সময়ের আয়নায় তুরস্কের রাজনৈতিক পলিসির গভীরতা : মুসা আল হাফিজ


মুসা আল হাফিজ ৷৷

এক।

তুরস্কের পলিসির গভীরতা নিয়ে যারা সন্দিহান ছিলেন,তাদের অন্যতম এক বুদ্ধিজীবী ইহাব হাসান (১৯২৫-২০১৫) । ইহাব বলতে চেয়েছিলেন,তুরস্কে সফটপাওয়ার অনুপস্থিত। তার অনুমান ছিলো ভুল।
সফট পাওয়ারই এরদোয়ানের তুরস্কের প্রধান পাওয়ার। যেখানে কুটনীতি ও সংস্কৃতি কাজ করছে প্রবলভাবে। আজকের বিশ্বে তুরস্কের কুটনীতি বার বার তার শক্তি দেখিয়েছে। এই যে করোনা পরিস্থিতি, এখানে তুরস্ক সফটপাওয়ারের সামর্থ প্রমাণ করছে আরেকবার। চিকিৎসা সহায়তা কুটনীতিতে তুরস্ক এখন দুনিয়াময় নিজেকে বিস্তৃত করছে। ৩২ দেশে সরাসরি চলছে তুর্কি চিকিৎসা সহায়তা, অপেক্ষায় আছে আরো ৫৮ টি দেশ।আমেরিকা তুরস্কের কাছে আবদার করছে করোনা কীট। তুরস্ক থেকে কীটসহ জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী  নিচ্ছে ব্রিটেন- স্পেন।

যে ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের চিকিৎসা ও মানবীয় সেবার পথ রুদ্ধ করে রেখেছে,  সেই ইসরাইলকে চিকিৎসা সহায়তার বিনিময়ে সম্মত করেছে তুরস্ক; যেন  ফিলিস্তিনে চিকিৎসা সহায়তা প্রদানে সে কোনো বাঁধার সৃষ্টি না করে!

সবাই সবার দিকে তাকাচ্ছে কম বেশি।ফিলিস্তিনের দিকে তাকানোর কেউ ছিলো না। এরদোয়ান ফিলিস্তিনের বিপন্ন মানুষের সুরক্ষায় ইসরাইলের সাথে কীটের কুটনীতির মাধ্যমে যে সফটপাওয়ার প্রয়োগ করলেন, সে চারিত্রের  অনুপস্থিতিকে ইহাব সবচে' বড় দুর্বলতা মনে করেন তাদের জন্য,যারা বিশ্বশক্তি হতে চায়!

ইহাবের সাথে এ জায়গায় আমি অনেকটা একমত। কিন্তু তিনি যখন বলেন,তুরস্কের এ মানসিকতা নেই; তখন ইহাবের সাথে ভিন্নমত জরুরি হয়ে উঠে। তিনি কেন? ফুকুয়ামা,  হান্টিংটন কিংবা হিরসা আলীও তো  বলেছিলেন, ইসলামপছন্দ নেতৃত্ব সফটপাওয়ার ধারণ করতে পারে না। এরদোয়ানের তুরস্ক এ থিউরিকে ভুল বানিয়ে ছেড়েছে।

দুই।

একটু পেছনে নজর দিন।২০১০ সাল। তুরস্কের একটি ত্রাণবাহী জাহাজ বহর গাজায় যাচ্ছিলো। যে গাজাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইসরাইল। গাজার মানুষ মরবে, শুধু খবর শুনতে পারবেন, কোনো সহায়তা কেউ করতে পারবেন না। সারা দুনিয়া একে মেনে নিচ্ছে। আরব লীগ,ওআইসি, সৌদী- ইরান সকলেই!

অবরোধকে উপেক্ষা করলো তুর্কি জাহাজবহর। ইসরাইল চালালো কমান্ডো অভিযান। প্রাণ হারালেন ১০ ত্রাণকর্মী। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ইসরাইলকে শাস্তি দেয়ার ঘোষণা দিলেন। আইনী পথে তুরস্ক ইসরাইলকে চাপে ফেলতে থাকে। সাবেক কমাণ্ডারদের বিরুদ্ধে চলতে থাকে আইনী পদক্ষেপ। কুটনৈতিকভাবে অবৈধ রাষ্ট্রটাকে কোণঠাসা করতে প্রয়াসী হয়। প্রায় তিনটি বছর ধরে বিশ্বসভায় তুরস্ক অব্যাহতভাবে ইসরাইলকে আক্রমণ করতে থাকে। নিজের অন্যান্য ইস্যুকে কম ফোকাস করে গাজা ইস্যুকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

শুধু সামরিক হামলা ছাড়া সব পথেই বুদ্ধিদীপ্ত ও শক্তিমান আক্রমণের মুখোমুখি হচ্ছিলো ইসরাইল।
ক্ষতিটা তার হয়ে চলছিলো বিস্তর।

২০১৩ সাল। এগিয়ে আসে আমেরিকা। তুরস্কের প্রয়োজন ছিলো আমেরিকার কিছু সহায়তা। আমেরিকা অনুরোধ করে ইসরাইলের সাথে সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে।আমেরিকার মধ্যস্থতায় উভয় রাষ্ট্রের বৈঠক হয়। ইসরাইল ক্ষমা প্রার্থনা করে, হতাহতের পরিবারগুলোকে দেয় ক্ষতিপূরণ।

তুরস্ক বলে, মারমারা ইস্যু এতে থামলো। কিন্তু গাজার জন্য আমাদের মানবিক দায়বদ্ধতা কোনোভাবেই আমরা ভুলে যাচ্ছি না!

তিন।

ফিলিস্তিনকে তুরস্ক ভুলে যায়নি, এরদোয়ান এর প্রমাণ রেখেছেন যথাসাধ্য।  করোনায় চিকিৎসা সহায়তার বিনিময়ে তুরস্ক যে গাজায় ত্রাণ ও চিকিৎসা নিয়ে ঢুকতে চাইলো এবং প্রবেশ নিশ্চিত করলো,এটির জন্য আমেরিকা বা ইসরাইল মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। পশ্চিমা মিডিয়াগুলো এখন স্মরণ করছে,২০১০ সালে এরদোয়ান বলেছিলেন,শাস্তি দেবেন ইসরাইলকে।
যে গাজা নিয়ে কথাটা বলেছিলেন, সেই গাজাতে তুরস্কের এ প্রত্যাবর্তনকে তাই সহজে মেনে নিতে পারছে না পশ্চিমা থিংক ট্যাংকগুলো। তারা এখানে মানবিক দিকের বদলে রাজনৈতিক আধিপত্য ও কুটনৈতিক গেইমকে সামনে আনছে। যেন ফিলিস্তিনের মানুষের জন্য কিছু করার দায়বদ্ধতার মধ্যে মানবিকতা থাকতে পারে না। তাদেরকে অচিকিৎসায় মরতে দেয়াটাই মানবিকতা!

ওয়ারসোভিত্তিক পররাষ্ট্র বিষয়ক পোলিস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ক্যারোল ওয়াসিলোস্কির বক্তব্য প্রচার করেছে ব্লুমবার্গ। তিনি তুরস্কের  মানবিক দিককে হেয় করে রাজনৈতিক দিককে সামনে আনলেন। বললেন, চিকিৎসা ও ত্রাণ  সহায়তার মধ্য দিয়ে তুরস্ক আসলে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের খেলা খেলছে। বুঝাই যাচ্ছে, ইসরাইল চড় খেলে সেটা পশ্চিমাদের গালে লাগে,কথাটা মিথ্যে নয়।

ক্যারল ওয়াসিলোস্কি আমতা আমতা করে বলেছেন,বিশ্বরাজনীতিতে ফিলিস্তিনের প্রধান এক সমর্থক তুরস্ক। কাজে কাজেই সে ফিলিস্তিনকে সহায়তা করবে,এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু ইসরাইল কেন তুরস্কের গাজায় প্রবেশে রাজী?

ওয়াসিলোস্কি সেখানে দেখেন মানবিক দিক। ' যেহেতু গাজায় করোনা ছড়িয়ে পড়লে ইসরাইল মানবিককারণেই বিচলিত হবে, অতএব তুরস্কের সহায়তায় ইসরাইলের এ সম্মতির পেছনে ' বাস্তব কারণ' রয়েছে।
বুদ্ধিজীবিতার কী ছিরি!

চার।

কিন্তু কষ্ট শুধু পশ্চিমারা পায়নি। অনেক বেশি পেয়ে যায় আরব শেখতন্ত্রের দুম্বা- খাশিরা।

তুর্কি- ইসরাইল চুক্তির বিষয়টা সামনে এলে হৈ হৈ রৈ রৈ শুরু হয়ে যায় সৌদী,আমিরাতি,মিসরিয়  বিবিধ প্রচারপত্রে। ভাবখানা এমন যে, এরদোয়ানের আসল রূপ ধরা পড়েছে,তিনি  ইসরাইলের কেনা গোলাম!
ইসরাইলের যারা চিহ্নিত গোলাম, তারা কেন এ চুক্তিতে এমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে?

কারণ পরিষ্কার। ইসরাইলের সাথে তাদের সম্পর্কে কোনো নৈতিকতা নেই। ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে তারা অপরাধমূলক সহযোগিতা জারি রেখেছে ইসরাইলের সাথে। জায়নবাদের সাজানো ছকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে চালিত করছে।নিজেদের  লাগাম তারা তুলে দিয়েছে আমেরিকা- ইসরাইলের হাতে। ইসলামী চেতনাবোধের জাগরণের প্রতিটি প্রয়াসকে নস্যাৎ করতে যে কোন  হীনপন্থা অবলম্বনে কসুর করছে না মোটেও।

ফলে তারা নিজেদের জনতার কাছে অপরাধী এবং গণশক্রু হিসেবে চিহ্নিত। অপরদিকে এরদোয়ানের মর্যাদাসম্পন্ন  মুসলিম জাতিচেতনা এবং ইসলামপছন্দ রাজনীতি আরববিশ্বে ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যে শক্তির উত্থান কামনা করে তুরস্ক,সেই শক্তি ক্রমেই বিস্তার পাচ্ছে। যা শাসকদের জন্য এক প্রত্যক্ষ চ্যালেঞ্জ। ফলে এরদোয়ান আর নিছক তুরস্কের ব্যাপার থাকেন না,হয়ে উঠেন বেশিরভাগ আরব রাষ্ট্রের নিজস্ব সমস্যা। এতএব তাকে হেয় করার এবং হীন করার সকল প্রচেষ্টা আরব শাসকশ্রেণির নিজস্ব এজেন্ডার অংশ হয়ে উঠেছে।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রশ্ন,যেখানে সৌদী,আরব আমিরাত ও মিসরের শাসকবর্গের স্বার্থ ইসরাইলী স্বার্থের সাথে হাত ধরাধরি করে তুরস্কের বিরুদ্ধে লড়ছে!

লেখক : আলেম,গবেষক ও কবি

জাগো প্রহরী/ফাইয়াজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ