মক্কা-মদীনায় মহামারী : একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ


মুফতী কবীর আহমদ কাসেমী ৷৷


মদীনায় করোনা আক্রান্ত হয়ে বেশ কিছু মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। মক্কায়ও রোগী হু হু করে বাড়ছে। কারও কারও মনে প্রশ্ন জাগছে: হাদীসে তো এসেছে, ‘মক্কা-মদীনায় মহামারী প্রবেশ করতে পারবে না’, তারপরও হারামাইন শরীফাইনে কীভাবে ভাইরাস হানা দিলো?!

এদিকে কতক অমুসলিম বলে বেড়াচ্ছে, হাদীস মিথ্যা প্রমাণিত হলো!

আসলেই কী হাদীসে সবধরনের মহামারীর কথা বলা হয়েছে, না বিশেষ কোনো রোগের বর্ণনা এসেছে? মূল বিষয়টি বোঝার জন্য প্রথমে এসম্পর্কিত হাদীসগুলো দেখে নিই:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—
لَا يَدْخُلُ الْمَدِينَةَ الْمَسِيحُ وَلَا الطَّاعُونُ.
“মাসীহে দাজ্জাল ও প্লেগ (রোগ) মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না।”
(সহীহ বুখারী: হাদীস নং ৫৭৩১)।
অপর সনদে এসেছে—
عَلَى  أَنْقَابِ الْمَدِينَةِ مَلَائِكَةٌ، لَا يَدْخُلُهَا الطَّاعُونُ، وَلَا الدَّجَّالُ.
“মদীনার রাস্তায় রাস্তায় ফেরেশতা নিযুক্ত। তাই তাতে প্লেগ ও দাজ্জাল প্রবেশ করতে পারবে না।”
(সহীহ মুসলিম: ১৩৭৯)।

তিনি আরও বলেন—
الْمَدِينَةُ، وَمَكَّةُ مَحْفُوفَتَانِ بِالْمَلَائِكَةِ، عَلَى كُلِّ نَقْبٍ  مِنْهَا  مَلَكٌ، لَا يَدْخُلُهَا الدَّجَّالُ، وَلَا الطَّاعُونُ.
“মদীনা ও মক্কা ফেরেশতাদের দ্বারা সংরক্ষিত। প্রত্যেকটার রাস্তায় ফেরেশতা রয়েছে। ফলে তাতে দাজ্জাল ও প্লেগ প্রবেশ করতে পারবে না।”
(মুসনাদে আহমদ: ১০২৬৫)।

মক্কা-মদীনায় যে রোগ প্রবেশ করবে না—তা হলো طَاعُونُ (তাঊন)। এর অনুবাদ ‘প্লেগ’ দিয়ে করেছি। এটি বিশেষ প্রকারের এক রোগ। পক্ষান্তরে মহামারি একটি ব্যাপক শব্দ। আরবীতে মহামারী বোঝাতে সাধারণত وَبَاءٌ (ওয়াবা) শব্দ ব্যবহার হয়। যা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া যে কোনো মহামারীকে বোঝায়। কিন্তু ‘প্লেগ’ বললে সবধরনের মহামারীকে বোঝায় না; শুধুই একটি নির্দিষ্ট রোগকে বোঝায়।

‘প্লেগ’ রোগের পরিচয়:
আম্মাজ্বী আয়েশা সিদ্দীকা রা. একদিন রাসূল ﷺ-কে প্লেগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন—
غدة کغدة الابل تخرج في الاباط و المراق.
“তা হলো উটের ফোঁড়ার মতো এমন কিছু গুটি যা বগল ও পেটের নিচের দিকে বের হয়।”
(মুসনাদে আহমদ: ২৫১১৮/ মুজামে আওসাত, তাবারানী: ৫৫৩১)।

বিজ্ঞ আলেমগণও এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে কাছাকাছি মতামতই ব্যক্ত করেছেন।
 কাযী ইয়ায রহ. বলেন, ‘প্লেগ মূলত শরীরে বের হওয়া কিছু ফোঁড়া। আর মহামারী হলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া সবধরনের রোগ...।’
(উমদাতুল কারী: খণ্ড ২১,পৃষ্ঠা ২৫৬)।

হাফেয ইবনে আব্দুল বার রহ. বলেন, ‘প্লেগ হলো এমন কিছু গুটি যা পেট ও বগলের নিচে বের হয়। কখনও হাত ও আঙুলে এবং আল্লাহ তাআলা যেখানে চান সেখানেও বের হয়।’
(ফাতহুল বারী: খণ্ড ১০,পৃষ্ঠা ১৯০)।

উস্তাদে মুহতারাম মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরী দা.বা. প্লেগের নির্ভরযোগ্য সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, ‘এটা বিশেষ প্রকারের এক ব্যাধি। যা ফোঁড়া ও ক্ষতের আকারে প্রকাশিত হয়। বিশেষ করে বগলে, আঙুলসমূহের মাঝখানে ও গোড়ায় ফোঁড়া তৈরি হয়। এগুলোর চতুর্পাশে কালো দাগ পড়ে যায়।’
(তুহফাতুল আলমাঈ: খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৭৬)।

আল্লামা ইবনে কাইয়িম রহ. লিখেন, ‘সঠিক হলো প্লেগ ও মহামারির মাঝে ব্যাপক ও বিশেষত্বের সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং সব প্লেগই মহামারী। পক্ষান্তরে সকল মহামারী প্লেগ নয়। এমনিভাবে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া ব্যাধিগুলোও প্লেগ থেকে ব্যাপক। কেননা প্লেগ হলো সেগুলোর একটি প্রকার মাত্র।’
(যাদুল মাআদ: খণ্ড ৪,পৃষ্ঠা ৩৬)।

হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এবং আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রহ.ও প্লেগ ও মহামারীর পার্থক্য নিয়ে দলীলভিত্তিক বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। (দ্রষ্টব্য, ফাতহুল বারী: খণ্ড ১০,পৃষ্ঠা ১৯০-১৯২/উমদাতুল কারী: খণ্ড ২১,পৃষ্ঠা ২৫৬-২৫৭)।

তো বোঝা গেলো, ‘মহামারী’ একটি ব্যাপক শব্দ। এতে প্লেগ, কলেরা, নিউমোনিয়া, করোনাসহ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া সব রোগ শামিল। পক্ষান্তরে ‘প্লেগ’ একটি বিশেষ রোগ। এতে সব মহামারী অন্তর্ভুক্ত নয়। অবশ্য মাঝেমধ্যে প্লেগকে রূপক অর্থে মহামারী বলা হয়। তাই হয়তো অনেকে বাংলা অনুবাদ মহামারীর মাধ্যমে করে থাকে। কিন্তু শুধু বাংলা পড়ে তো কুরআন-সুন্নাহ বোঝা আদৌ সম্ভব নয়। আরবিতে দক্ষতা না থাকলে এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের তত্ত্বাবধানে না হলে এগুলোতে নিশ্চিত পদস্খলন ঘটে। মদীনা বহু আগ থেকেই মহামারীপ্রবণ এলাকা।
আয়েশা রা. বলেন—
وَقَدِمْنَا الْمَدِينَةَ وَهِيَ أَوْبَأُ أَرْضِ اللَّهِ.
“আমরা মদীনায় এলাম। অথচ আল্লাহর জমিনে এটি সবচেয়ে বেশি মহামারীপ্রবণ অঞ্চল।”
(সহীহ বুখারী: ১৮৮৯)।
হযরত ওমর রা.-এর শাসনামলেও মদীনায় মহামারী দেখা দিয়েছিল। হযরত আবুল আসওয়াদ রহ. তখন মদীনায় গিয়েছিলেন। তিনি বলেন—
أَتَيْتُ الْمَدِينَةَ وَقَدْ وَقَعَ بِهَا مَرَضٌ، وَهُمْ يَمُوتُونَ مَوْتًا ذَرِيعًا.
“আমি মদীনায় এসে দেখি মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, এতে লোকেরা দ্রুত মারা যাচ্ছে।”
(সহীহ বুখারী: ২৬৪৩)।
সুতরাং মহামারী করোনাভাইরাস মক্কা-মদীনায় প্রবেশ করাটা অসম্ভব নয়। হাদীসের সাথে এর কোনো বিরোধও নেই।

এখন দেখার বিষয় হলো, প্লেগ রোগ কী কখনও হারামাইন শরীফাইনে প্রবেশ করেছে?
না। করেনি। নবীজীর ভবিষ্যদ্বাণীর বদৌলতে কেয়ামত পর্যন্ত করবে না বলেও আমরা আশাবাদী। 

আল্লামা নববী রহ. আবুল হাসান মাদায়েনী রহ.-এর বরাত দিয়ে বলেন, ‘মক্কা-মদীনায় কখনও প্লেগ প্রবেশ করেনি।’ (কিতাবুল আযকার: পৃষ্ঠা ১৩৯)।

হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, ‘প্লেগ কখনও মদীনায় প্রবেশ করেনি।’
(ফাতহুল বারী: খণ্ড ১০,পৃষ্ঠা ২০১)।

নূরুদ্দীন সামহূদী রহ. তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘ওয়াফাউল ওয়াফা বিআখবারি দারিল মুস্তফা’য় উল্লেখ করেন, ‘এটা নবীজীর একটি চলমান মুজেযা। নবুওয়তের দলীলও বটে। কারণ ডাক্তার-চিকিৎসকগণ শত চেষ্টা করেও এলাকাগুলোকে প্লেগ মুক্ত রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে মদীনা মুনাওয়ারাহ হতে প্লেগ নিজেই দূরে সরে আছে। মদীনার পার্শ্ববর্তী হিজায, ইয়াম্বু, জেদ্দা, ফারা, সফরা, খাইফ ইত্যাদি স্থানগুলো প্লেগে আক্রান্ত হয়ে যায়, কিন্তু মদীনা ঠিকই সুরক্ষিত থাকে। যেমন: ৮৮১ হিজরির শেষের দিকে এবং পরবর্তী দিনগুলোতেও প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। মদীনা মুনাওয়ারাহর নিকটবর্তী জেদ্দাসহ অধিকাংশ জায়গা এতে আক্রান্ত হলেও মদীনা নিরাপদ ছিল...।’
(খণ্ড ১,পৃষ্ঠা ৩৭)।

ইমাম আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. বলেন, ‘মদীনায় মহামারী তো প্রবেশ করেছে, কিন্তু নবীজীর হাদীসের প্লেগ প্রবেশ করেনি। ভবিষ্যতে আর করবে না বলেও আশাবাদী।’
(আলআরফুশ শাযী: খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪২৭/ফয়যুল বারী: খণ্ড ৬,পৃষ্ঠা ৫৭)।

জাগো প্রহরী/ফাইয়াজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য