ভারতের পরমাণু অস্ত্র: দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত স্থিতিশীলতার প্রতি হুমকি


জাগো প্রহরী : মার্কিন প্রশাসনের ২০০৮ সালে ভারতের সাথে পরমাণু প্রযুক্তির ব্যাপারে সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত ছিল বিশ্ব পরমাণু বিস্তাররোধ চুক্তি প্রশ্নে বিপর্যয়কর পরিণতি। এশিয়া প্যাসিফিকে মার্কিন স্বার্থ ও ভারতকে বাড়তি সুবিধা প্রদানের আগ্রহ ফলে অন্যান্য রাষ্ট্রকে ভারতে পরমাণু সামগ্রী সরবরাহের সুযোগ করে দেয়। এছাড়া ব্যাপক মূলধনপুষ্ট ভারতীয় লবি ভারতের স্বার্থ রক্ষা রাখার জন্য গোপনে ও প্রকাশ্যে বিশ্বজুড়ে কাজ করছে। এসব ভারতীয় স্বার্থের একটি হলো ভারতের পরমাণু বিস্তারের গোপন ও অবৈধ অধ্যায়কে আড়ালে রাখা এবং ভারতীয় পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির জন্য আরো সামগ্রীর ব্যবস্থা করা, যাতে দেশটি তার সামরিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য মজুত গড়ে তুলতে পারে।

আন্তর্জাতিকভাবে ফাঁস হওয়া বেশ কিছু বিদেশী গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ও নাগরিক সমাজকে প্রভাবিত করার জন্য বিদেশী থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ও সংবাদমাধ্যমকে অর্থায়ন করা হয়। একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও গোপন ভারতীয় এজেন্ডায় আমাদের বিশ্বাস করতে বলা হয় যে ভারতের একটি শক্তিশালী বিস্তাররোধ কার্যক্রম রয়েছে। এর বিপরীতে অত্যন্ত ঝামেলাপূর্ণ বিষয়গুলো নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। ভারতের অবৈধ পরমাণু ক্রয়, ক্ষেপণাস্ত্র ও পরমাণু অস্ত্র প্রযুক্তি বিস্তার, দুর্বল পরমাণু রফতানি নিয়ন্ত্রণ ও পরমাণু স্থাপনাগুলোর অব্যবস্থাপনা সাধারণভাবে বিস্মৃত হয়ে আছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কানাডা তাদের সরবরাহ করা পরমাণু সামগ্রী গবেষণার কাজে লাগানোর বদলে অস্ত্র উৎপাদনে ব্যবহার করায় অবরোধ আরোপ করেছিল। কিন্তু ভারতীয় অর্থ ও লবিষ্টদের কথায় মুগ্ধ হয়ে ২০১০ সালে তা তুলে নিয়ে একটি বেসামরিক পরমাণু চুক্তি করে। একইভাবে ১৯৭৪ সালে ভারতের পরমাণু অস্ত্র বিস্ফোরণের পর পরমাণু সামগ্রীর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতেই পরমাণু সরবরাহকারী গ্রুপ (এনএসজি) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু এখন তা বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছে এবং গ্রুপের সদস্য দেশগুলো ভারতকে এর সদস্য করার পক্ষে কথা বলছে। ভারত পরমাণু জ্বালানির মজুত গড়তে চায়, অন্যান্য দেশ থেকে ইউরেনিয়াম আমদানি করতে চায়। এছাড়া তার নিজস্ব খনিগুলোও ব্যবহার করতে চায়। ভারতের ওই মজুত সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার এবং বিমানবাহী রণতরী, সাবমেরিন ও ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহার করার উচ্চাভিলাষ রয়েছে। 

১৯৮৯ সালে উইসকনসিন ল স্কুলের অধ্যাপক গ্রারি মিলহোলিন অভিমত প্রকাশ করেছিলেন যে ১৯৭৪ সালে ভারত যখন পরমাণু বোমায় বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল, তখন বিশ্ব শোকাহত হয়েছিল। ভারত শান্তিপূর্ণভাবে ব্যবহারের নিশ্চয়তা দিয়ে প্রযুক্তি আমদানি করেছিল। কিন্তু তারা পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য প্লুটোনিয়াম তৈরীতে প্রকাশ্যে তা ব্যবহার করে। ওই বিস্ফোরণ শান্তিপূর্ণ পরমাণু’ ব্যবহারের ধারণা নস্যাৎ করে দেয় এবং পরমাণু রফতানিনীতি বদলানোর তাগিদ সৃষ্টি করে।

যুক্তরাষ্ট্র ২০০৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর নিউক্লিয়ার পাওয়ার কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়ার সবকে চেয়ারম্যান ড. ওয়াই এস আর প্রাসাদ ও শ্রী সুরেন্দরকে নিষিদ্ধ করে। তারা ইরানে পরমাণু সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য অভিযুক্ত হয়েছিলেন। এছাড়া ২০০৪ সালে দুটি কোম্পানির ওপর অবরোধ আরোপ করা হয়। এর একটি ছিল বেসরকারি বহুজাতিক কোম্পানি টাটা কেমিক্যালসের র‌্যালিস ইন্ডিয়া। অপরটি ছিল প্রজেক্টস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইন্ডিয়া লিমিটেড (পিডিআইএল)।

ভারত সরকার দাবি করে, এসব কোম্পানি সরকারি নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো এগুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পিডিআইএলের মালিক হলো ভারত সরকারের সার বিভাগ। মজার ব্যাপার হলো, ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীলদের বোঝানো কঠিন যে ভারত বিস্তারে সম্পৃক্ত। ২০০৩ সালে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়। কারণ ওই সময় সিআইএ একটি প্রতিবেদনে লিবিয়ার সাথে ভারতের অবৈধ পরমাণু বাণিজ্যের কথা প্রকাশ পেয়েছিল। সিআইএ জানিয়েছিল যে লিবিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে অর্থায়ন করছে ভারত।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান শক্তিগুলোর নীতি হলো ভারতের ত্রুটিপূর্ণ অবিস্তার রেকর্ডগুলোকে গুরুত্ব না দেয়া। ভারত তার স্পর্শকাতর সেন্ট্রিফিউজ ডিজাইন তথ্য, তার পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির জন্য অবৈধ ক্রয় ইত্যাদি প্রায়ই ফাঁস করে দেয়। পাশ্চাত্য পরমাণু শক্তিধর ভারতকে মূলধারায় নিয়ে আসার জন্য ব্যাপক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এটা সফল হলে দ্বৈত ব্যবহার প্রযুক্তি হাসিলে ভারতের সুবিধা হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়,ফ্রান্সের কাছ থেকে  ভারতের ড্যাসাল্ট রাফাল জেট কেনার কারণ হলো এসব বিমান পরমাণু হামলায় ব্যবহার করা।

আসল কথা হলো, ভারত শান্তিপূর্ণ পরমাণু ও মহাকাশ সহযোগিতার অজুহাতে পরমাণু অস্ত্র ও ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরী করছে। বিশ্বের উচিত ভারতের পরমাণু বিস্তার রেকর্ডের প্রতি গভীরভাবে নজর দেয়া এবং এর পরমাণু অস্ত্রের মজুতের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালানো। কারণ এগুলো কেবল বৈশ্বিক পরমাণু বিস্তার চুক্তিরই লঙ্ঘন নয়, সেইসাথে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত স্থিতিশীলতার জন্যও মারাত্মক হুমকি।

সূত্র : মডার্ন ডিপ্লোমেসি

জাগো প্রহরী/ফাইয়াজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য