বাঙ্গালীয়ানাকে ধারণ করতে না পারলে আমরা হেরে যাবো : শেখ ফজলুল করীম মারুফ


শেখ ফজলুল করীম মারুফ ৷৷

বাংলাদেশ ইসলামের উৎস ভূমি থেকে অনেক দুরে অবস্থিত। এমনকি বাংলাদেশই বিশ্বের একমাত্র মুসলিম প্রধান দেশ, মুসলিম দুনিয়ার সাথে যে ভৌগলিকভাবে বিচ্ছিন্ন। তারপরেও বাংলাদেশে ইসলামের বিস্তার হয়েছে অবিশ্বাস্যভাবে।

১৯০১ সালে বাংলায় মুসলমানের সংখ্যা উসমানী খেলাফতের অধিনে থাকা মুসলমানদের চেয়েও বেশি ছিলো। আরব দেশে তখন মাত্র ৪২ লাখ ৪৮ হাজার মানুষ।

ইসলামের ভৌগোলিক সীমানা থেকে বিচ্ছিন্ন এই ভূখন্ডে কি করে ইসলাম এতো বর্ধনশীল ও বিস্তৃত জনমানুষের ধর্মে পরিনত হলো?

এই সংক্রান্ত অনেক তত্ত্ব আছে। অন্তত পাঁচটি তত্ত্ব জনপ্রিয়। দীনেশচন্দ্র সেন একটি সমন্বিত কারণ উত্থাপিত করেছেন। "নৈতিকশক্তি লইয়া বিশ্বাসের খড়গহস্তে মুসলমান আসিয়াছে। সেই খড়গে আমাদের পরাজয় হইয়াছে। লৌহ বা ইস্পাতের খড়গে নহে।"

এই অঞ্চলে ইসলাম পীরদের দার্শনিকতা ও রাজনীতি দিয়ে জনমানুষকে জয় করেছে। পীর-দরবেশরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে মানুষকে তাওহীদের বানী শুনিয়েছেন। আর রাজনৈতিক সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ খন্ড-বিখন্ড সংঘাতপ্রবণ এই ভূখন্ডে একত্রিত করে বাংলা নাম নিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করেছেন।

পীর ও রাজনৈতিক এই জয় এতোটাই বিপুল বিশাল ছিলো যে, এই অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে ইসলাম একাকার হয়ে গিয়েছিলো। বঙ্কিমের মতো উগ্রলোকও বাংলার ইতিহাস থেকে মুসলমানদের আলাদা করার কোন উপায় খুজে পায় নাই।

তিনি "বাঙ্গলার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা" প্রবন্ধে আক্ষেপ করে লিখেছেন,
আমাদিগের বিবেচনায়, একখানি ইংরেজি গ্রন্থেও বাঙ্গলার প্রকৃত ইতিহাস নাই। সে সকলে যদি কিছু থাকে তবে সে মুসলমান বাঙ্গলার বাদশাহদের গল্প।"

বঙ্কিম বাবু অবশ্য এখানে বাংলার মানুষের কথা চেঁপে গিয়েছেন। যা তিনি "বিবিধ প্রবন্ধে" বলে ফেলেছেন। "এখন তা দেখিতে পাই, বাঙ্গলার অর্ধেক লোক মুসলমান। দেশীয় লোকেরা যে স্বধর্ম ত্যাগ করিয়া মুসলমান হইয়াছে ইহাই সিদ্ধ।"

বাংলা ও ইসলামের এই একাকার হয়ে যাওয়াকে আঠারো শতকে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের আশীর্বাদে শিক্ষিত হয়ে ওঠা উচ্চবর্নের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বদলে দিয়েছেন। তারা শ্রেণী ও জাতস্বার্থ রক্ষায় সময়ের ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্যুত, খন্ডিত ও পক্ষপাতমূলক ইতিহাস লেখা শুরু করলেন। তারা সকল বাস্তবতাকে বাদ দিয়ে হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদের উপযোগী করে বিগত শত শত বছরের মুসলিম শাসনামল ও দেশের অর্ধেক মানুষকে বাদ মনের মাধুর্য মিশিয়ে একখানা মিথ্যা ইতিহাস রচনা করলেন। এবং পুর্ববাংলায় জমিদারি করে পাওয়া টাকায় কলিকাতায় গড়ে তুললেন কৃত্রিম বাবু কালচার। যার পরিশীলিত রুপ হলো, শান্তিনিকেতনি কালচার।

হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের হাতে রচিত এই ইতিহাস পড়লে মনে হবে, আচমকা আঠারো শতকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি আসমান থেকে নেমে এসেছে। এর আগে এর কোন অস্তিত্ব ছিলো না। কোন কোন পণ্ডিত যদিওবা খোজ খবর করেছেন তারাও টাইম মেশিনে চড়ে ইতিহাসের চার-পাঁচশত বছর চোখের পলকে এড়িয়ে গিয়ে একেবারে সেন-পাল আমলে পড়েছেন।

আজ অবধি এই খন্ডিত, ধারাবাহিকতা বিচ্যুত ও পক্ষপাতমূলক ইতিহাস চলছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও তাই পড়ানো হয়।

তবে ইদানিং কিছু কাজ শুরু হয়েছে। ড. আকবর আলী খান,  রিচার্ড ইটনসহ আরো কিছু সত্যান্বেষী গবেষক ইতিহাসের সেইসব এড়িয়ে যাওয়া সময়গুলো তুলে আনছেন। সত্য চাঁপা থাকে না। ইনশাআল্লাহ এই ইতিহাসও চাঁপা থাকবে না।

বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের সাথে ইসলামের যে ওতপ্রোত সম্পর্কে তা সামনে আসছে।

কিন্তু আমার কষ্টের জায়গাটা হলো, এদেশের ইসলামপন্থীদের অবস্থা। জানি না বিশ্বের আর কোথাও দেশ, জাতি, জাতির ইতিহাস, ঐহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে এতো বিপুল-বিশাল মুর্খতা নিয়ে কেউ বিপ্লব বিপ্লব তামাশা করে কিনা।

বঙ্কিমের অনুসারীরা মিথ্যা ইতিহাস রচনা করে দাবী করছে যে, বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য কেবলই হিন্দুদের। তারা সত্যকে বিকৃত করে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের পক্ষে বলে হুক্কাহুয়া চিৎকার করছে। আর এদেশের ইসলামপন্থীরাও সেই হুক্কাহুয়ার শোরগোলে তাল মিলিয়ে বলছে, বাংলা ভাষা হিন্দুয়ানী, বাংলা সাহিত্য নাস্তিক্যবাদী, বাংলার সংস্কৃতি হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি। বাংলার ইতিহাস, ঐহিত্য হিন্দুত্ববাদী।

এর চেয়ে হতাশার ও কষ্টের আর কি হতে পারে? সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, বঙ্কিমচন্দ্র একই সাথে হিন্দুত্ববাদী ও ইসলামপন্থীদের তাত্ত্বিক গুরু হয়ে গেলো। উভয় পক্ষই তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রনোদিত মিথ্যা ইতিহাসকে বিশ্বাস করছে।

এদেশের মাদ্রাসাগুলোর অবস্থা কতটা খারাপ হলে সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভীকে সেউ উত্তর ভারত থেকে এসে বাংলাভাষাকে আপন করে নেযার নসিহত করতে হয়?

বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, বাংলার ইতিহাস ও ঐহিত্যে নিজেদের যে সত্য ও ঐতিহাসিক হিস্যা আছে তাকে খুজে বের করে জোড়ালোভাবে তার মালিকানা দাবী করতে না পারলে বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের কোন ভবিষ্যত নাই।

যদি ইসলামপন্থীরা বঙ্কিমীয় চেতনায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্যের সাথে নিজের সম্পর্কহীনতা মেনে নেয় তাহলে ইসলামী দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন এই ভুখন্ডে ইসলামের যৌক্তিক কোন হিস্যা থাকে না।

কারণ এই যুগে এসে মানুষ তাদের হাজার বছরের হিন্দুয়ানী ইতিহাস, ঐতিহ্যের (বঙ্কিমীয় চেতনামতে) বিপরিতে এসে ইসলামকে আচারে আচরনে, সংস্কৃতিতে ও শাসনে মেনে নেয়ার কোন যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।

আর যদি সত্য ইতিহাস সামনে এনে বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্যের সাথে ইসলামের একাকার হয়ে যাওয়ার সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে বাংলার সংস্কৃতিকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষার দাবী সামনে আনা যায় তাহলে বাংলায় ইসলামের বিজয়ও কেউ আটকে রাখতে পারবে না। ইনশাআল্লাহ।

এখানে প্রসঙ্গত মনে করিয়ে দিতে চাই যে, বর্তমান যুগ হলো সভ্যতার সংঘাতের যুগ। যার প্রধানতম মুলনীতি হলো, আত্মপরিচয়ের সংকট। এই সংকটে মানুষ দুই ধরনের শেকড়ে ফিরে যাচ্ছে। তার নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ও তার ধর্মীয় পরিচয়। যেমন চীনারা তাদের হান জাতীয়তাবাদ ও কনফুসিয়াসিজমে ফিরে গেছে।

এই সংকটে বাঙ্গালীরাও তাদের আত্মপরিচয় খুঁজছে। যদি বাঙ্গালীয়ানা ও ইসলামকে একটি একক আত্মপরিচয়ের উৎস হিসেবে উপস্থাপন করা যায় তাহলে মানুষ একটি শক্ত ও জীবনঘনিষ্ঠ আত্মপরিচয় পাবে। আর এই মুহুর্তে যদি কচক্রীরা বাঙ্গালীয়ানা ও ইসলামকে পরস্পর সাংঘর্ষিক আত্মপরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয় তাহলে বিশাল একটি অংশ বাঙ্গালীয়ানাকেই আঁকড়ে ধরবে। ইসলামকে এড়িয়ে যাবে।

এই বাস্তবতা যদি ইসলামপন্থীরা না বোঝে তাহলে জাতীর কপালে ভোগান্তি আছে।

তাই দেশের সকল ইসলামপন্থীদের প্রতি বিনীত আবেদন করবো, দয়া করে বাংলার ইতিহাস সম্পর্কে একটু পড়াশোনা করুন। অন্তত আকবর আলী খান, ইটন, মুইন উদ্দিন আহমেদ খান স্যারের লেখাগুলো পড়ুন। তখন আপনিই বুঝতে পারবেন আপনার সম্পদ কি করে লুটেরা জবরদখল করে বসে আছে। তখন আপনিই লজ্জিত হবেন যে, কি করে নিজের বাপ-দাদার এই অমূল্য সম্পদকে শত্রুর হাতে তুলে বসেছিলেন।

এবং দয়া করে আপনাদের কথায়, কর্মসূচিতে, আচরনে বাঙ্গালীয়ানাকে প্রকাশ করুন। একটু বেশি করেই করুন। বহুদিন অন্যের ঘরে থাকার কারণে বাঙ্গালীয়ানাকে এখন অনেকে শ্রী পাড়ার বলে মনে করে। আপনি যদি একে বেশি বেশি প্রকাশ করে মানুষকে বুঝাতে হবে যে, বাঙ্গালীয়ানা আদতে মুহাম্মাদী পাড়ার।

বাঙ্গালীর উৎসবগুলোকে আপনারা নিজেদের করে নেন। সংস্কৃতিতে যে বিকৃতিগুলো ওরা যোগ করেছে তা বাদ দিয়ে আপনার করে নিন। ঘটা করে ওসব উৎযাপন করুন। তাহলেই আত্মপরিচয়ের সংকটের এই কালে বাঙ্গালী মুসলমানরা ইতিহাস, ঐতিহ্য সমৃদ্ধ একটি গৌরবময় আত্মপরিচয় খুঁজে পাবে। ইনশাআল্লাহ।

#জয়তু_বিপ্লব।

লেখক : আলেম,গবেষক ও সমাজ বিশ্লেষক

জাগো প্রহরী/গালিব


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ