'লা আদওয়া' তথা সংক্রমণ সংক্রান্ত হাদীসসমূহের ব্যাখ্যার মাঝে সমন্বয় এবং কিছু কথা


মাওলানা মুফতী ডাক্তার মাসীহুল্লাহ ৷৷

রোগের সংক্রমণ সম্পর্কিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীসসমূহের যে ব্যাখ্যা ইমাম ও মুহাদ্দিসগণ দিয়েছেন সেগুলোর আলোকে আরেকটু বিস্তৃত আলোচনার উদ্দেশ্যে আমার এই লিখা।

এই হাদীসগুলো আমাদের দ্বীনি জিন্দেগীর খুবই গুরুত্বপূর্ণ তিনটি দিকের সাথে সম্পর্কিত  : আকিদা, আমাল এবং আহকাম।
আহকাম বলতে আমি এর সাথে সম্পর্কিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে করণীয় সম্পর্কে ফতোয়াকে বুঝাচ্ছি।

আলহামদুলিল্লাহ আমাদের সামনে আমাদের মাথার তাজ ফুকাহা ও ওলামায়ে কেরাম যথাযথ ফতোয়া দিয়ে উম্মতকে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। আর যেহেতু এ সম্পর্কিত মাসআলাগুলো মুজতাহাদ ফী, কাজেই এর উপর প্রদত্ত ফতোয়াগুলোর মাঝে ভিন্নতা থাকতে পারে। আর ফতোয়াগুলো এর প্রকৃত আহলগণের পক্ষ থেকে আসার কারণে এগুলোর অযৌক্তিক সমালোচনার হক আমরা কেউ রাখি না। আর মুজতাহাদ ফী মাসআলা হওয়ার কারণে এর মধ্যে কোনটি অধিকতর সহীহ তা নির্ণয় এই পৃথিবীতে সম্ভব নয়। কিন্তু এর প্রত্যেকটির উপর আমল করা আমাদের জন্য জায়েজ। আর উম্মত সে অনুযায়ী আমল করছে। আমরা যারা এর উপযুক্ত নই, এর মধ্য থেকে যে কোন একটির দিকে আমাদের রুজহান থাকতে পারে। এর জন্যে পরস্পর পরস্পরকে দোষারোপ করার কোন সুযোগ এখানে নেই। বরং উদারচিত্তে প্রত্যেককে তার রুজহানের উপর ছেড়ে দেয়া পরিস্থিতি ও শরীয়তের দাবী। এ জন্য এই বিষয়ে এখানে কোন আলোচনার দরকার নেই।

কিন্তু আমাকে কলম ধরতে হচ্ছে শুধু এই জন্যে যে একভাই  আমার উপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীসসমূহের নতুন ব্যাখ্যা দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন । আসলেই আমি এই ধরনের কোন অনধিকার চর্চা করছি কিনা, না তা আমাদের মুহাক্কিক পূর্বপুরুষদের রাজেহ মতের অনুসরণ ও সাধারণ মানুষের বুঝ উপযোগী করে সেগুলো পেশ করার সরল চেষ্টা - সেটিই এখানে খুলাসা করা আমার উদ্দেশ্য। 

★ আমি প্রথমেই এ সম্পর্কিত বর্ণিত হাদীসগুলো কিতাবের নামসহ এখানে পেশ করবো। এরপর মুহাদ্দিসগণ এর কী কী ব্যাখ্যা দিয়েছেন, এবং মুহাক্কিকগণ এর মধ্যে কোনটিকে কেন তারজীহ দিয়েছেন তা আমার সাধ্যমতো আলোকপাত করার চেষ্টা করবো। 

* সংক্রমন সংক্রান্ত প্রথম হাদীস :
عن أبي هريرة رضي الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لا عدوي ولا طيرة ولا هامة ولا صفر و فر من  المحذوم كما تفر من الأسد .  ( باب الجذام ، صحيح البخاري)
হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রোগব্যাধি ( তার নিজস্ব ক্ষমতায়)  একজনের দেহ থেকে অন্য জনের দেহে ছড়ায় না ( মাসিক আল কাউসার এ এক প্রশ্নের জবাবে দেয়া এই হাদীসের তরজমা),  কুলক্ষণ, পাখি উড়িয়ে ভাগ্য নির্ণয় এবং সফর মাস অশুভ হওয়া বলতে কিছু নেই। এবং কুষ্ঠ রোগী থেকে তুমি ঐভাবে পালাও যেভাবে সিংহ থেকে পলায়ন করে থাকো। ( সহীহ বুখারী)

* দ্বিতীয় হাদীস :
عن أبي هريرة رضي الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لا يوردن ممرض علي مصح ( كتاب الطب ، صحيح البخاري )
হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত,  তিনি বলেন,  রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,  রুগ্ন উটওয়ালা তার রুগ্ন উটকে অবশ্যই যেন সুস্থ উটওয়ালার সুস্থ উটের সাথে মিশ্রিত না করে । ( সহীহ বুখারী)

* তৃতীয় হাদীস:
عن أبي هريرةحين قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لا عدوى ولا صفر ولا هامة فقال أعرابي يا رسول الله فما بال الإبل تكون في الرمل كأنها الظباء فيجيء البعير الأجرب فيدخل فيها فيجربها كلها قال فمن أعدى الأول، ( صحيح مسلم)
হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত,  তিনি বলেন,  রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,  ( প্রথম অংশের তরজমা ১নং হাদীসে দেখুন) একজন গ্রাম্য বেদুইন জিজ্ঞেস করলো,  হে আল্লাহর রাসূল!  তাহলে ঐ উটগুলোর ক্ষেত্রে কি হবে যেগুলো ছিলো সম্পূর্ণ রোগমুক্ত, অতঃপর একটি পাঁচড়াযুক্ত উট এসে তাদের মাঝে প্রবেশ করলো এবং সবগুলোকে পাঁচড়াযুক্ত করে ফেললো। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, প্রথম উটটিকে আক্রান্ত করেছে কে? (সহীহ মুসলিম)

* চতুর্থ হাদীস :
عن عمرو بن الشريد الثقفي عن أبيه قال كان في وفد ثقيف رجل مجذوم فأرسل إليه رسول الله صلى الله عليه وسلم : إنا قد بايعناك فارجع ، رواه مسلم
হজরত আমর সাকাফী তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, সাকীফ গোত্রের প্রতিনিধি দলে একজন কুষ্ঠ রোগী ছিলো। তার কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোক পাঠিয়ে জানালেন, তোমাকে আমরা বায়আত করে নিয়েছি। তুমি ফিরে যাও। ( সহীহ মুসলিম)

আমরা এখানে বাহ্যত পরস্পর বিপরীত অর্থ নির্দেশ করে এমন হাদীস পাচ্ছি। এ ধরনের বিপরীতার্থক হাদীসের ক্ষেত্রে হয়তো উভয়ের অর্থের মাঝে সমন্বয় করতে হয়, অথবা একটিকে নাসেখ অন্যটিকে মানসুখ মানতে হয়।
এ সমস্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী রহ. শরহে মুসলিমে বলেন,

قال جمهور العلماء : يجب الجمع بين هذين الحديثين ، وهما صحيحان . قالوا : وطريق الجمع أن حديث ( لا عدوى ) المراد به نفي ما كانت الجاهلية تزعمه وتعتقده أن المرض والعاهة تعدي بطبعها لا بفعل الله تعالى . وأما حديث ( لا يورد ممرض على مصح ) فأرشد فيه إلى مجانبة ما يحصل الضرر عنده في العادة بفعل الله تعالى وقدره .

فنفى في الحديث الأول العدوى بطبعها ، ولم ينف حصول الضرر عند ذلك بقدر الله تعالى وفعله ، وأرشد في الثاني إلى الاحتراز مما يحصل عنده الضرر بفعل الله وإرادته وقدره .

فهذا الذي ذكرناه من تصحيح الحديثين والجمع بينهما هو الصواب الذي عليه جمهور العلماء ، ويتعين المصير إليه . ولا يؤثر نسيان أبي هريرة لحديث ( ولا عدوى ) لوجهين : أحدهما أن نسيان الراوي للحديث الذي رواه لا يقدح في صحته عند جماهير العلماء ، بل يجب العمل به . والثاني أن هذا اللفظ ثابت من رواية غير أبي هريرة ؛ فقد ذكر مسلم هذا من رواية السائب بن يزيد ، وجابر بن عبد الله ، وأنس بن مالك ، وابن عمر عن النبي صلى الله عليه وسلم .

وحكى المازري والقاضي عياض عن بعض العلماء أن حديث ( لا يورد ممرض على مصح ) منسوخ بحديث ( لا عدوى ) وهذا غلط لوجهين : أحدهما أن النسخ يشترط فيه تعذر الجمع بين الحديثين ، ولم يتعذر ، بل قد جمعنا بينهما .

والثاني أنه يشترط فيه معرفة التاريخ ، وتأخر الناسخ ، وليس ذلك موجودا هنا .

وقال آخرون : حديث ( لا عدوى ) على ظاهره ، وأما النهي عن إيراد الممرض على المصح فليس للعدوى ، بل للتأذي بالرائحة الكريهة ، وقبح صورته ، وصورة المجذوم . والصواب ما سبق . والله أعلم .
অর্থ : " জুমহুর ওলামায়ে কেরাম বলেন,  এই ধরনের উভয় হাদীসের মাঝে সমন্বয় করা জরুরী, যখন উভয় হাদীসই সহীহ হয়। আর সমন্বয় করার পদ্ধতি হলো, ' লা আদওয়া ' এর হাদীসের দ্বারা এই অর্থ নেয়া যে, এর দ্বারা জাহেলী যুগের মানুষের ঐ ধারণা ও বিশ্বাসকে নফী করা উদ্দেশ্য যা তারা ধারণা ও বিশ্বাস করতো। তারা বিশ্বাস করতো রোগব্যাধি আল্লাহ পাকের সৃষ্টির মাধ্যমে নয়, বরং নিজস্ব ক্ষমতায় সংক্রমিত হয়। আর 'لا يورد ممرض علي مصح এই হাদীস দ্বারা এটি নির্দেশ করা উদ্দেশ্য যে সুস্থ ও অসুস্থ পরস্পর সংস্পর্শে  অবস্থানের দ্বারা কার্য-কারণ হিসেবে যে ক্ষতি  পৌঁছে তাও আল্লাহ পাকের কুদরত ও তাঁর করার দ্বারা হয়।
প্রথম হাদীসে নিজ ক্ষমতায় রোগ ছড়িয়ে যাওয়াকে নফী করা উদ্দেশ্য, কিন্তু পরস্পর পরস্পরের সংস্পর্শের দ্বারা আল্লাহ পাকের কুদরত ও ফায়সালা হিসেবে ক্ষতি হওয়াকে অস্বীকার করা উদ্দেশ্য নয়। আর দ্বিতীয় হাদীস দ্বারা আল্লাহ পাকের ইরাদা, কুদরত ও ফায়সালায় যে ক্ষতি পৌঁছার সম্ভাবনা তা থেকে বেঁচে থাকার উপদেশ দেয়া হয়।
এই উভয় হাদীসের সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে আমরা যা আলোচনা করলাম সেটিই সঠিক এবং জুমহুর ওলামাদের মতও এর উপর। হজরত আবু হুরায়রা রা. লা আদওয়া হাদীসটি ভুলে গেছেন এই মর্মে যা বলা হয়েছে তা দুই কারনে কোন প্রভাব ফেলবে না। এক, কোন রাবী তার বর্ণিত কোন হাদীস ভুলে যাওয়া জুমহুর ওলামাদের মতানুযায়ী হাদীসের সঠিকতার উপর কোন প্রভাব ফেলে না। বরং তার উপর আমল করা ওয়াজিব হয়। দুই, এই হাদীস হজরত আবু হুরায়রা রাঃ ছাড়াও আরও অনেক রাবী বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিম রহ. এই হাদীসটি সায়ীব ইবনে যায়েদ, জাবের ইবনে আব্দিল্লাহ, আনাস ইবনে মালিক এবং ইবনে ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহুম থেকেও বর্ণনা করেছেন।
মারুজী এবং কাজী আয়াজ রহ. কিছু ওলামায়ে পক্ষ থেকে ' লা ইউরিদ মুমরিদ্বুন.....' হাদীসটি ' লা আদওয়া ' হাদীস দ্বারা মানসুখ হওয়ার কথাও বর্ণনা করেছেন। এটি দুই কারণে ভুল। এক,  মানসুখ হওয়া সে জায়গায় মানা যায়, যেখানে উভয় হাদীসের মাঝে সমন্বয় করা অসম্ভব হয়। এই ক্ষেত্রে উভয় হাদীসের মাঝে সমন্বয় করা অসম্ভব নয়, বরং আমরা তা করে দেখিয়েছি। দুই, নাসেখ-মানসুখ বলার জন্য ইতিহাস জানা থাকা জরুরী যে নাসেখ হাদীসটি পরের। এখানে এই ইতিহাস মওজুদ নয়।
অন্যরা বলেন,  ' লা আদওয়া ' হাদীসটি তার জাহেরের উপর নিতে হবে। আর দ্বিতীয় হাদীসটিতে সুস্থকে অসুস্থের সাথে মেশাতে নিষেধ করা সংক্রমণের আশঙ্কায় নয়, বরং কুষ্ঠ রোগীর শরীরের দুর্গন্ধ ও তার বদসূরত দেখে যেন কষ্ট পেতে না হয় সে উদ্দেশ্যে। আমরা প্রথমে যা বললাম, তাই সঠিক। আল্লাহ পাক ভালো জানেন।"

★ ইমাম নববীর কথা এখানে শেষ হলো, তিনি সংক্রমণকে পরিপূর্ণভাবে অস্বীকার করার পক্ষে নন, বরং সবব হিসেবে আল্লাহ পাকের হুকুমে সংক্রমণ হওয়ার প্রবক্তা এবং এর উপর জুমুহুর ওলামাদের ঐক্যমত বলে উল্লেখ করেছেন।
ইমাম ইবনে হাজার আসলাকানী এই উভয় ধরনের হাদীসগুলোর ব্যাখ্যা সম্পর্কিত ছয় মাসলাক বর্ণনা করেছেন। প্রত্যেক মাসলাকের পক্ষে দলিল আদিল্লা তিনি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। এই ছয়টির খুলাসা প্রকৃতপক্ষে  ইমাম নববী রহ. কর্তৃক উল্লিখিত ঐ তিন ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

এর মধ্যে সংক্রমনকে একদম পুরোপরি অস্বীকারের পক্ষে যারা বলেন,  তারা বিপরীত হাদীসগুলোকে নিম্নে উল্লিখিত পন্থায় তাবীল করেন।
১) যেমনটি ইমাম নববী রহ. বলেছেন, অর্থাৎ কুষ্ঠ রোগীর দূর্গন্ধ ও বদসুরত দেখার কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য।
২) স্বয়ং কুষ্ঠ রোগীর স্বার্থে সে যেন অন্যদের ভালো হালত দেখে নিজের মসীবতকে অনেক বড় জ্ঞান করে ব্যথিত না হয়।
৩) রোগীর সংস্পর্শে গিয়ে তো অসুস্থ হওয়ার কোন কারণ নেই, কারণ সংক্রমণ বলে বাস্তবেই কিছু নেই। কিন্তু কোন কারনে যদি এমনিতেই অসুস্থ হয়, তখন যেন রোগীর কাছ থেকে সংক্রমিত হয়েছে মনে করে নিজের আকিদা খারাপ না করে।

হজরত ইবনে হাজার আসকালানী রহ. নিজেও একদম মূল থেকে সংক্রমনকে অস্বীকার করার পক্ষে।
কিন্তু ইমামুল আসর আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. ইবনে হাজার আসকালানী রহ. কে কঠিনভাবে রদ করেছেন। 
তিনি বলেন,
واعلم أن الاشاعرة  زعموا أن العالم بأسره ذخيرة للأشياء الغير مرتبطة فقط ، ليس فيه سبب ولا مسبب ولا تأثير ولا أثر  انما حكم الناس بسلسلة التسبيب ، نظرا الي القران بين الشيئين فإذا نظروا الي ان هذين الشيئين يوجدان معا علي سبيل الاغلب حكموا يكون واحد منهما سببا والأخر مسببا ، فلا إغراق في النار ولا إغراق في الماء فكانهم هدروا سلسلة الاسباب كلها . و هذا في آخر سلم العلوم ، ان ترتب النتيجة عند الأشعري علي سبيل العادة فقط بدون تسبيب في نفس الأمر . حتي نسب إليهم ان من قال بالتسبيب فقد كفر كذا في روح المعاني "
قلت ولا أظن الأشعري ان يكون هدر سلسلة الاسباب بأسرها ، وإن نسب إليه ذلك فهو عند من المسامحات في النقول . وقال الشيخ الماتريدي : إن في الأشياء خواصا وهي مؤثرة بإذن الله تعالي ، والسببية والمسببية في الأشياء أيضا من جعل الله تعالي ، وهذا هو الصواب .
إذا علمت هذا ، فاعلم أنهم اختلفوا في شرح الحديث ، فقيل : ان نفي العدوي محمول علي الطبع ، أي لا عدوي بالطبع ، أما بجعل الله تعالي فهو ثابت. و ذكروا له شروحا آخر أيضا . والاصوب ما ذكره ابن القيم في زاد المعاد : ان العدوي المنفي هو اتباع الأوهام فقط ، بدون تسبيب في البين.
অর্থ: "শায়খ আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. বলেন, জেনে রেখো, নিশ্চয় আশআরীগণ এ কথা মনে করেন, পৃথিবীটা সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন ভিন্ন বস্তুসমুহের ভান্ডার যেগুলো কেবল একে অপরের সাথে সংযুক্ত হয়ে আছে। সেখানে কোন সবব নেই, মুসাব্বাব নেই ( অর্থাৎ কারণও নেই, ফলাফলও নেই), কোন প্রতিক্রিয়াও নেই, প্রভাবও নেই। মানুষ শুধুমাত্র দুই বস্তুর মাঝে সংযুক্তি দেখেই কার্য-কারণ ( কারণ ও ফলাফল) নির্ণয় করে । তারা যখন দেখে এই দুই জিনিসকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এভাবে এক সাথে সম্পৃক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়, তারা একটাকে সবব (কারণ) এবং অন্যটিকে মুসাব্বাব (ফলাফল) বলে আখ্যা দেয়। আসলে আগুনের মাঝে দহনের কোন বৈশিষ্ট্য নেই, পানির মধ্যে ডুবানোর কোন বৈশিষ্ট্য নেই। তারা যেন কার্য-কারণের এই সিলসিলাকে পুরোপুরি অকেজো বা প্রভাবহীন মনে করে। এভাবেই সুল্লামুল উলুম এর শেষের দিকে বলা হয়েছে।  আশআরীগন নতীজাকে কেবলই আদতের সাথে সম্পর্কিত করেন, কোন কার্য-কারণের সিলসিলা ছাড়া। এমনকি তাদের দিকে সম্বন্ধিত করে এ কথাও বলা হয়, যে কার্য-কারণের সিলসিলাকে মেনে নিলো, সে কুফরী করলো। যেমনটি ' রুহুল মাআনী'তে এসেছে।

এরপর তিনি বলেন,  " আমি বলি,  আশআরীগন কার্য-কারণের সিলসিলাকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেন তা আমি মনে করি না। ইহা আমার কাছে নকলের ভুল (তাসামুহ)। শায়খ মাতুরিদী রহ. বলেন, নিশ্চয়ই বস্তুর মাঝে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তা আল্লাহ পাকের হুকুমে ক্রিয়াশীল। বস্তুর মাঝে সবব হওয়া, মুসাব্বাব হওয়া তাও আল্লাহ পাকের করার কারণে। আর ইহাই সঠিক।
এখন ইহা যখন জানলে, তাহলে বুঝে নাও তারা এর উপর ভিত্তি করে হাদীসগুলোর ব্যাখ্যার মাঝেও ইখতিলাফ করেন। সুতরাং বলা হয়, সংক্রমণকে নফী করা দ্বারা নিজ ক্ষমতায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংক্রমিত হওয়ার ধারণাকে নফী করা উদ্দেশ্য। অর্থাৎ নিজ ক্ষমতায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে রোগ একজনের কাছ থেকে অন্য জনের শরীরে যায় না।  কাজেই আল্লাহ পাকের করার মাধ্যমে সংক্রমণ হওয়া এটি প্রমানিত ও প্রতিষ্ঠিত। তারা এর আরও অনেক ব্যাখ্যা বর্ণনা করেছেন। সবচেয়ে সঠিক ব্যাখ্যা সেটিই যা আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রহ. 'যাদুল মাআদ' কিতাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, যে সংক্রমনকে হাদীসে অস্বীকার করা হয়েছে তা হচ্ছে  কিছু ভুল ধারণাকে অস্বীকার করা। উভয়ের মাঝে অর্থাৎ দুইজনের মাঝে রোগ ছড়ানোর সবব মুসাব্বাব হওয়া বা কার্য-কারণকে অস্বীকার করা নয়।
(ফয়জুল বারী, ৬ষ্ঠ খন্ড, ৫১ পৃষ্ঠা)

এরপর অন্যত্র তিনি ইবনে হাজার রহ. কে রদ করে বলেন, 
وقد أجاب الحافظ عن تعارض الحديثين في نفي العدوي والفرار من المجذوم بالوجهين . و نقل جوابا عن الشيخ عمرو بن الصلاح . فلت والحق أحق أن يتبع ان الحافظ حافظ فنه ، ولا ريب ، أما ان السببية الظبعية؟ ما ذا هى في الفلسفة ؟ وما ذا إرتباطها بالقدرة؟ وأنها هل يمكن إجتماعها مع القدرة أو لا؟ فتلك الأمور لا يعرفها الحافظ ، ولم أدر من تصنيف من تصانيفه أنه كانت له يد في الفلسفة .
হাফেজ (ইবনে হাজার) রহ. সংক্রমণকে অস্বীকার এবং কুষ্ঠ রোগী থেকে পলায়ন - এই উভয় হাদীসের মাঝে যে বৈপরীত্য তার জবাব দিতে দুই সুরতের বর্ণনা দিয়েছেন, আবার এর পক্ষে হজরত আমর ইবনে সালাহ রহ. থেকে জবাবও নকল করেছেন। আমি বলি, যা হক তাহাই অনুসৃত হওয়ার বেশি হক রাখে। হাফেজ র. নিজের ফন বা বিদ্যার হাফেজ। এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু কোন বস্তুর সবব হওয়ার অর্থ কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজ ক্ষমতায় করা? দর্শন ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি কি ইহাই?  সববের সাথে কুদরত জমা হওয়া কি সম্ভব, না অসম্ভব? আসলে দর্শনের সাথে সম্পর্কিত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হাফেজ রহ. জানতেন না। আমি তাঁর কিতাবসমুহের মাঝে এমন কিছু পাই নি যার দ্বারা দর্শনে শাস্ত্রে তাঁর দখল প্রমানিত হয়! " ( ফয়জুল বারী, ৬ষ্ঠ খন্ড,  ৬৩ পৃষ্ঠা।)

আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. এর আলোচনা এখানে শেষ হলো। তিনি রোগীর সংস্পর্শে আসা রোগ সংক্রমণের সবব হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করার কারনে ইবনে হাজার রহ. এর  উপর আপত্তি করেছেন।

★ আল্লামা শাহ ওয়ালিউল্লাহ  মুহাদ্দিসে দেহলবী রহ. হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগায় লিখেন,
ونفي العدوي : لا بمعني نفي أصلها ، لكن العرب يظنونها سببا مستقلا وينسون التوكل رأسا .
অর্থাৎ সংক্রমণকে অস্বীকার করা এই অর্থে নয় যে সংক্রমনের বিষয়টি মূল থেকে একেবারে অস্বীকার করা।  বরং আরবেরা একে স্বয়ংসম্পূর্ণ সবব মনে করতো এবং তাওয়াক্কুলের বিষয়টি পুরোপুরি ভুলে যেতো।

হজরত আল্লামা সাঈদ আহমদ পালনপুরী দামাত বারাকাতুহুম এর টীকায় লিখেন,  সংক্রমণের অর্থ হলো রোগ রোগী থেকে সুস্থ ব্যক্তির শরীরে স্থানান্তরিত হওয়া।
মূল সংক্রমণকে অস্বীকার না করার অর্থ হলো, কখনও কখনও রোগ রোগী থেকে সুস্থ ব্যক্তির শরীরে স্থানান্তরিত হয়। এ জন্যই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,  কুষ্ঠ রোগী থেকে ঐভাবে পালাও যেভাবে সিংহ থেকে পলায়ন করে থাকো। অর্থাৎ কিছু রোগের ক্ষেত্রে রোগীর সাথে মিশ্রিত হওয়া রোগের কারণ হয়।  কাজেই এ ধরনের ক্ষেত্রে মানুষের উচিত ঐ ধরনের রোগীর সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকা।
(হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, হজরত সাঈদ আহমদ পালনপুরী দামাত বারাকাতুহুম এর টীকাসহ, মূল আরবী কিতাব, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা ৫৮১)

★ শাফিয়ী মাযহাবের বিখ্যাত ইমাম বায়হাকী (৪৫৮হি.) বলেন,

وَأَمَّا قَوْلُهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا عَدْوَى» فَإِنَّهُ أَرَادَ وَاللهُ أَعْلَمُ عَلَى الْوَجْهِ الَّذِي كَانُوا يَعْتَقِدُونَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ مِنْ إِضَافَةِ الْعَمَلِ إِلَى غَيْرِ اللَّهِ تَعَالَى، ثُمَّ قَدْ يَجْعَلُ اللَّهُ تَعَالَى بِإِرَادَتِهِ مُخَالَطَةَ الصَّحِيحِ مَنْ بِهِ شَيْءٌ مِنْ هَذِهِ الْعُيُوبِ سَبَبًا يُحَدِّثُونَهُ بِهِ، وَقَدْ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَرِدُ مُمرِضٌ عَلَى مُصِحٍّ، وَبِاللَّهِ الْعِصْمَةُ»(السنن الصغير:2515)

অর্থাৎ রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বলেছেন, ‘কোন সংক্রমন নেই’ এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য হলো, জাহিলী যুগে যে বিশ্বাস ছিল আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে কাজের স্রষ্টা মনে করত সে বিশ্বাসকে খন্ডন করা। আল্লাহতায়ালা তো অসুস্থ জিনিসের সংশ্রবে সুস্থ কোন কিছু আসাকে অসুস্থতার কারণ বানিয়ে দিতে পারেন। তাই তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, অসুস্থ উটকে কেউ যেন সুস্থ উটের কাছে না নিয়ে যায়।(আসসুনানুস সগীর:২৫১৫)
বুখারী শরীফের বিখ্যাত ভাষ্যকার ইমাম খাত্তাবী (৩৮৮হি.) তার বিখ্যাত ভাষ্য গ্রন্থ ‘আ’লামুল হাদীস গ্রন্থে বলেন,
قوله: لا عدوى, يريد أن شيئًا لا يعدى من قبل ذاته وطبعه وما كان من ضرر وفساد, فإنما هو بمشيئة الله وقضائه وقدره.(أعلام الحديث: ৩/২১১৮)

অর্থাৎ হাদীসে যে ‘লা আদওয়া’ বা কোন সংক্রমন নেই কথা আছে তার দ্বার উদ্দেশ্য হলো, কোন জিনিসের মাঝে সংক্রমনের নিজস্ব ক্ষমতা নেই। এবং সেটা তার স্বভাবজাত নয়। তাতে যে ক্ষয়-ক্ষতির বিষয় রয়েছে সেটা আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছাধীন ও তার ফায়সালার নিয়ন্ত্রণাধীন। (আ’লামুলহাদীস: ৩/২১১৮)

★ খুলাসা কথা হলো, উপরিউক্ত হাদীস সমূহের বাহ্যত বিরোধ নিরসন কল্পে এসব মুহাক্কিক উলামায়ে কেরামের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ হলো, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাহিলী যুগে যে সংক্রমনের বিশ্বাস ছিল তাকে নির্মূল করেননি। তার অস্তিত্বকে পুরোপুরি অস্বীকার করেননি। বরং তার মাঝে ইতিদাল তথা আকীদায় ভারসাম্য আনার চেষ্টা করেছেন। অর্থাত ভাল-মন্দ, রোগ-ব্যাধি আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি। তার সৃষ্টির মাঝে রয়েছে নানা বৈচিত্র। তিনি তার নানা সৃষ্টির মাঝে রেখে দিয়েছেন নানা রকম প্রভাব ও ক্ষমতা। তবে এ প্রভাব ও ক্ষমতা রোগের নিজস্ব নয়। বরং তা তারই নিয়ন্ত্রনাধীন। তাই এ হাদীসে তার উদ্দেশ্য হল, রোগের সংক্রমন তো রোগের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহরই দান। রোগের নিজস্ব কোন ক্ষমতা নেই। তাই ইচ্ছা করলেই তা সংক্রমিত হবে। এটা জরুরী নয় যে, এসব রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তির সংশ্রবে গেলেই আক্রান্ত হয়ে পড়বে।
বরং এটা একটা সবব বা কার্য-কারণ যা আল্লাহ তায়ালার হুকুমেই কাজ করে।
এজন্যই অপর হাদীসে এজাতীয় কার্যকারণ থেকে দুরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ ইসলাম জীবনের জন্য অতীব প্রয়োজন ছাড়া কোন ঝুকি নেওয়ার শিক্ষা দেয় না। এই উম্মতের সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরাম এমতের প্রবক্তা। তাদের মধ্যে রয়েছেন, ইমাম খাত্তাবী (৩৮৮হি.), ইমাম বায়হাকী (৪৫৮হি.),ইমাম ইবনুস সালাহ (৬৪৩হি.)ইমাম নববী (৬৭৬হি.), হাফেয জালালুদ্দীন সুয়ূতী (৯১১হি.) সহ অধিকাংশ শাফিয়ী ফুকাহা, আল্লামা তুরবেশতি হানাফী(৬৬১হি.), আল্লামা তীবী (৭৪৩হি.),ইবনে মালাক (৮৫৪হি.), মোল্লা আলী আল কারী (১০১৪হি.) ফকীহুন নফস মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী (১৩২৬হি.), সহ অনেক হানাফী উলামায়ে  কেরাম ।

★ উপরের সমস্ত আলোচনার সারমর্ম দুই কথা।
১) হয়তো আপনি সংক্রমনকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করবেন, তখন কিন্তু এর আসবাব থেকে সতর্কতা অবলম্বনের কোন প্রশ্ন আসবে না।  এ জন্যই দেখুন উপরে যারাই এ মতের প্রবক্তা তারা কেউ এর বিপরীত হাদীসগুলোকে সংক্রমনের আসবাব থেকে সতর্কতা অবলম্বনের উপর মাহমুল করেন নি।  তারা তা ভিন্নভাবে তাবীল করেছেন। হয়তো রোগীর শরীরের দুর্গন্ধ থেকে বাঁচা,  অথবা রোগী যেন নিজের থেকে সুস্থদের দেখে নিজের মসীবতকে বেশি মনে করে কষ্ট না পায়। অথবা কোন রোগীর সংস্পর্শে গিয়ে সংক্রমন নয় বরং এমনিতেই যদি সে ঐ রোগে আক্রান্ত হয় তাহলে যেন সংক্রমণের আকিদায় লিপ্ত হয়ে তার আকিদা নষ্ট না হয়।
২) অথবা লা আদওয়া দ্বারা রোগের স্বয়ংক্রিয় সংক্রমণকে নফী করবেন,  আল্লাহর হুকুমে সবব হিসেবে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনাকে স্বীকার করে নেবেন। ফলে অন্য হাদীসগুলোকে সতর্কতা অবলম্বনের উপর মাহমুল করা হনে। আর এই মতের প্রবক্তাগনও সেটিই করেছেন।
এখন আমরা আবার একটু হাদীসগুলোর দিকে দৃষ্টিকে ফেরাই, কেন জুমহুর ওলামাগন স্বয়ংক্রিয় সংক্রমণকে নফী করেন, আল্লাহর হুকুমে সংক্রমিত হওয়ার ধারণাকে সাবিত করেন এবং এর দাবী হিসেবে সতর্কতা অবলম্বন এর উপর গুরুত্ব দেন।
প্রথম হাদীসে কুষ্ঠ রোগী থেকে পালাতে বলা হচ্ছে। কেন? রোগীর দুর্গন্ধ থেকে বাঁচার জন্য?  রোগীর মন খারাপ হয়ে তার কষ্ট হবে তাই? ঐ রোগে আক্রান্ত হয়ে আকিদা নষ্ট হওয়ার ভয়ে?
বলাবাহুল্য এর কোনটির জন্য পালানো লাগে না, সর্বোচ্চ একটু দূরত্ব রক্ষা করলেই হয়। কিন্তু পালাতে হয় যখন প্রাণ বাঁচানোর দায় থাকে। ফলে সংস্পর্শে যাওয়া সংক্রমণের সবব হওয়া এই হাদীস দ্বারা সাবেত হয়। এই হাদীসে আরেকটি সুক্ষ্ম দিক আছে।  রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেকগুলো হাদীসে রোগী দেখতে যাওয়ার ফজীলত বর্ণনা করেছেন। নিজে স্বয়ং রোগী দেখতে যেতেন। আর এই হাদীসে রোগী থেকে পলায়ন করতে বলছেন। ব্যাপারটা কেমন না? এর দ্বারা একটা সুক্ষ্ণ বিষয় বুঝে আসে। রোগ দুই প্রকার। কিছু রোগ সংক্রামক, আর কিছু রোগ সংক্রামক নয়। তিনি রোগী দেখতে যাওয়ার তারগীব দেন। আর যেখানে সংক্রামক সেখানে প্রয়োজনে সতর্কতাবশত পালাতেও বলেন! বর্তমান সময়ে ডাক্তাররাও ঠিক একই কথা বলেন।
Diseases are two types - Communicable and Non-communicable.

★ কাজী আবু বকর বাকিল্লানী রহ. ও ঠিক তাই বলেন, 
قال القاضي ابو بكر الباقلاني إثبات العدوي في الجذام ونحوه مخصوص من عموم نفي العدوي ، قال فيكون المعني قوله  'لا عدوي ' أي إلا من الجذام والبرص والجرب مثلا ، قال فكأنه قال لا يعدي شيء شيئا إلا ما تقدم تبييني له ان فيه عدوي .و قد حكي ذلك ابن بطال أيضا.
তিনি বলেন, সাধারণভাবে সংক্রমনকে নফী করা হলেও কুষ্ঠ ইত্যাদি এর থেকে ব্যতিক্রম। তিনি বলেন, এর অর্থ হবে সব রোগে সংক্রমন নেই, তবে কুষ্ঠ, খোসপাঁচড়া ইত্যাদি সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে সংক্রমণ আছে। তিনি আরও বলেন, সাধারণত রোগ একজন থেকে অন্য জনে ছড়ায় না, তবে যে সব সংক্রামক রোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোতে ছড়ায়। ইবনে বাত্তাল রহ. ও তা বলেছেন।
আর ডাক্তাররাও একই কথা বলছেন। ডায়াবেটিস, হাই প্রেসার ইত্যাদি ছড়ায় না,  তবে করোনা, এইডস, যক্ষা ইত্যাদি ছড়ায়।

★ দ্বিতীয় হাদীসটা খেয়াল করি, রুগ্ন উটকে সুস্থ উটের সাথে যেন অবশ্যই না রাখে। বুখারীর যে রেওয়ায়াত এখানে নূনে তাকীদ যুক্ত করে নাহী করা হয়েছে। এত তাকীদ কেন? ঐ তিন কারনে, নাকি সংক্রমণের আশঙ্কায়?
তৃতীয় হাদীসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রশ্ন, প্রথমটিকে কে আক্রান্ত করেছে? এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো প্রথমটিতে যেমন রোগের স্রষ্টা আল্লাহ পাক, পরবর্তী প্রত্যেক রোগীর ক্ষেত্রেও রোগের স্রষ্টা আল্লাহ পাক, তুমি বাহ্যিকভাবে যা দেখছো, অসুস্থ উটের সাথে মিশ্রণ তা সবব মাত্র, প্রকৃত রোগ আল্লাহ পাকের ইচ্ছা ও কুদরতের দ্বারাই হচ্ছে। বলাবাহুল্য এখানেও সংক্রমণকে মূলসহ সম্পূর্ণ অস্বীকার করা উদ্দেশ্য নয়।

মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ দ্বিতীয় মতকেই সমর্থন করে।
আমি জুমহুর ওলামাদের এই প্রসিদ্ধ মতকে একটু সহজভাবে পেশ করেছিলাম। সাথে কারণ হিসেবে ভাইরাসের কথা বলেছিলাম। খুব অসুবিধা হয়েছে এতে? না, বরং সংক্রমণের সবব হওয়ার বিষয়টি এতে আরও সুস্পষ্ট হয়েছে। এতে আপত্তি তোলার কোন কারণ দেখি না। এতে হজরত কাশ্মিরী রহঃ এর ইবনে হাজার রহঃ এর উপর উত্থাপিত দর্শন ও বিজ্ঞান না জানার আপত্তি আমিও এখানে করতে পারি। তবে আমার মতে তা খুব বড় দূর্বলতা নয়।
সাপের কামড়ের উদাহরণ এই জন্য ছিলো না যে আমার দৃষ্টিতে সাপের স্থানান্তর ও কামড়ানো এবং ভাইরাসের সংক্রমণ একই জিনিস। একজন ডাক্তারের প্রতি এটি ভয়ানক অবিচার ।  তবে তা কার্য-কারণ হওয়ার বিষয়টি বুঝানোর জন্য উদাহরণ ছিলো। উদাহরণ দেয়ার ক্ষেত্রে উভয়ের মাঝে শতভাগ সাদৃশ্য জরুরী নয়। বরং যে বিশেষ দিকটি বুঝানো উদ্দেশ্য তা কমন হলেই হলো।
আকিদা ও শিরকের ভিত্তি কি প্রচলনের উপরে? মোটেই নয়। তা পরিপূর্ণ ওহীর ইলমের ভিত্তিতে। কবরওয়ালাকে সাহায্যের জন্য ডাকা এ জন্য শিরক যেহেতু সে একটা অতিমানবীয় বিষয়কে একজন মানুষের দিকে নিসবত করছে। কারণ কবরওয়ালা তাকে কবর থেকে সাহায্য করতে হলে তাকে তার হালত কবর থেকে জানতে হবে,  ওখান থেকে অভাবনীয় ক্ষমতা বলে তাকে তাসার্রুফ করতে সক্ষম হতে হবে এবং এই ইস্তিগাছার সে হকদার হতে হবে।  আর তা তো পরিষ্কার রবুবিয়ত ও উলুহিয়ত, যার প্রকৃত হকদার ঐ কবরওয়ালা কখনও নয়।

কিন্তু ভাইরাসের রোগ ছড়ানোর সবব হওয়া দুনিয়াতে আল্লাহ পাকের ইচ্ছা ও ফায়সালা অনুযায়ী হাজারও কার্য-কারণ সংঘটিত হওয়ার মতো মুমকিন একটা বিষয়। এতে শিরক খোঁজা তো শিরকের হাকীকত না বুঝারই ফল ছাড়া আর কিছুই না। আর আমরা তা একটু আকিদার কিতাব থেকেও দেখে নিতে পারি সবব মনে করলে শিরক হয় কিনা।

★ হজরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী রহ. তাঁর আল আকিদাতুল হাসানাহ কিতাবে বলেন,
وَلاَ يَشْفِىْ مَرِيْضًا وَلاَ يَرْزُقُ رِزْقًا وَلاَ يَكْشِفُ ضَرًّا إِلاَّ هُوَ، بِمَعْنَى أَنْ يَقُوْلَ لِشَىْءٍ كُنْ فَيَكُوْنَ. لاَ بِمَعْنَى السَّبَبِ العَادِىِّ الظَّاهِرِىِّ. كَمَا يُقَالُ شَفَى الطَّبِيْبُ المَرِيْضَ. وَرَزَقَ الأَمِيْرُ الجُنْدَ، فَهَذَا غَيْرُهُ، وَإِنْ أَشْبَهَ فىِ اللَّفْظِ.
তিনি বলেন, " তিনি ছাড়া আর কেউ সুস্থতা দিতে পারে না,  রিযক দিতে পারে না, ক্ষতি দূরও করতে পারে না কেউ তিনি ছাড়া। তবে তা এই অর্থে যে, তিনি হও বললেই তা হয়ে যায়, স্বাভাবিক জাহেরী আসবাবের অর্থে নয়। যেমন বলা হয়, ডাক্তার রোগীটিকে সুস্থ করে তুলেছেন, আমীর সৈন্যদের রিজকের ব্যবস্থা করেছেন। এটি শব্দের দিক দিয়ে এক হলেও বাস্তবে অন্য জিনিস। "
বিজ্ঞান কি করে প্রতিষ্ঠিত ফিকহী কায়দাকে পরিবর্তন করবে?  তবে কখনও কখনও বিজ্ঞানের সঠিক জ্ঞান অনেক শাখাগত মাসআলার ফায়সালা পাল্টে দেয়। এর অনেক উদাহরণ দেয়া যায়। আমি মাত্র দুটি পেশ করছি।
আল বাহরুর রায়েক কিতাবে আল্লামা ইবনে নুজাইম রহ. কিতাবুস সাওমে একটি মাসআলা বর্ণনা করেছেন। কোন পুরুষ যদি তার প্রশ্রাবের রাস্তা দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় তেল বা,পানি বা,ঔষধ প্রবেশ করায় রোজা ভাঙ্গবে কি ভাঙ্গবে না।
ইমাম আবু হানিফা রহ. ও ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর মতে ভাঙ্গবে না,  কিন্তু হজরত আবু ইউসুফ রহ. এর মতে ভাঙ্গবে। আসল কথা হলো তিনি মনে করেছিলেন,  মুত্রথলি ও অন্ত্রের মাঝে কোন পথ আছে, তাই ওখানে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি রোজা ভাঙ্গবে বলেছেন। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জানেন, কোন পথ নেই। ফলে ভাঙ্গবে না।

এই মাসআলা উল্লেখ করে আল্লামা ইবনে নুজাইম রহ. বলেন, 
قال في الهداية : و هذا ليس من باب الفقه لأنه متعلق بالطب .
হেদায়া কিতাবে এসেছে,  ইহা ফিকহের অধ্যায়ের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়,  কারণ ইহা চিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রান্ত বিষয়।

একই ভাবে মাথার কোন ক্ষতস্থান দিয়ে যদি ঔষধ ব্রেইনের ভেতরে চলে যায় রোজা ভাঙ্গবে কিনা।  আগেকার জমানার ফকীহগন বলেছেন, রোজা ভেঙে যাবে। মুফতি দেলোয়ার হোসেন দামাত বারাকাতুহুম তাঁর ' ইসলাম ও আধুনিক চিকিৎসা ' নামক কিতাবে এই প্রসঙ্গে বলেন,  বর্তমান ফতোয়া হলো ভাঙ্গবে না। কারণ তখনকার ডাক্তারগন মনে করতেন, ব্রেইন ও পাকস্থলীর মাঝে ছিদ্রপথ আছে। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে কোন ছিদ্রপথ নেই। তাই রোজা ভাঙ্গবে না।
তো সঠিক উপকারী বিজ্ঞান শাখাগত অনেক মাসআলায় সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। আর কোন ফিকহী কায়দা পরিবর্তন করে না বটে তবে সঠিক তথ্য সরবরাহ করার কারনে কোন মাসআলায় কোন কায়দা প্রযোজ্য হবে অনেক সময় তার নির্দেশনা দেয়।   

বিজ্ঞান তো পরিবর্তনশীল। জী, শাখাগত বিষয়ে সব বিদ্যা কমবেশি পরিবর্তনশীল। তবে আমরা বিজ্ঞানকে দুইভাগে ভাগ করি।
আকলে সহীহর ইদরাকের সীমার ভেতরে সীমাবদ্ধ সঠিক ও উপকারী বিজ্ঞান, আর কেবল ধারণা ও কল্পনার ঘোড়া দৌড়িয়ে রচিত কল্পিত অপবিজ্ঞান।
এই কথা প্রসিদ্ধ আছে,  আকলে সহীহ কখনও নকলে সরীহের সাথে বৈপরীত্য দেখায় না। জী,  এই আকলে সহীহর ইদরাকের সীমায় যা কল্যানকর, তেমন বিজ্ঞান যারা চর্চা করে তারা কুরআন ও সুন্নাহর সত্যতা উপলব্ধি করে ইসলাম কবুল করে। আর অপবিজ্ঞান নাস্তিকতার বিষবাষ্প ছড়ায়।  তার কথা কি আমি বলছি?

ভাইরাস এখন মহামারী হয়ে গেছে। তা আর সাধারণ নয়। জী ভাই! সাধারণ নয় বলেই তো বলা হচ্ছে তা চরম পর্যায়ের সংক্রামক হওয়ার কারনে ওহান থেকে সারা পৃথিবীতে পৌঁছে গেছে। অবশ্যই তার সুমহান স্রষ্টার ইশারায়। আর ঠিক এ কারণে পরিপূর্ণ সতর্কতা অবলম্বনের সাথে সাথে আল্লাহ পাকের উপর পরিপূর্ণ ভরসা করাও জরুরী।

তথ্যসুত্র :
১) সহীহ বুখারী
২) সহীহ মুসলিম
৩) ফতহুল বারী শরহে সহীহ বুখারী
৪) ফয়জুল বারী শরহে সহীহ বুখারী
৫) শরহে মুসলিম, ইমাম নববী
৬) হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা
৭) আল আকিদাতুল হাসানাহ
৮) আল বাহরুর রায়েক
৯) আল হেদায়া
১০) ইসলাম ও আধুনিক চিকিৎসা, মুফতী দিলাওয়ার হোসাইন

(ইষৎ সংক্ষেপিত)

জাগো প্রহরী/ফাইয়াজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য