বামপন্থীদের প্রতি খোলা চিঠি; ফ্যাসিবাদী মনস্তত্ত্ব পরিহার করুন।



শেখ ফজলুল করীম মারুফ ৷৷

ফ্যাসিবাদ (ইংরেজি: Fascism) হচ্ছে র‍্যাডিক্যাল  জাতীয়তাবাদের একটি রূপ। দেশের সকল শ্রেণীর মানুষকে একাত্ব করাই ফ্যাসিবাদের লক্ষ্য। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফ্যাসিবাদীরা অন্য সংস্কৃতির প্রতি অশ্রদ্ধাশীল হয়ে থাকে এবং নিজ জাতি ও সংস্কৃতিকে সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করে।

ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে এগুলো একেবারে সহজ ও সাধারণ কথা। উইকিপিডিয়া থেকে নেয়া।

ফ্যাসিবাদ বাংলাদেশের অতি সাধারণ চরিত্র। সরকারগুলোতো বটেই রাজনৈতিক দলগুলোও সর্বাংশে ফ্যাসিবাদী। সবগুলো দলই চায় দেশের সবাই তাদের সাথে একাত্ব হয়ে যাক। যদি কেউ একাত্ব না হয় তাহলেই তার সাথে উঠ-বস, কথাবার্তা, আলোচনা ইত্যাদি সব বন্ধ। এমনকি মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত।

দেশের বামধারার সংগঠনগুলো  প্রগতি, পরমতসহিষ্ণুতা, উদারতা ইত্যাদি শব্দগুলোকে তসবিহ এর মতো জপে। এবং প্রতিপক্ষকে এই ধারনাগুলো দিয়েই প্রধানত আক্রমন করে। বিশেষ করে ইসলামপন্থীদের তারা হরদম পশ্চাৎপদ, প্রতিক্রিয়াশীল ও ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণু বা সহিংস বলে দোষারোপ করে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বামপন্থীদের একটি বড় অংশ নিজেরাই অতিমাত্রায় প্রতিক্রিয়াশীল ও পরমতের প্রতি অসহিষ্ণু।

আমি ২০১৩-১৪ সালে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে বামধারার সংগঠনগুলোর সাথে সমন্বয় রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছি। ২০১৩ থেকে আজ অবধি বাম সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক যারা ছিলেন তারা নিশ্চয় স্বীকার করবেন যে, প্রতিবছর ইশা ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে তাদের কাছে দুই থেকে তিনবার মতবিনিময়, ইফতার বা অন্য কিছুর ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় সভাপতি যোগাযোগ করেন।

কিন্তু আজ পর্যন্ত তাদের কেউই কোন আমন্ত্রণ গ্রহণ করেননি বা তারাও কখনো আমন্ত্রণ করেননি৷ আমরা দাওয়াত পত্র নিয়ে দেখা করতে চেয়েছি তাও তারা সর্বদাই এড়িয়ে গেছেন, মোবাইলেও কেউ কেউ সৌজন্যমূলক নয় এমন আচরন করেছেন। সামাজিকতা টুকুও রক্ষা করেননি।

এগুলো আমি পূর্ণ দায়িত্বসহকারে বলছি কারণ আমি নিজেই এর ভুক্তভোগী।

তাদের আচরন দেখে মনে হয়েছে, ইসলামপন্থীদের সাথে মোবাইলে কথা বললেও তাদের জাত যাবে। আলাপ করা তো দুরের কথা। ক্যাম্পাস রাজনীতিতেও তাদের তীব্র প্রতিক্রিয়াশীল আচরনের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বারংবার।

কেন তারা এমন আচরন করে? এর জবাবে তারা তাদের সাথে আমাদের তথা ইসলামপন্থীদের মতপার্থক্যের বিষয়গুলো সামনে আনে। এবং সেগুলো আগে সমাধান করার প্রশ্ন তোলে। সর্বশেষ রাষ্ট্রচিন্তার মানববন্ধনকে কেন্দ্র করে একই ধরনের বিতর্ক উঠেছে।

বামপন্থার সাথে ইসলামপন্থার মতপার্থক্য তো থাকবেই। বামপন্থা পশ্চিমের Intellectual & Cultural Hegemony অধিনে তাদের মুলনীতি, যুক্তি, চিন্তা ও চিন্তাকাঠামো নির্মান করে এবং তার ভিত্তিতে সমাজ, জীবন ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশ্নের সমাধান খোঁজে।

(বামপন্থার তাত্ত্বিকগণ সবাই পশ্চিমের পরিবেশে বেড়ে ওঠা। সেখানকার সমাজ বাস্তবতায় তারা চিন্তা করেছেন ও তত্ত্ব নির্মান করেছেন। এখনও কথায় কথায় যেসব চিন্তকের দোহাই দেয়া হয় তারাও সবাই পশ্চিমের। বামপন্থার পশ্চিমা শেকড় সম্পর্কে বুঝতে আলী শরিয়াতি দ্রষ্টব্য হতে পারে। যদিও ওয়েস্টার্ন হেজিমনি বলতে চলতি যে পরিভাষা তা এখানে ঐ অর্থে প্রযোজ্য না। কিন্তু বামপন্থার সৃষ্টি, চিন্তকদের জীবন অভিজ্ঞতা, চিন্তাকাঠামো ও চিন্তাভিত্তির হিসেবে বামপন্থা পশ্চিমের জ্ঞানগত ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের অধিনে। এনিয়ে ভিন্ন পরিসরে বিস্তারিত আলাপ হতে পারে।)

আর ইসলামপন্থীরা প্রাচ্যের ও দেশীয় সমাজ বাস্তবতার আলোকে মুলনীতি, যুক্তি, চিন্তা, চিন্তা কাঠামো নির্মান করে এবং তার ভিত্তিতেই সমাজ, জীবন ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশ্নের সমাধান খোঁজে।

বাকস্বাধীনতা, নারী প্রশ্ন, উন্নয়ন প্রশ্ন, সংস্কৃতি, জীবনবোধ ইত্যাদি হাজারো প্রশ্নে সম্পুর্ন ভিন্ন অবস্থান ইসলামপন্থা ও বামপন্থার রয়েছে। অনেক সময়ই এই অবস্থান পরস্পর সাংঘর্ষিক। মানে দুই অবস্থানের মাঝে তত্ত্বগত সহ-অবস্থান সম্ভব না।

পশ্চিমের সমাজ individualistic আর আমাদের প্রাচ্যসমাজ Collective Society. পশ্চিমে ব্যক্তি স্বার্থ, ব্যক্তি ইচ্ছা প্রধান। ব্যক্তি সার্বভৌম।  আর আমাদের এখানে ব্যক্তি স্বার্থ, ইচ্ছা স্বীকৃত যতক্ষণ তা সমাজের স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক না। এই কারণেই সমকামিতাকে কোনদিনই আমরা বৈধতা দিতে পারি না কিন্তু পশ্চিমে তা বৈধতা পাচ্ছে। বাকস্বাধীনতার প্রশ্নেও ব্যক্তির বাক্য যদি সমালোচনার সমাজ স্বীকৃত ভদ্রতার সীমা লঙ্ঘন করে তাহলে তাকে আমরা সমর্থন করতে পারি না।

দুই সমাজের এই চরিত্রগত ভিন্নতার কারণে শত শত প্রশ্নে বামপন্থা আর ইসলামপন্থার পরস্পর ভিন্ন অবস্থান নিতে বাধ্য।

তাই বলে কি একে অন্যের সাথে কোন ধরনের আলাপচারিতায় অংশ নিতে পারবেনা? উভয় পক্ষের সাধারণ কোন শত্রুর বিরুদ্ধে সম্মিলিত আন্দোলন করতে পারবেনা? একে অন্যের সাথে সৌজন্যমূলক আচরন করতে পারবেনা? সামাজিকতা রক্ষা করতে পারবে না?

পরস্পর আলাপচারিতা বা সৌজন্যতা রক্ষা করতে হলে ঐ সব প্রশ্নে একমত হতে হবে? সব প্রশ্নে সবাইকে একমত করতে চাওয়াই তো ফ্যাসিবাদ। পরস্পর একমত না হলে যদি একত্রিত না হওয়া যায় তাহলে পরমতসহিষ্ণুতার অর্থ কি?

ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন মনে করে যার সাথে যত বেশি মতভিন্নতা দেখা যায় তার সাথে তত বেশি আলাপচারিতা জারি রাখতে হয়। পারস্পরিক মতবিনিময় করলে উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি দুর হয় এবং উভয়ই প্রান্তিক অবস্থান গ্রহণ থেকে সরে আসতে পারে।

সেজন্যই আমরা বারংবার বামপন্থী সংগঠনগুলোর সাথে মতবিনিময় করতে চেয়েছি, বারংবার বিভিন্ন উপলক্ষ্যে তাদের কাছাকাছি হতে চেষ্টা করেছি। এটা করতে গিয়ে উপেক্ষিত হয়েছি, অসৌজন্যমূলক আচরনের শিকার হয়েছি, প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়েছি এবং অনেককে বিব্রত করেছি।

তারপরেও আমরা আলাপচারিতার সুযোগ, মতবিনিময় সুযোগ সন্ধান করেই যাবো।

কেন?
কারণ আমাদের কাছে মনে হয়েছে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এই দুই পন্থার সাধারণ আগ্রহের জায়গা আছে। পুঁজিবাদের মোকাবিলায় এই দুই পন্থাই মানুষকে নিয়ে ভাবে। উভয়পন্থাই গুটিকয়েকের স্বার্থে বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতি মানুষের স্বার্থের কথা বলে। বুর্জোয়া রাজনীতির মোকাবিলায় উভয়পন্থাই আর্দশ নির্ভর ত্যাগের রাজনীতি করে।

পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতার কথা উঠলে কেউ কেউ ইসলামের নাম নিয়ে বামপন্থার সাথে সহিংস আচরনের ইতিহাস  সামনে আনে। বিনয়ের সাথে বললো, যবে থেকে বামপন্থা বিশ্বে শক্তি হিসেবে দাড়িয়েছে তখন থেকেই ইসলামপন্থা রাষ্ট্র ক্ষমতার বাহিরে। বামপন্থার বিরুদ্ধে ইসলামের নাম নিয়ে যা সহিংসতা হয়েছে তা হয়েছে ব্যক্তি পর্যায়ে। বিচ্ছিন্নভাবে। কিন্তু ইসলামপন্থার ওপরে বামপন্থা সহিংসতা চালিয়েছে রাষ্ট্রিয় শক্তি ব্যবহার করে। বছরের পর বছর। নির্মমভাবে।  মিশর, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, আফগানিস্তান ও আলবেনিয়া, চেচনিয়া, যুগোস্লাভিয়াসহ সোভিয়েট ইউনিয়নভুক্ত অঞ্চলে ইসলামকে ঘোষণা নিয়ে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। আধুনিক বিশ্বের স্বীকৃত বৃহৎ গণহত্যাও সংঘটিত হয়েছে বামপন্থী সার্ব নেতাদের দ্বারা আলবেনিয় মুসলমানদের ওপরে। এখন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি কতৃক উইঘুর মুসলমানদের সাথে যে বর্বরতা করা হচ্ছে তা কল্পনাতীত।

কিন্তু এর দায় আমরা বাংলাদেশি বামপন্থীদের ওপরে চাপাতে চাই নাই এবং পারস্পারিক সম্পর্কের মাঝে সেগুলোকে টেনেও আনি না। কিন্তু কেন যেনো বামপন্থীরা বারংবার বিচ্ছিন্ন কিছু দলের করা সহিংসতাকে সামনে আনেন।

সর্বশেষ বলবো, পুঁজিবাদের মোকাবিলায় প্রচেষ্টারত এই দুই পন্থার মাঝে বৈরিতা সৃষ্টির জন্য পুঁজিবাদীরা বহু অপচেষ্টা করেছে। এবং তারা সফলও হয়েছে।  সেজন্য এই দুই পন্থার মাঝে কোন তর্কে অনেকেই তর্কের সৌজন্যবোধের সীমা লঙ্ঘন করেন। সাম্প্রতিক বিতর্কেও কেউ কেউ সেটা করেছেন। বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সন্মানিত  কেন্দ্রীয় সভাপতির প্রতি ব্যক্তি আক্রমণ ও দলের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশক আচরন হয়েছে। আমি সেগুলোর দায় নিচ্ছি ও বিনীত ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

একই সাথে বামঘরনার সকলে প্রতি আবেদন থাকবে, আসুন! পরস্পরকে জানি, বুঝি। আলাপ করি। কথা বলি। আমার মত আপনাকে মানতে হবে না কিন্তু আমার মতটাকে তো আপনি যথার্থভাবে জানবেন। আমার অবস্থান আপনার সমর্থন করার দরকার নাই কিন্তু আমার অবস্থান সম্পর্কে ভুল ধারনা নিয়ে থাকাতো ঠিক হবে না।

বি.দ্র. আমরা অনলাইন আলাপচারিতায় আগ্রহবোধ করি না। কারণ দুর থেকে অন্তর্জালের এই আলাপে পরস্পরের বক্তব্য বোঝানো যায় না। হৃদয়ের উষ্ণতা প্রকাশ করা যায় না। পরস্পরকে বোঝা যায় না।

আমাদের প্রাচ্য দেশে "মন বোঝা" "মনের মিল" হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। "আত্মার সম্পর্ক" প্রধান। এগুলো দুইজন দুই প্রান্তে বসে কিবোর্ড চাপলে হয় না। সামনাসামনি এসে কোলাকুলি করে কাছাকাছি বসে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আলোচনা করলে মন বোঝা যায়, মনের মিল হয়, আত্মার সম্পর্ক হয়।

অনলাইনে একসময প্রচুর তর্কাতর্কি হয়েছে কিন্তু তাতে হৃদ্যতা তো তৈরি হয়ই নাই বরং তিক্ততা তৈরি হয়েছে। দুরত্ব আরো বেড়েছে।

সেজন্য অনলাইন আলোচনা এড়িয়ে চলি আমরা। বরং আপনার বা আমার পছন্দমত জায়গা বা ক্যাম্পাসের কোথাও বসে আলাপ করলে পরস্পরকে জানা-বোঝা সহজ হবে। পারস্পরিক হৃদ্যতা তৈরি হবে।

আল্লাহ আমাদের পারস্পরিক দুরত্ব দূর করে দিন।আমিন ৷

লেখক : সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, 
ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন ৷

জাগো প্রহরী/এফ আর

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য