চীনই কি পরের বিশ্বনেতা ?


য়াহিদুজ্জামান সিফাত ৷৷

বৈশ্বিক অতিমারি করোনা বিশ্বের খোলনলচে বদলে ফেলছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি পুরোপুরি স্থবির, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তেলের দাম ঋণাত্মক হয়েছে। সারা বিশ্বেই তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ কম। দেশে দেশে কলকারখানা বন্ধ, বৈশ্বিক অর্থনীতি বিরাট ধসের দ্বারপ্রান্তে।

চলমান এই সংকটে সরকারগুলোকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে এগোতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী স্থবিরতার মধ্যেও কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে পরিবর্তনের গুঞ্জন: অচিরেই বিশ্ব শৃঙ্খলার মূল খেলোয়াড় হিসেবে আমেরিকান আধিপত্যের পতন ঘটিয়ে চীনের উত্থান ঘটবে।

চীনই কি তবে নতুন মোড়ল
পরিবর্তনবাদীদের পক্ষ থেকে যে দাবিটি প্রধানত তোলা হচ্ছে তা হলো, ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় বৈশ্বিক শৃঙ্খলার নতুন মোড়লের উত্থান তখনই হয়েছে যখন বিশ্বব্যাপী কোনো ইতিহাসের গতি পরিবর্তনকারী ঘটনা মঞ্চস্থ হয়েছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী বৈশ্বিক রাজনীতিতে ফ্রান্স দুর্বল হয়ে যায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রিটেনের কাছে এবং ব্রিটেন বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী বিশ্বে একক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী সময়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি হয়ে ওঠে এবং সুয়েজ খাল সংকটকে কেন্দ্র করে ব্রিটেনের ভুল পদক্ষেপ আমেরিকাকে বৈশ্বিক নেতৃত্বে নিয়ে আসে। করোনা সংকটের ভূরাজনৈতিক প্রভাব এতটাই সুদূরপ্রসারী যে এটি ইতিমধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী সবচেয়ে বড় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এবং করোনা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র যে অপরিণামদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে, তারই সূত্র ধরে অনেকে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে চীনের উত্থানের কথা ভাবছে।

এই দাবির পেছনে যুক্তি আকারে দেখানো হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত ‘হেজিমোনিক স্টেবিলিটি’ তত্ত্ব, তথা নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা তত্ত্বের আলোকে রাষ্ট্রসমূহের চারিত্রিক বিশ্লেষণ। তত্ত্বটির মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতিক ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলাটি মসৃণভাবে চালানোর জন্য আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলায় একটি একক নেতৃত্বের আধিপত্য জরুরি—তবেই শৃঙ্খলাটি স্থিতিশীল থাকবে। আর বর্তমান নেতৃত্বের পতন কিংবা নতুন নেতৃত্বের উত্থান আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলাকে অস্থিতিশীল করে তোলে। এ রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় মূলত ক্ষীয়মাণ নেতৃত্বের আক্রমণাত্মক আচরণের কারণে, যেখানে তারা শৃঙ্খলাটিকে সচল রাখতে তাদের যে বিনিয়োগ, তার লাভ বুঝে পেতে চায়, যার আভাস ইতিমধ্যে আমাদের সামনে স্পষ্ট: বড় দুই অর্থনীতির বাণিজ্যযুদ্ধ আর করোনাকালে ট্রাম্পের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় অর্থায়ন প্রত্যাহারের ঘোষণায়। বিপরীতে স্বাস্থ্য সংস্থাকে চীন তিন কোটি ডলার অনুদান দেয়। মার্কিন আচরণ যেন তত্ত্বটিরই রূপায়ণ।

এ ছাড়া আমেরিকা ক্রমেই মিত্রহীন হয়ে উঠছে, যা স্পষ্টতই দৃশ্যমান হচ্ছে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের সাম্প্রতিক নাটকীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে। আমেরিকা যদি বর্তমান ব্যবস্থার হৃৎপিণ্ড হয়ে থাকে, তবে ইউরোপীয় দেশগুলো এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যারা একসঙ্গে অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা উভয় দিকেই জোটবদ্ধভাবে ব্যবস্থাটিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। তবে এই দুর্যোগের সময় ইউরোপের সঙ্গে কোনো পূর্ব–নোটিশ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র বিমান চলাচল প্রত্যাহার করে নিয়েছে এবং তার মিত্রদেরও একাই পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। সম্পর্কের ফাটলের এই বিষয় আরও স্পষ্ট হয় মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে জার্মান প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারণায় বিশ্বাস করে না।’ তাই সঙ্গীহীন আমেরিকা যদি আর আগের মতো নেতৃত্বে না থাকে, তবে তা বিস্ময়ের কিছু হবে না।

অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে চীন-নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। ট্রাম্পসহ পশ্চিমা নেতারা যখন বর্তমান পরিস্থিতির জন্য চীনকে দোষী সাব্যস্ত করছে, সেখানে অন্যান্য দেশ এখনো চীনের সহায়তার দিকে তাকিয়ে আছে, যেহেতু আমেরিকা সব সাহায্য বন্ধ রেখেছে। এই সময়কে চীন ব্যাপকভাবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকায় বিভিন্ন গ্রুপ ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কাজ করছে এবং বেল্ট অ্যান্ড রোডের সঙ্গে যুক্ত ৭০টি দেশ বিশেষ সুবিধা লাভ করছে। তাই তো দেশে দেশে চাইনিজ চিকিৎসাসামগ্রী ও অনুদানের চাহিদা বাড়ছে, যার অন্যতম নিদর্শন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্টের উক্তি, ‘চীন একমাত্র দেশ, যে আমাদের সাহায্য করতে পারে।’

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট শি এই বৈশ্বিক সংকটকালে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে একযোগে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন, যেখানে আমেরিকা নিজেদের সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে। পুরো ইউরোপ যখন ইতালিকে সাহায্য করতে ব্যর্থ হয়েছে, তখন বিপুল পরিমাণ মেডিকেল কিট নিয়ে এগিয়ে এসেছে বেইজিং। এটিকে বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ানোর চীনা চেষ্টা বলে অনেকে উল্লেখ করেছেন এবং ব্রিটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকা তো লিখেছেই, ‘জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বিশ্বনেতা হয়ে উঠেছে বেইজিং’।

কিন্তু আশঙ্কাও আছে
চীনের উত্থান কিংবা বর্তমান সিস্টেমের ক্ষয়সংক্রান্ত তত্ত্বগুলো নিয়ে যতই মাতামাতি হোক না কেন এদের প্রতি সন্দেহবাদী মানুষও কম নেই এবং অচিরেই যে চীন শীর্ষে আরোহণ করছে না, তাঁরা সেটাও বিশ্বাস করেন। এ ক্ষেত্রে তাঁরা প্রতিষ্ঠিত বাধা যেমন ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফকে কাজে লাগাতে না পারার পাশাপাশি বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় চীনের সক্ষমতার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেন। যদিও বিশ্ব মোড়ল হওয়ার ব্যাপারে বেইজিংয়ের বাসনা গোপন কিছু না এবং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’–এর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে তারা সে ইচ্ছাই প্রকাশ করেছে, তবে এখনো তারা বিশ্ব নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত কি না, সেটা কুয়াশাচ্ছন্ন। ২০০৮–পরবর্তী সময়ে চীনা অর্থনীতি বেশ ভালো করলেও ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্তের সামাজিক ও জীবনযাত্রাগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তাল মেলাতে বেইজিংকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ ছাড়া রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কায় ইয়েনের অবমূল্যায়ন করে রাখতে হয়েছে। তাই করোনা–পরবর্তী সময়ে চীনা অর্থনীতি যেখানে এমনিতেই চ্যালেঞ্জের মুখে থাকবে, সেখানে নতুন করে নেতৃত্ব নেওয়ার ব্যাপারে দেশটি কতটুকু প্রস্তুত এবং ইচ্ছুক হবে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

তা ছাড়া চীনের উত্থানের ব্যাপারে পশ্চিমা অর্থনীতিগুলো শুরু থেকেই অস্বস্তিতে আছে। তাই করোনার অজুহাতকে কাজে লাগিয়ে তারা যে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চাইবে, তা কল্পনা করা দুরূহ কোনো ব্যাপার নয়। ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি অঙ্গরাজ্যের বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে মামলা সেটাই প্রমাণ করে। তবে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং হবে সম্ভবত জাপানের পদক্ষেপ মোকাবিলা করা, যেখানে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের ফান্ডের ঘোষণা দিয়েছেন জাপানি কোম্পানিগুলোকে চীনা ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানার বদলে জাপানে তাদের কারখানা স্থানান্তরের জন্য। অন্য দেশগুলোও এরূপ পদক্ষেপ নিলে বিশ্ব বাণিজ্যের মূল ভিত্তি হিসেবে চীনের পরিচিতি হুমকির সম্মুখীন হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

সর্বোপরি, বেইজিং যে বর্তমানে নেতৃত্বের স্বপ্ন দেখতে পারছে, সে জন্য প্রধানত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তারা ধন্যবাদ দিতেই পারে। কারণ, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতির দিকে ঝুঁকে যায় এবং চীনের জন্য নেতৃত্বের দাবি তোলা আরও সহজ হয়; যদিও বর্তমান প্রশাসনের আগে যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট বলিষ্ঠভাবেই নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। তাই সামনের নভেম্বরে মার্কিন নির্বাচন চীনের জন্যও একটি বড় পর্যবেক্ষণের বিষয়। কেননা, ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচন জিতে গেলে বর্তমান নীতির আমূল পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। তখন চীনের জন্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে যাবে। এ ছাড়া করোনা মহামারি পরিস্থিতি সামলানোর ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসনের যে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, তা হয়তোবা নভেম্বরের ফলাফলে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।

চীনই কি এখন একমাত্র ভাবনার বিষয়
এর সবচেয়ে সরল উত্তর হলো বিষয়টি অনিশ্চিত। বিশ্ব রাজনীতির ঘটনাসমূহ এতটাই রহস্যময় যে এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা কখনোই সম্ভব নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি ট্রাম্পের বিচ্ছিন্নতার নীতি অনুসরণ করতে থাকে, তবে চীন বিশ্ব শৃঙ্খলার পরিচালকের আসনের জন্য সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী। অন্যদিকে, চীনের সরকার এই মহামারির প্রথম দিকে নিজেদের নির্লিপ্ত আচরণের জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর বিশ্বস্ত বন্ধু হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, এই বিশাল প্রাণহানি এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি উভয়ই এড়ানো যেত, যদি চীনা সরকার ভাইরাসটির সূচনা থেকে এই ব্যাপারে আরও খোলামেলা হতো। সুতরাং, এই কোভিড-১৯ চীনের জন্য সেই সুযোগ হবে কি না, যার মাধ্যমে তারা বিশ্ব নেতৃত্বের শীর্ষে আসীন হতে পারবে, নাকি বড় ক্ষতির কারণ হিসেবে প্রমাণিত হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

লেখক
ওয়াহিদুজ্জামান সিফাত: শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

জাগো প্রহরী/গালিব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য