সন্দ্বীপের মাটিতে একরাত


মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী ৷৷ 

সন্দ্বীপ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে বঙ্গোপসাগরে মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত ছোট্ট  একটি দ্বীপ। এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্যে- প্রাচুর্যে ঘেরা অত্যন্ত প্রাচীন একটি দ্বীপ। ইউরোপীয়দের লেখা ইতিহাসে জানা যায় যে সন্দ্বীপে প্রায় তিন হাজার বছরের অধিককাল ধরে লোক বসতি বিদ্যমান। ১৮৮.৬২ বর্গমাইল দ্বীপটিতে বর্তমান এখানে প্রায় ৪০০,০০০ জনসংখ্যার আবাস ভূমি।

সন্দ্বীপের প্রতি আমার রয়েছে অগাধ ভালোবাসা ও ভালো লাগা। কারণ,  আমাদের বহু আকাবির হযরতগণের জন্মস্থান সন্দ্বীপ।  বিশেষ করে বাংলার প্রথম মুহাদ্দিস আল্লামা সাঈদ আহমদ সাহেব রহ. জামিয়া আরাবিয়া ইসলামিয়া জিরি মাদরাসার সুযোগ্য শাইখুল হাদীস  মাওলানা আব্দুল ওয়াদুদ রহ. পাক ভারাত আজাদী আন্দোলনের সিপাহসালার ও শাইখুল ইসলাম সায়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. এর সুযোগ্য খলিফা মাওলানা ইদরিস রহ. মাওলানা ওজিউল্লাহ সন্দ্বীপী   ঢাকা মিরপুর জামিয়া হোসাইনিয়া ইসলামিয়া আরজাবাদ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও খতমে নবুয়ত আন্দোলনের সিপাহসালার মাওলানা শামসুদ্দিন কাসেমী রহ. উত্তর চট্টলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া নসীরুল ইসলাম নাজিরহাট বড় মাদরাসার সুযোগ্য  মুহাদ্দিস প্রখ্যাত ওয়ায়েজ আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই মাওলানা জামাল উদ্দিন এবং আমার বন্ধুবর দারুল উলূম হাটহাজারী মাদরাসার মুহাদ্দিস ও মুফতী, মুফতী কিফায়াতুল্লাহ সহ অসংখ্য ওলামায়ে কেরাম জন্মগ্রহণ করেছেন ছোট্ট এই দ্বীপটিতে। 

ছোট বেলা থেকেই সন্দ্বীপের প্রতি আগ্রহ থাকলেও সর্বপ্রথম সন্দ্বীপ যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল সম্ভবত  ২০০৫ ইংরেজিতে দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম  হাটহাজারী মাদরাসার সাবেক শাইখুল হাদীস আল্লামা আব্দুল আজিজ রহ. এর খলিফা মাওলানা ইয়াসিন সাহেব এর সাহেবজাদা মাওলানা হাবিবুল্লাহ ফয়সাল এর আমন্ত্রণে একটি তাফসীরুল কুরআন মাহফিলে।


তারপর থেকে দীনি দাওয়াত এর নিসবতে প্রায়  যাওয়া হয়। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি'২০ইং আবার  গিয়েছিলাম সন্দ্বীপে। সন্দ্বীপ দারুল ইহসান মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক মাওলানা আবু তাহের বেলাল সাহেবের আমন্ত্রণে। পীরে কামেল মাওলানা ইহসানুল হক  সন্দ্বীপী ছিলেন দেশের  গ্রহণযোগ্য  আলেমদের অন্যতম। খোদাভীতি,  দ্বীনদারী, সচ্ছতা, আমানতদারিতা সন্দ্বীপবাসীর কাছে তাকে গ্রহণযোগ্যতার শীর্ষে বসিয়েছিলেন। মাওলানা ইহসানুল হক রহ. মৃত্যু পর্যন্ত জামিয়া দারুল মা'রিফ আল ইসলামিয়া চট্টগ্রামের শাইখুল হাদীসের দায়িত্ব পালন করেছেন। মাওলানা ইহসানুল হক রহ. নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সন্দ্বীপ দারুল ইহসান মাদরাসা। 

প্রায় ৪০/৪৫ বার সন্দ্বীপ যাওয়ার অভিজ্ঞতায় একটা বিষয় আমার কাছে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়েছে যে, সন্দ্বীপের মানুষগুলো খুবই দীন প্রিয়। খোদাভীতি আর সহজসরল জীবনযাপনে অভ্যস্থ। আলেম ওলামাদের প্রতি অগাধ ভক্তি শ্রদ্ধা  আর মাদরাসা মসজিদের প্রতি মুহাব্বত বর্ণনাতীত। ছোট্ট এই দ্বীপে ২৫০ টির অধিক  মসজিদই প্রমাণ করে তাঁদের দীন প্রিয়তা।


দ্বীপের প্রত্যেকটি জায়গা দেখার মত। ফসল ভরা মাঠ, সবুজ প্রকৃতি, হাট, বাজার সঘঘব কিছু। দ্বীপের উত্তরে তাজমহলের আদলে নির্মিত শত বছরের পুরনো মরিয়ম বিবি সাহেবানী মসজিদ। মসজিদ সংলগ্ন বড় দিঘী। দ্বীপের দক্ষিনে ঐতিহ্যবাহী শুকনা দিঘী। এছাড়া রয়েছে অসংখ্য মসজিদ, মাদরাসা ও স্কুল।

তিন হাজার বছরের পুরোনো এই দ্বীপের রূপে মুগ্ধ হয়ে যুগে যুগে অনেক কবি, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক, পর্যটক এসেছেন এখানে। ১৩৪৫ খ্রিষ্টাব্দে ঐতিহাসিক পর্যটক ইবনে বতুতা ১৫৬৫ সালে ডেনিশ পর্যটক সিজার ফ্রেডরিক সন্দ্বীপে আসেন এবং এর বহু প্রাচীন নিদর্শনের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন। ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে জানুয়ারি সন্দ্বীপ ভ্রমণে  আসেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সন্দ্বীপ ভ্রমণের সময়কার স্মৃতির পটভূমিকাতেই কাজী নজরুল ইসলাম তার মধুবালা গীতিনাট্য রচনা করেন। সন্দ্বীপে বৃক্ষের ছায়াতলে বসে নজরুল তার চক্রবাক কাব্যগ্রন্থের অনেকগুলো কবিতা রচনা করেন।

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এখান থেকে বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফার প্রচারণা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেন। ১৯৭১ সালে এ উপজেলা ১নং সেক্টরের অধীন ছিল। ১০ মে পাকবাহিনী সন্দ্বীপের নিরীহ লোককে গুলি করে হত্যা করে এবং অনেক ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় ও লুটপাট করে। ৭ ডিসেম্বর সন্দ্বীপ শত্রুমুক্ত হয়।

খুব চমৎকার, উপভোগ্য ও  অপার সৌন্দর্যে মণ্ডিত দ্বীপকন্যা খ্যাত সন্দ্বীপ মহান আল্লাহর এক অনন্য নিদর্শন।  চারপাশে সুবিশাল সাগরের মাঝে একটি দ্বীপকে আল্লাহ তার বিশেষ অনুগ্রহে মানব জাতির জন্য বসবাস উপযোগী করে দিয়েছেন। 
আল্লাহর তাআলার বাণী: তোমরা তোমার পালনকর্তার কোন কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে?

লেখক : মুহাদ্দিস, হাটহাজারী মাদরাসা চট্টগ্রাম এবং কেন্দ্রীয় সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক,হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ৷

জাগো প্রহরী/এফ আর

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য