কওমী তরুণদের কর্মসংস্থান ভাবনা


সৈয়দ শামছুল হুদা ৷৷

কওমী মাদ্রাসা শিক্ষার সরকারি স্বীকৃতি ও সনদের মূল্যায়ন নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক আলোচনা হয়ছে। বর্তমান সরকার এই স্বীকৃতি প্রদান নিয়ে যথেষ্ট পরিমান সুযোগ আদায় করে নিয়েছে। এমনকি এই স্বীকৃতির মাধ্যমে ২০১৩সালে সংঘটিত ইতিহাসের জঘন্যতম শাপলা চত্বরের ঘটনাকেও আড়াল করে নিয়েছে।  আওয়ামীলীগ সরকারিভাবে এই ঘটনা থেকে নিজেদের দায়মুক্তি আদায় করে নিয়েছে শুকরানা মাহফিলের মাধ্যমে। এগুলো অনেক পুরাতন ইতিহাস। নতুন করে এ নিয়ে বিতর্ক করার কোন সুযোগ নেই। লাভও নেই। আমি আমার তরুণ আলেমবন্ধু ও ফলোয়ারদের প্রতি আহ্বান জানাবো, বন্ধুরা! আসুন, আমাদের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে এই কওমী মাদ্রাসার স্বীকৃতিকে কীভাবে? কতটুকু? কাজে লাগাতে পারি তার জন্য আলোচনা শুরু করি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বীকৃতি দেওয়ার পর বলেছিলেন যে, পিছিয়ে পড়া কওমী মাদ্রাসার আলেমদের কর্মসংস্থানের জন্য এই স্বীকৃতি অনেক বড় ভূমিকা রাখবে। 

আমাদের দেশের সংবিধানও এটা নিশ্চিত করেছে যে, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে বিশেষ বিবেচনায় সুযোগ দিলে সংবিধান সেই ক্ষেত্রে কোন প্রকার প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে না। আমরা অতীতে দেখেছি যে, প্রাইমারী স্কুলগুলোতে কোন রকম দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ মেয়েদের বিশেষ বিবেচনায় চাকুরী দিয়ে তাদেরকে মূল ধারায় এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। তাদেরকে যে সুযোগ সেই দিন দেওয়া হয়েছিল তার সুফল আর দেশের নারী সমাজ ভোগ করছে। আজ নারীদেরকে  দেশের সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত দেখা যায়। 

আমাদের দাবি হলো, দেশের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদ থেকে কওমী মাদ্রাসার সর্বোচ্চ সনদকে এরাবিক ও ইসলামিক স্টাডিজ এ এমএ সমমান দেওয়া হযেছে। সেটা আইন আকারে পাশ হয়েছে। সুতরাং কওমী মাদ্রাসার সনদধারী তরুণ আলেমদেরকে যে সকল জায়গায় ইসলামিক স্টাডিজ ও এরাবিকে এমএ পাশ হলে চাকরির সুযোগ দেওয়া হয়, সেই সকল ক্ষেত্রে তাদেরকে সুযোগ দিতে হবে। নিম্নে এমন কিছু কর্মক্ষেত্রের কথা আলোচনা করা হলো, যে সব জায়গায় একজন কওমী মাদ্রাসার ছাত্র যথাযথ যোগ্যতা দিয়েই দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা রাখে। যেমন : 

০১। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ধর্মীয় শিক্ষক পদে নিয়োগ :

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে বর্তমানে ধর্মীয় শিক্ষকের একটি পদ আছে। সেখানে ইসলামিক স্টাডিজ ও এরাবিকে এমএ পাশ ছাত্রদের  সুযোগ দেওয়া হয়। আমি মনে করি, কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে   এই ক্ষেত্রে সুযোগ দিলে তারা আরও ভালোভাবে ভূমিকা পালন করতে পারবে। কুরআন ও হাদীসে যে কোন দাওরায়ে হাদীস পাশ ছাত্র ভালো করবে এটা নিশ্চিত। 

০২। বিজিবি, পুলিশ ও আনসার এ ধর্মীয় শিক্ষক পদে নিয়োগ :

যেহেতু কওমী মাদ্রাসার সর্বোচ্চ সনদকে ইসলামিক স্টাডিজ ও এরাবিকে এমএ সমমান দেওয়া হয়েছে, সেহেতু তাদের বিজিবি, পুলিশ ও আনসারের ধর্মীয় শিক্ষক পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। এ সকল জায়গায় কওমী মাদ্রাসার ছাত্ররা সুনাম ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনে সক্ষম। 

০৩। প্রাইমারী স্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক পদে নিয়োগ:

সারাদেশে হাজার হাজার প্রাইমারী স্কুল রয়েছে। একসময প্রাইমারী স্কুলের ধর্মীয়  শিক্ষার মান খুব ভালো ছিল। বর্তমান প্রশাসনে এমন অনেক ভালো মানুষ পাওয়া যাবে যারা প্রাইমারী স্কুলের ধর্মীয় শিক্ষকের ভূমিকা আজো ভুলতে পারেননি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, প্রাইমারী স্কুলের ধর্মীয় শিক্ষার মানকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হযেছে। সেখানে অনেক এমন স্কুলও পাওয়া যায়, যেখানে ইসলাম ধর্মের শিক্ষার দায়িত্ব পালন করছে হিন্দু শিক্ষক। যেহেতু কওমী মাদ্রাসার সর্বেোচ্চ সনদের একটি মান নিশ্চিত করা হয়েছে, সুতরাং এদেরকে প্রাইমারী স্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক পদে নিয়োগ দিতে কোন বাধা দেখি না।  শুধুমাত্র আমলাতান্ত্রিক শয়তানী ছাড়া তাদেরকে সুযোগ না দেওয়ার কোন কারণ নেই। কারণ একজন দাওরায়ে হাদীস পাশ যে কোন ছাত্রকে সামান্য প্রশিক্ষণ দিলেই সে প্রাইমারী স্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক পদে যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারবে। 

০৪। কাজী হিসেবে নিয়োগ দান :

একসময় দেশের কওমী মাদ্রাসার আলেমদেরকেও কাজী পদে নিয়োগ দেওয়া হতো। পরিকল্পিতভাবে এদেরকে নিয়োগ দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে শুধুমাত্র সার্টিফিকেটের দোহাই দিয়ে। এখন যেহেতু এই প্রতিবন্ধকতা নাই, সুতরাং সারাদেশের সকল ওয়ার্ডে কাজী পদে দরখাস্ত করার সুযোগ কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদেরকেও দিতে হবে। এ ব্যাপারে আমাদেরকেই সোচ্চার হতে হবে। 

০৫। সকল সরকারি মসজিদের ইমাম ও খতীব পদে নিয়োগ:

একসময় শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটর প্রফেসর হিসেবে লেকচার দিযেছেন। মাওলানা জাফর আহমদ উসমানী রহ.ও ঢাবিতে বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয়ে লেকচার দিযেছেন। কিন্তু অজানা কারণে দেশের বড় বড় কওমী স্কলারদেরকে এ সকল সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা হযেছে। শুধু তাই নয়, সরকারের নিয়ন্ত্রনে পরিচালিত মসজিদ সমূহে পর্যন্ত কওমী আলেমদের নিয়োগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। যেহেতু এখন আর সেই বাধা নেই এবং কওমী আলেমগণ সারাদেশের সকল মসজিদে দক্ষতার সাথে ইমাম ও খতীবের দায়িত্ব পালন করছেন সেহেতু সরকারী মসজিদগুলোতে দরখাস্ত গ্রহন করার ক্ষেত্রে দাওরায়ে হাদীসকেও সুযোগ দিতে হবে। 

০৬। হোমিওপ্যাথি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজে নিয়োগ দান :

কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ড এর আওতাধীন ৪বধরের ডিএইচএমএস কোর্সে অংশগ্রহনের সুযোগ দিতে হবে। এমনিভাবে আয়ুর্বেদি কলেজের অধীনে পরিচালিত ৪বছরের হেকিমি কোর্সে ও ভর্তির সুযোগ দিতে হবে। এবং এইসকল কোর্স সম্পন্ন করা সাপেক্ষে সেখানে তাদেরকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য সুযোগ দিতে হবে। একসময় হোমিওকলেজে ডিএইচএমএস এর সাথে মাত্র এসএসসি পাশ লোকদেরকেও প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হতো। কেউ যদি কৃতিত্বের সাথে ডিএইচএমএস কোর্স সম্পন্ন করতে পারে তাকে তার দাওরায়ে হাদীসের সনদকে নিয়োগের জন্য বৈধতা দিতে হবে। 

০৭। আলিয়া মাদ্রাসার আরবি প্রভাষক পদে নিয়োগ:

যেহেতু কওমী মাদ্রাসার সননের মান ইসলামিক স্টাডিজ ও এরাবিকে এমএ সমান, সুতরাং আলিয়া মাদ্রাসার দাখিল স্তরের মৌলভী পদে, আলিম ও ফাজিল স্তরের আরবি প্রভাষক পদে এই সনদকে গ্রহণ করার জন্য সরকারিভাবে নির্দেশ দিতে হবে। অনেক কওমী আলেম কামিল করে আলিয়া মাদ্রাসার এসব পদে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করছে। কওমী মাদরাসায় পড়ার মধ্যেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। তারাও জগতকে বুঝতে শিখেছে। সুতরাং সরাসরি দাওরায়ে হাদীস এর সনদ দিয়ে এসব পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। 

০৮। হাইস্কুল ও বেসরকারি কলেজ পর্যায়ে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দান: 

আমাদের দেশের উচ্চবিদ্যালয়গুলোতে যে মানে ইসলাম শিক্ষার বিষয় রয়েছে, এগুলো পড়ানোর জন্য কওমী মাদ্রাসার তরুণরা শতভাগ যোগ্যতা রাখে। কওমী তরুণদেরকে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটে এদেরকে সামান্য প্রশিক্ষণ দিলে তারা দেশের সকল উচ্চবিদ্যালয় এবং বেসরকারি কলেজের ধর্মীয় শিক্ষক দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম। যদি নামকাওয়াস্তে ধর্মীয় শিক্ষক পোস্ট রাখার ইচ্ছে সরকারের না থাকে, এবং এদেশের মুসলিম সন্তানদেরকে সত্যিই  ধর্ম শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার ইচ্ছা থাকলে অবশ্যই এই নিয়োগ গোটা দেশের মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। 

০৯। বেসরকারি বিভিন্ন পদে নিয়োগ দানের জন্য অনুপ্রেরণা দান :

দেশে বেসরকারি পর্যায়ে অসংখ্য কর্মক্ষেত্র রয়েছে, এনজিও রয়েছে, বিভিন্ন কোম্পানি রয়েছে, গার্মেন্টস রয়েছে এসব জায়গায় নিয়োগের যে নীতিমালা আছে, সেখানে সাধারণ কিছু পদে কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদের নিয়োগের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা জারি করতে হবে। উদ্বুদ্ধ করতে হবে। অনুপ্রেরণা দিতে হবে। এসব নিয়োগের সুযোগ দানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় সৎ ও যোগ্য লোকদের দেখা যাবে। 

১০। যেহেতু কওমী মাদ্রাসার সনদের  স্বীকৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি,  আর এসব অজুহাতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এদের যদি এই মুহুর্তে উচ্চশিক্ষার  সুযোগ দেওয়া সম্ভব না হলেও দেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ ও এরাবিকে স্থানভেদে অনার্স, মাষ্টার্স, এমফিল বা পিএইচডি করার সুযোগ দিতে হবে। 

একটি কথা চ্যালেঞ্জের সাথে বলতে পারি যে, যারা আলিয়া বা জেনারেল লাইনে যারা কামিল করে, বা ইসলামিক স্টাডিজ ও এরাবিকে  এমএ করে , তাদের  চেয়ে যোগ্যতার বিচারে কওমী মাদ্রাসার নতুন ফারেগীনরা কোনভাবেই দুর্বল নয়। 

এসব নিয়োগের কথা শুনে অনেকেই নাক ছিটকাবেন। অনেকের মধ্যে গা জ্বলাও ধরে যাবে। কিন্তু এই সকল নিয়োগ দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর হবে। একটি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূলধারায় ভূমিকা পালনের সুযোগ দানের মাধ্যমে কওমী মাদ্রাসার সাথে রাষ্ট্রের যে দূরত্ব রয়েছে সেটা কাটিয়ে উঠা যাবে। 

দেশের তরুণ আলেমদেরকে এসব নিষয় নিয়ে সর্বত্র আলোচনার পরিবেশ তৈরির জন্য অনুরোধ করবো। মনে রাখবেন, এদেশের রাষ্ট্র চলে আপনার বাপ-চাচার দেওয়া ট্যাক্সে। আজকে যারা আপনাদেরকে তুচ্ছ মনে করে, সেই লোকগুলো আপনার বাপ-চাচার দেওয়া ট্যাক্সের টাকায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বিনা পয়সায় বা নামকাওয়াস্তে পয়সায় পড়ে তারা আজ লাট বাহাদুর। আর কওমী ফারেগীনরা যেন ভেসে আসা কেউ। 

জেনারেল সেক্রেটারি
বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট বিআইএম

জাগো প্রহরী/ফাইয়াজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য