যুগে যুগে মহামারির একটুকরো ইতিহাস


আইনুল হক কাসিমী ৷৷


৮২৭ হিজরি। 
মক্কা মোকাররমায় মহামারি দেখা দেয়। মহামারি এতবেশি মারাত্মক ছিল যে, রোজ কমপক্ষে ৪০ জন লোক মারা যেত। শুধুমাত্র সে বছর রবিউল আউয়াল মাসের মৃত লোকদের হিসেব করে দেখা গেল, একহাজার সাতশ! এমনকী অবস্থা এমন হয়ে গেল যে, মাকামে ইবরাহিমের নির্ধারিত শাফিয়ি মাজহাবের ইমাম সাহেব মাত্র দুইজন মুসল্লিকে নিয়ে নামাজ পড়তেন! আরও আশ্চর্যের ব্যাপার যে, অন্যান্য মাজহাবের ইমাম সাহেবগণ জামাতে নামাজ বাতিল করে দিয়েছিলেন। মুসল্লি না থাকার কারণে। উল্লেখ্য, তখন প্রত্যেক মাজহাবের ইমামগণ আলাদা আলাদাভাবে মুসল্লি নিয়ে নামাজ পড়তেন।

৬৯৫ হিজরি। 
তিউনিসিয়ায় ব্যাপকহারে মহামারি দেখা দেয়। সাথে দুর্ভিক্ষ। জনজীবন এতোটাই বিপন্ন হয়ে পড়ে যে, মানুষের গায়ে বসন দেখা যেত না। বাজারমূল্য চড়া হয়ে যায়। দ্রব্যমূল্য ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছিল। এমনকী খাবারদাবার কিছুই মিলত না। ধনী-দরিদ্র মিলে বেশিরভাগ মানুষই মারা যায়। ধনাঢ্য যারা বেঁচে ছিল, তারা কেউ মহামারি আক্রান্ত রোগীর শুশ্রূষা বা চিকিৎসা কিংবা কাফন-দাফন--এসবের কোনো একটায় ব্যস্ত ছিল। আর হায়, কায়রাওয়ানের মসজিদগুলো খালি হয়ে গিয়েছিল!

৪৪৮ হিজরি। 
আন্দালুসের সেভিলে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ ও মহামারি। সেভিলের বেশুমার লোক মারা যায় এ মহামারিতে। এমনকী সেভিলের মসজিদগুলোর দরজা তখনকার ওই সঙ্কটাবস্থায় বন্ধ থাকে! এই মহামারি কর্ডোভায় গিয়েও ছড়ায়। সেখানেও এতবেশি লোক মারা যায় এবং দুর্ভিক্ষপীড়িত হয় যে, তার আগে এমন অবস্থা আন্দালুসবাসী চোখেও দেখেনি! কর্ডোভার মসজিগুলোও তখন দীর্ঘদিন পর্যন্ত মুসল্লিশূন্য হয়ে পড়ে ছিল। সে বছরকে আন্দালুসে 'বড় দুর্ভিক্ষ'র বছর বলা হতো।

৪৪৯ হিজরি। 
মধ্য এশিয়ায় তখন মহামারির প্রকোপ বেশামাল আকার ধারণ করে। প্রায় দুই মিলিয়ন লোক মরে সাফ হয়ে যায়। আস্তে আস্তে মহামারি পশ্চিমদিকে ছড়াতে থাকে। এমনকী ইরাকের কাছাকাছি হয়ে যায়। সে বছরের জুমাদাল উখরায় মা ওয়ারাআন নাহর (বর্তমান উজবেকিস্তান ও তৎপার্শ্ববর্তী দেশসমূহ)-এর একদল বণিকের পক্ষ থেকে একটি চিঠি আসে। চিঠির ভাষ্য ছিল নিম্নরূপ--

মা ওয়ারাআন নাহর অঞ্চলে মারাত্মক মহামারি দেখা দিয়েছে। যার কারণে শুধুমাত্র একই দিনে সে অঞ্চলে ১৮ হাজার লোকের জানাযার খাটিয়া বহন করতে হয়েছে! তৎক্ষণে মারা যাওয়া লোকের সংখ্যা গিয়ে পৌঁছিয়েছিল এক কোটি, ছয়লাখ, পঞ্চাশ হাজারের কোঠায়! সে অঞ্চলের বাজারগুলো জনমানবশূন্য, রাস্তাঘাটগুলো পথিকশূন্য, ঘরের দরজাগুলোও বন্ধ। ব্যবসাবাণিজ্য ও পার্থিব সব কাজকাম  স্তব্ধ। দিনে ও রাতে জীবিত মানুষের আর কোনো কাজ নেই, শুধুমাত্র লাশের গোসল ও কাফন-দাফন করা। আর মসজিদগুলো খালি; কোনো মুসল্লি নেই। সেগুলোতে জুমা ও জামাত--কিছুই হচ্ছে না।

৭৪৯ হিজরি।
১৩৪৮ খ্রিষ্টাব্দ
মিসরে দেখা দেয় মহামারি। মহামারিটি পুরো ইউরোপ লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে এসে ছড়িয়েছিল মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোতে। ইউরোপে এই মহামারিকে 'আল-মাউতুল আসওয়াদ' বা 'ব্ল্যাক ডেথ' বলা হতো। ক্ষয়ক্ষতির দিক দিয়ে এটিই ছিল বিশ্বের ইতিহাসে দ্বিতীয় মহামারি। এর ইতিহাস খুব লম্বা, বড় করুণ, অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আজ থাক; আরেকদিন না হয় লিখব।

মিসরে ছড়ানো মহামারি দিনদিন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। লাশের সারি দীর্ঘ হতে থাকে। জনজীবন একেবারে বিপন্ন হয়ে যায়। মানুষের মাঝে আনন্দ-ফুর্তির কোনো ছিটেফোঁটাও বাকি থাকেনি। কোনো বর তার মাথায় পরেনি বিয়ের টুপর। তদ্রুপ কোনো কনে তার হাতে পরেনি মেহেদি। সাজানো হয়নি বাসর। মহামারির পুরো সময়টাতেই কেউ কোনো বিনোদন জমায়নি। শোনা যায়নি কোনো বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ।

কোনো মসজিদের মিনার থেকে শোনা যায়নি মুআজ্জিনের আজান। শুধুমাত্র দূর-সুদূরের একটি প্রসিদ্ধ মসজিদের মিনার হতে শোনা যেত আজানের ধ্বনি। আর কোথাও না। অবস্থার ভয়াবহতায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বেশিরভাগ মসজিদ। বেশিরভাগ খানকাহ। মুসল্লিদের অভাবে। দরবেশদের অনুপস্থিতিতে।

পুনশ্চ : এগুলো হলো প্রায় হাজার বছর আগের মহামারি সম্পর্কিত এক একটুকরো ইতিহাস। বর্তমানের করোনা-ভাইরাসবাহিত কোভিড-১৯ মহামারি যেন অতীতের এইসব টুকরো ইতিহাসের নতুন করে জানান দিচ্ছে। আর চিৎকার করে শিক্ষাগ্রহণ করতে বলছে!

পুনঃ পুনশ্চ : মহামারি আর দুর্ভিক্ষ যেন যমজ ভাই। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যখনই মহামারি দেখা দিয়েছে, তখনই দুর্ভিক্ষ আগমন করেছে। আজ প্রিয় বাংলাদেশ পুরোই অচল। বাজারঘাট সম্পূর্ণ উজাড়। জনজীবন বিপন্ন। যে অবস্থা হয়েছে, তাতে দুর্ভিক্ষ আসতে বেশিদিন বাকি নেই। ইতিমধ্যেই তা অনেকের দরজায় করাঘাত করে ফেলেছে! আল্লাহ মাফ করুন।

তথ্যসূত্র :
*ইনবাউল গুমর বিআবনাইল উমুর : ইবনে হাজার আসকালানি।
*আল-বায়ানুল মুগরিব ফি আখবারিল আন্দালুস ওয়াল মাগরিব : ইবনু আজারি মারাকেশি।
*তারিখুল ইসলাম ওয়া ওয়াফায়াতুল মাশাহির ওয়াল আ'লাম : ইমাম শামসুদ্দিন যাহাবি।
*আল-মুন্তাজাম ফি তারিখুল মুলুক ওয়াল উমাম : ইমাম ইবনুল জাওযি।
*সিয়ারু আ'লামিন নুবালা : ইমাম শামসুদ্দিন যাহাবি।
*আস-সুলুক লিমারিফাতি দুওয়ালিল মুলুক : ইমাম মাকরিজি রহ.।

লেখক : আলেম,গবেষক ও অনুবাদক

জাগো প্রহরী/এইচএইচ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ