারি হাসপাতালে গেলেই ছবিটা স্পষ্ট হয়। কান পাতলেই শোনা যাবে বাংলায় কথাবার্তা। কারণ বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বহু মানুষ সেখানে ভর্তি।  শুধু বাংলাদেশ নয়, বহু বিদেশি ভরিয়ে রাখেন এই হাসপাতালগুলো।

তারা ভারতে যান শুধুমাত্র চিকিৎসা করাতে। কম খরচে ভালো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও উন্নত মানের চিকিৎসা পরিকাঠামোর সুযোগ নিতে। আবার অনেকে কেরালায় যান আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার জন্য।

সে জন্যই মাত্র কয়েক মাস আগে ভারতের নীতি আয়োগ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য পর্যটন বা হেলথ ট্যুরিজমকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

বলা হয়েছিল, অর্থনীতির গ্রাফে ১২টি 'চ্যাম্পিয়ন সেক্টরে'র মধ্যে স্বাস্থ্য পর্যটন অন্যতম। কিন্তু করোনার প্রকোপ এবং তার জেরে লকডাউনের কারণে সেই স্বাস্থ্য পর্যটন সম্পূর্ণ মুখ থুবড়ে পড়েছে। আরও চিন্তার বিষয় হলো, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এই সেক্টরে অর্থনৈতিক উন্নতির কোনও লক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। যার প্রভাব সার্বিকভাবে ভারতীয় অর্থনীতির উপরে পড়বে বলেও মনে করছেন অনেকে।

প্রতি বছর ভারতের বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালে লাখ লাখ বিদেশি চিকিৎসা করাতে আসেন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১২ সালে চিকিৎসা করানোর জন্য ভারতীয় ভিসা চেয়েছিলেন দেড় লাখ বিদেশি। মাত্র চার বছরে সংখ্যাটি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়। ২০১৬ সালে চিকিৎসার জন্য ভিসা নিয়েছেন চার লাখেরও বেশি মানুষ। আর ২০১৯ সালে সেই সংখ্যা তারও দ্বিগুণ হয়েছে।


বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, ইরান, ইরাক, ওমান এবং আফ্রিকার বেশ কিছু দেশ থেকে সব চেয়ে বেশি নাগরিক ভারতে চিকিৎসা করাতে যায়। এ ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া এবং অ্যামেরিকা থেকে অনেকে যান। তবে সব চেয়ে বেশি যায় বাংলাদেশের নাগরিকরা। ২০২০ সালে সরকার আশা করেছিল শুধুমাত্র স্বাস্থ্য পর্যটন থেকে ভারতের বাৎসরিক আয় হবে ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার। কিন্তু করোনা এবং তার জেরে লকডাউনের কারণে ২০২০ সালের প্রথম পাঁচ মাসে সেই আয় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

বিশ্লেষণে ঢোকার আগে এক দেখে নেওয়া যাক গত কয়েক বছরে স্বাস্থ্য পর্যটন থেকে ভারত কত টাকা আয় করেছে। সরকারি হিসেব বলছে, ২০১৫ সালে এই খাতে ভারত আয় করেছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৭৭ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকায়। ২০১৯ সালে লাভের অঙ্ক একই অনুপাতে বেড়েছে। যা দেখে ২০২০ সালের টার্গেট ঠিক করা হয়েছিল।

কলকাতায় স্বাস্থ্য পর্যটনের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত শমীক ভট্টাচার্য। তিনি জানিয়েছেন, ''গত এক বছরে শুধুমাত্র বাংলাদেশ থেকেই লাখ দেড়েক নথিভুক্ত রোগী ভারতে গেছেন চিকিৎসা করাতে। এর বাইরেও বহু ব্যক্তি ভারতে পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সে দেশে গিয়েছিলেন চিকিৎসা করাতে। স্বাস্থ্য পর্যটনে যাদের নাম নথিভুক্ত হয়নি।

২০২০ সালের প্রথম তিন মাসে মনে হচ্ছিল, এ বছর স্বাস্থ্য পর্যটনে আরো বেশি লোক পাওয়া যাবে। কিন্তু মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে টান পড়তে শুরু করে। এখন একজনও বিদেশি রোগী নেই। এ বছরের শেষ পর্যন্ত বাইরে থেকে কেউ আসবেন বলে মনে হচ্ছে না। কারণ, কোনো ফোন কল আসছে না।''

বেসরকারি হাসপাতালগুলোও একই কথা বলছে। ভারত জুড়ে ছড়িয়ে আছে অ্যাপোলো হাসপাতালের চেইন। তাদের হিসেব বলছে, শুধু কলকাতাতেই প্রতি মাসে অন্তত তিন হাজার বিদেশি চিকিৎসা করাতে যান। যার ৬০ শতাংশ বাংলাদেশের নাগরিক। আপাতত সেই সংখ্যাটি শূন্য। চেন্নাইয়ের একটি বিখ্যাত বেসরকারি হাসপাতাল তাদের আউটডোর বন্ধ করে দিয়েছে।

সরাসরি স্বীকার না করলেও, সূত্র জানাচ্ছে, ওই হাসপাতালে প্রতিদিন যত রোগী আউটডোরে যেতেন, তার অন্তত ৫০ শতাংশ বিদেশি এবং ভিন রাজ্যের রোগী। রোগী না আসার কারণে এবং করোনার ভয়ে আউটডোর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটা কেবল একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিত্র নয়। দেশ জুড়ে বহু বেসরকারি হাসপাতালেই একই ঘটনা ঘটছে।

দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতি বছর যত সংখ্যক বিদেশি ভারতে আসেন, তার পঞ্চাশ শতাংশ দক্ষিণ ভারতে যান। চেন্নাই এবং সংলগ্ন অঞ্চলের অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতালে তারা চিকিৎসা করান। এ ছাড়া বাংলাদেশ, নেপাল এবং আফগানিস্তানের বেশ কিছু রোগী কলকাতাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেন। আফ্রিকার দেশগুলি থেকে যারা আসেন তাদের অনেকেই মুম্বইয়ে চিকিৎসা করান। দিল্লিতেও অনেকে আসেন। তবে রাজধানীতে যারা আসেন, তাদের অধিকাংশই অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট ফর মেডিক্যাল সায়েন্সে চিকিৎসা করানোর চেষ্টা করেন।

শমীকের বক্তব্য, মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে একে একে বিদেশের বিমান বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভিসাও দেওয়া হচ্ছে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এখন গোটা ভারতে আর বিদেশি রোগী নেই। যারা আছেন, তারা আগে এসেছিলেন, এখন আটকে পড়েছেন। খুবই সমস্যার মধ্যে আছেন। সমস্যা হল, লকডাউন উঠলেও আপাতত বিদেশি রোগীরা আসবেন বলে মনে হচ্ছে না। কারণ, যারা চিকিৎসা করাতে আসেন, তারা তিন থেকে ছয় মাস আগে এজেন্টদের সঙ্গে কথা বলে সব ব্যবস্থা করে ফেলেন।

এ বছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের বুকিংয়ের জন্যও কেউ ফোন করছেন না। বোঝাই যাচ্ছে, বিদেশি রোগীরা আপাতত সফর করতে ভয় পাচ্ছেন। এবং সেই ভয় আগামী কয়েক মাসে কাটবে বলে পর্যটন এজেন্টরা মনে করছেন না। স্বাস্থ্য পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা অভিষেক মৈত্রও জানিয়েছেন, ''এক দেড় মাসে পরিস্থিতি আমূল বদলে যাবে, এমন ভাবার কারণ নেই। এ বছর পরিস্থিতির উন্নতির কোনও সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি না।''

কত টাকা ক্ষতি হতে পারে এর ফলে? হাসপাতালগুলি নির্দিষ্ট অঙ্ক সরকারিভাবে বলতে চায়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বছরের শেষ কোয়ার্টারে ব্যবসা খানিকটা ফিরে এলেও, ভারতের অন্তত ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতি হবে। মনে রাখা দরকার, এই ক্ষতি হবে কেবল স্বাস্থ্য খাতে। কিন্তু স্বাস্থ্য পর্যটনের সঙ্গে আরও বেশ কয়েকটি আনুষাঙ্গিক ব্যবসা জড়িত। হোটেল, হোম স্টে ইত্যাদি ব্যবসাতেও প্রভূত পরিমাণ ক্ষতি শুরু হয়েছে। বছর শেষে সেই অঙ্কটাও খুব কম হবে না।

অনেকেরই প্রশ্ন, কেন ভারতে স্বাস্থ্য পর্যটন এত জনপ্রিয়? বিশেষজ্ঞদের দাবি, গত এক দশকে কম টাকায় উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার দ্রুত উন্নতি হয়েছে দেশটিতে। উন্নত চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক এবং আফ্রিকা থেকে রোগী যায় সেখানে। আর কম টাকায় চিকিৎসার জন্য অস্ট্রেলিয়া এবং অ্যামেরিকা থেকে প্রচুর সংখ্যক রোগী যায় ভারতে। অনেকে অল্টারনেটিভ মেডিসিনের চিকিৎসা করাতেও যান।

ভারতও এই রোগীদের গুরুত্ব দেয় কারণ, এর ফলে প্রতি বছর এর থেকে বড় পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা লাভ হয়। করোনা এই পুরো ব্যবস্থাটাই ভেঙে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চিকিৎসকদের একাংশের বক্তব্য, বছর শেষে নতুন করে বিদেশি রোগী এলেও চিকিৎসকরা তাদের চিকিৎসা করতে ভয় পাবেন। করোনা ভাইরাস তারা বয়ে এনেছেন কি না, সে ভাবনা মাথায় থাকবে। আর বিদেশি রোগীরাও ভারতে যেতে ভয় পাবেন কারণ, এখানকার হাসপাতাল থেকে করোনা নিয়ে ফিরতে হবে কি না, সেই চিন্তা কাজ করবে। 

সূত্র : ডয়চে ভেলে।

জাগো প্রহরী/গালিব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য