রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে ইসলামপন্হীদের অবস্থান : কিছু প্রস্তাবনা


সৈয়দ শামছুল হুদা ৷৷

গত কিছুদিন যাবত একটি বিষয় বারবার মনে পড়ছে। সে বিষয়ে কিছু কথা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতেই আমার এ লেখা। লেখাটি কারো মতের সাথে না মিললে আশাকরি গঠনমূলক সমালোচনা করবেন। আমার এ লেখার প্রসঙ্গ টেনে কাউকে ছোট করা, অপমান করা, হেয় চোখে দেখা বা গালি দেওয়া এসব কাজ করবেন না। 

প্রসঙ্গ কথা : 
গত কয়েকমাসে একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি যে, এদেশের ইসলামী রাজনীতি নিয়ে ভাবেন, চিন্তা করেন, স্বপ্ন দেখেন, দেখান এমন কতিপয় ব্যক্তি এদেশের আলেম সমাজের শীর্ষ কয়েকজন ব্যক্তির বিভিন্ন কর্মকান্ডে ক্ষুদ্ধ হয়ে খুবই আপত্তিজনক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। অথচ তাদের থেকে এমনটা আশা করা যায়নি। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আমেরিকা প্রবাসী মীনা ফারাহ, সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, বিশিষ্ট রাজনতিবিদ গোলাম মওলা রনি প্রমুখ। 

মীনা ফারাহ এর স্টেটাসের কিছু স্ক্রিনশর্ট আমি রেখেছি। তার লেখার প্রতিটি  শব্দে যেন ক্ষোভের আগুন ঝড়ে পড়ছিল। একেবারে আল্লামা আহমদ শফী দা.বা. কে নিয়ে পর্যন্ত কথা বলেছেন এবং তুলোধুনো করেছেন। সম্পাদক মাহমুদুর রহমান সাহেব পর্যন্ত ধৈর্য রাখতে পারেননি। তিনিও এদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে আলেম-উলামাদের ভূমিকায় ক্ষুদ্ধ হয়ে কিছু নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। আর সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন এবং গোলাম মওলা রনি’র বক্তব্যতো সবার সামনেই রয়েছে। 

এ প্রেক্ষিতে আমার চিন্তাজগতে কিছু পরিবর্তন অনুভূত হচ্ছে। বাংলাদেশের আলেমদের আসলে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কী ভূমিকা হওয়া উচিত, এ বিষয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। এতদিনের আলেমদের রাজনৈতিক ভূমিকা, আলেমদের অর্জন এসব বিষয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। এবং সামনের দিনের করণীয় ঠিক করা দরকার।

আমি মনে করি, আলেমদের যে শান, একজন প্রকৃত কুরআন ও হাদীসের ইলম অর্জন ও চর্চাকারীর যে দায়িত্ব, যে মর্যাদা সেটাকে সামনে রেখে যদি চিন্তা করি, তাহলে দেখবো, দেশের রাজনীতির ওপর বিশেষ কোন প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও দেশে প্রচলিত রাজনীতির যে সংস্কৃতি সেটা আলেম রাজনীতিবিদদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। আলেমানাহ শান  উলামায়ে কেরাম অনেক ক্ষেত্রেই ধরে রাখতে পারেননি। বর্তমান দেশের সেক্যুলার রাজনীতি, গণতান্ত্রিক রাজনীতি, তোষামোদি ও চামচামির রাজনীতি করতে গিয়ে অনেক আলেম যেমন নিজেরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন, তেমনি বর্তমান রাজনীতির খারাপ অভ্যাসগুলো অজান্তেই রপ্ত করে যাচ্ছেন। ফলে দেশের অনেক মানুষ যারা আলেমদের প্রতি অনেক বেশি ভালো ধারণা রাখেন তারা চরমভাবে হতাশ হচ্ছেন, ক্ষুদ্ধ হচ্ছেন। সমাজের নানা স্তরের উচ্চপদস্থ অনেক ব্যক্তি আলেমদের বর্তমান রাজনীতির ভূমিকার কারণে ক্ষু্দ্ধ। হতাশ। এটাকে শুধু যদি তাদের দোষ হিসেবে চালিয়ে দিতে চাই আমি মনে করি ইনসাফ করা হবে না। 

বিশেষকরে কওমী অঙ্গনের দিনে দিনে যে পরিমান বিস্তার  ঘটছে এবং যেভাবে কওমী অঙ্গনের লোকজন নানাস্তরে ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করছে  সেই পরিমাণে কওমী আলেমদের প্রাতিষ্ঠানিক কোন পুর্ব প্রস্তুতি নেই। প্রশিক্ষণ নেই। ফলে কওমী আলেমরা যে যেখানে যাচ্ছেন সেখানে খুব ভালো একটি অর্জন করতে পারছেন না। প্রস্তুতিহীন কর্মতৎপরতা, প্রশিক্ষণবিহীন রাজনীতি, নিয়ন্ত্রনহীন মিডিয়ার পদচারণায় নানা জায়গায় আলেমদের ওপরে অনেকের ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে। এটাকে আমরা অনেকক্ষেত্রে আলেম বিদ্বেষ, হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছি। বিরোধী পক্ষকে নাস্তিকতা, ইহুদীর দালাল, পাশ্চাত্যের ষড়যন্ত্র হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ভালো কিছু অর্জন করতে পারছি না। 

কওমী মাদ্রাসার গোটা সিলেবাসে রাজনৈতিক প্রস্তুতি গ্রহণের কোন আয়োজন নেই। সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশকে বুঝার মতো কোন পাঠ্যই আমাদের পাঠ্যপুস্তুকে নেই। এমনকি নেই ইসলাম ও মুসলমানদের অতীতকে জানার কোন ইতিহাস, মুসলমানদের সোনালী যুগকে জানার কোন ব্যবস্থা নেই। এসব  না থাকায়  এবং কওমী অঙ্গনের আলেমদের রাজনীতি চর্চায় কোন ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি না থাকায় সমাজ ও রাষ্ট্রে আমরা বন্ধুর চেয়ে শত্রুই বাড়াচ্ছি বেশি। 

একটি বিষয় আমি খেয়াল করেছি যে, এদেশে আলেম নয়, কিন্তু আলেমদের ভালোবাসেন, আলেমদের উন্নতি কামনা করেন এমন অনেক ব্যক্তি কিছুদিন আলেমদের সাথে কাজ করার পর আর আলেমদের প্রতি তার পূর্ব আস্থা ঠিক রাখতে পারেন না। কিছুদিন পর সেই লোকটি আলেমদের শত্রুতে পরিণত হন। এদেশের আলেম সমাজ নিজেদের গন্ডীর বাইরে এখনো পর্যন্ত কোন প্রকার ভালো বন্ধু তৈরি করতে পারেননি। রাজনীতিবিদদের মধ্যে, ব্যবসায়ীদের মধ্যে, সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবিদের মধ্যে, প্রশাসনের মধ্যে, মিডিয়ার মধ্যে, দেশে এবং বিদেশে ভালো বন্ধু তৈরি করতে পারেননি। সবক্ষেত্রেই আলেমগণ মসজিদ ও মাদ্রাসার সীমিত পরিসরের লব্দ জ্ঞান দিয়ে বিবেচনা করার কারণে এক পর্যায়ে সবাইকে আলেমরাও শত্রু মনে করতে শুরু করেন। 

এটি একটি জাতীয় সংকট বলে আমি মনে করি। এ থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে হবে। এটি একটি দুঃখজনক অভিজ্ঞতা। এজন্য আমি মনে করি : 

ক। প্রথমেই আমাদেরকে আমাদের সিলেবাসের দিকে নজর দিতে হবে। 
খ। বর্তমান সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতি বুঝার জন্য প্রশিক্ষণমুলক কর্মশালার আয়োজন করতে হবে। 
গ। সকলক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক পরিবর্তন আনতে কাজ করতে হবে। 
ঘ। অন্যান্য দেশের ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে হবে। 
ঙ। মুসলিম দেশগুলোতে অনুসৃত ইসলামী রাজনীতির সাথে আমাদেরকে ব্যাপকভাবে পরিচিত হতে হবে। 
চ।বিশ্বব্যাপী পরিচিত মুসলিম স্কলার ও রাজনীতিদের অনুসৃত নীতি ও আদর্শ সম্পর্কে আমাদেরক সচেতন হবে।  তাদের সাথে এদেশের বড় আলেমদের সম্পর্ক গড়ে তুলতে করণীয় ঠিক করতে হবে। 
ছ। লিখনীর জগতে আমাদেরকে খুব বেশি করে এগিয়ে আসতে হবে। 
জ। মানুষ যেন প্রকৃত ইসলামকে জানতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় সকল উদ্যোগ নিতে হবে। 
ঝ। প্রচার-প্রচারণায় আমাদেরকে কৌশলী হতে হবে। যোগ্য হতে হবে। 
ঞ। এই সময়ের ভাষা, রাজনীতি, কৌশল বুঝতে আলেমদের অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। 

আমাদের অনেক বন্ধু প্রতিপক্ষকে যুৎসই গালি দেওয়ার মধ্যেই দায়িত্ব শেষ মনে করেন। কথায় কথায় ইহুদীর দালাল, নাস্তিক, মুরতাদ, কাফের বলতে সামান্য দেরি করেন না। প্রতিপক্ষ আমাদেরকে সামান্য ভুল বুঝলে, ভুল করলে তাদেরকে আক্রমন করতে দেরি করি না। কিন্তু একজন আলেমকে কেন গালি দিলো  সেটা   বুঝার গভীরে যাই না। আলেম-উলামাদের রাজনৈতিক উত্থান পছন্দ করে না এমন মানুষের সংখ্যা এত বেশি যে, তা বুঝিয়ে বলা যাবে না। এ জন্য আামার কাছে মনে হয়েছে আমাদেরকে রাজনীতির ধরণ পরিবর্তন করতে হবে। মনোভাবের ব্যাপক পরিবর্তন করতে হবে। শুরু করতে হবে ক্ষমা ও ভালোবাসার রাজনীতি। এর ধরণ নিয়ে পরবর্তী লেখায় আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ। 

পরিশেষে যে কথাটি বলতে চাই তাহলো, বাংলাদেশে কিছু স্পেশালিষ্ট আলেম থাকা দরকার যারা এক একজন আদর্শ হিসেবে সকলের কাছে গ্রহনযোগ্যতা অর্জন করবেন। শুধূ আলেমদের কাছেই গ্রহনযোগ্য হলে হবে না, ধৈর্য, জ্ঞান, যোগ্যতা, ইলমী গভীরতা, ভাষার মাধুর্য, ভার-ভারিত্ব, স্বকীয়তা, আভিজাত্য সব দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ হবেন। সাধারণ মানুষও তাদের ইলমী যোগ্যতার দ্বারা উপকৃত হবে। তারা তাদের এই উপকার স্বীকার করতে বাধ্য হবে। উনারা বর্তমান রাজনীতির দুর্গন্ধময় পরিবেশ থেকে মুক্ত থেকে রাজনীতিবিদদের ওপর রাজনীতি করবেন। 

লেখক : জেনারেল সেক্রেটারি
বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট 'বিআইএম'

জাগো প্রহরী/এফ আর

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য