কেমন হবে মুসলিম উম্মাহর জন্য আগামীর চীন ?


মুসা আল হাফিজ:

আমার সাথে একমত হবার দরকার নেই। কিন্তু খুব সম্ভব, যেটা দেখতে যাচ্ছি৷ সেটা হলো, দুনিয়ার রাজনীতি - অর্থনীতি, শক্তিবাজীর নাটাই বেইজিংগের দিকে হেলে গেছে। মানে চীনা স্বার্থকে অনেক বেশি ভয় করবে এবং তার অভিপ্রায়কে আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দেবে আমেরিকা,ইউরোপ,এমনকি রাশিয়া।

(মাঝে মধ্যে তাদের মধ্যে কিছু তর্জন-গর্জন হলে ভাবার কিছু নেই যে, তারা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করে দেবে। দেশীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতির খেলায় এবং নিজেদের সুবিধার বুঝাপড়ায় কিছু ঝগড়াঝাঁটি তো চলবেই। একটি সংসারেও ঝগড়া হয়।)

মুসলিম দুনিয়ার জন্য মুশকিল হলো, চীন এমন প্রতিপক্ষ, যার সাথে লড়াই পশ্চিমা দুনিয়ার চেয়ে অনেক জটিল।পশ্চিমারা চীনের চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত শত্রু। মানে তার চিন্তা,চেতনা,সংস্কৃতি,কৃৎকৌশল এবং যুদ্ধপ্রণালি অনেকটাই পরিচিত। তার সাথে মিথস্ক্রিয়া এবং লড়াইয়ের দেড় হাজার বছরের ইতিহাস আছে। যেখানে মুসলিম জাহান কখনো তার শিক্ষকের এবং প্রভাবকের জায়গায় থেকেছে ৷ আবার কখনো শাসিত হয়েছে তার দ্বারা সরাসরি। যুদ্ধের ধারাটাও মারা ও মার খাওয়ার বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ।

কিন্তু চীন এমন এক শত্রু,যার সাথে লড়াই ও মিথস্ক্রিয়ার জাতিগত অভিজ্ঞতা মুসলিম জাহানের কম। প্রস্তুতিও নেই বললেই চলে। তার চরিত্র আলাদা,সংস্কৃতি আলাদা,ইতিহাস আলাদা, মারের মাত্রাও ভিন্ন। আপাতত চীন দুনিয়াকে নিয়ে গেলো জীবাণু মারণাস্ত্রের নতুন যুগে। পারমাণবিক অস্ত্র এখন আর শেষ কথা নয়। নতুন যুগের দরজা খুলেছে চীন।
আমি মনে করি, মুসলিম উম্মাহর  ঘোরতর লড়াইটা চীনের বিপরীতে অনিবার্য। এ লড়াই হবে অনেক দীর্ঘস্থায়ী, অনেক ব্যাপকতর।  আওয়াজ  শুনা যাচ্ছে, কিয়ামত এলো বলে, কিয়ামতের আগের সব কিছু দুইয়ে দুইয়ে চারের মতো আজকের বাস্তবতার সাথে মেলানো হচ্ছে আর অপেক্ষা করা হচ্ছে আকাশ থেকে ঈসা মসীহ আ. আজ না আগামীকাল নেমে আসবেন, এটা হয়। এমনটা হয়েছে তাতারিদের হামলার কালেও। মোঙ্গলদের ইয়াজুজ-মাজুজ বলেও প্রচার করা হয়েছিলো। কিন্তু এসব প্রচারের উপর ভর করে বসে থাকার বদলে উচিত হলো,আজকের লড়াইটা লড়া আর আগামীর জন্য তৈরি হওয়া।

এই যে দেখছেন, ভারতের সাথে চীনের বিরোধ, এটা মিটে যাবে। ইউরোপ- আমেরিকাও বিশ্ব থেকে নিজেদের আধিপত্য গুটিয়ে নিতে থাকবে ধীরে ধীরে, ট্রাম্প যা ইতোমধ্যে করে চলছেন৷ চীনের সাথে তারা চলবে বুঝাপড়ার ভিত্তিতে। একের সংস্কৃতি অপরকে বিব্রত করলেও একটি কমন শত্রুর বিরুদ্ধে তাদের ঐক্য ক্রমেই বলীয়ান হতে থাকবে। অনুঘটকের কাজ করবে ইহুদিবাদ। আর বলাই বাহুল্য,সেই কমন শক্র হচ্ছে ইসলাম।

প্রশ্ন আসছে,ইউরোপ - আমেরিকা কি সহজেই মসনদ ছেড়ে দেবে? 

কেউই সহজে মসনদ ছেড়ে দেয় না। পশ্চিমারা নিজেদের শক্তি ধরে রাখার জন্যই নিজেদের একাধিপত্যের অভিপ্রায় থেকে পিছু হটবে।  একাধিপত্য না থাকা মানে একাধিক শক্তির আধিপত্য থাকা। চীনের আধিপত্য থাকবে,থাকবে পশ্চিমাদেরও।  তবে চীন ক্রমে ক্রমে আরো সামনে চলে আসবে। যা না মানলে পশ্চিমাদের সরাসরি যুদ্ধ করতে হবে। যুদ্ধের প্রসঙ্গ এলে চীন- রাশিয়ার ঐক্য নিশ্চিত।উভয়ের মোকাবেলা তারা করতে চাইলে নিজেরা বাঁচবে না,দুনিয়াও বধ্যভূমি হবে। এ রকম একটা যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করেও গোটা দুনিয়াকে কীভাবে বিপন্ন করা যায়,সেই পদ্ধতিটা  জীবাণু অস্ত্র। এবং এর শক্তিতে চীন কতটা শক্তিমান, তা বুঝে গেছে পশ্চিমারা। অতএব নিজেদের বাঁচাতে হবে এবং শক্তিও ধরে রাখতে হবে। এটা করতে হলে একটা ছাড় দিতে হবে। এ ছাড়া উপায় নেই। পশ্চিমারা বাধ্য হয়েই একাধিপত্যের অভিপ্রায় থেকে সরে আসবে,  চীনকে ছাড় দেবে নিজেদের ভয়াবহ  কোনো ক্ষতি হতে না দিয়ে।

প্রশ্ন এসেছে,মধ্যপ্রাচ্যে পরিবর্তনটা কেমন হবে? এর বহিঃপ্রকাশ কীভাবে বুঝা যাবে?

কোনো পরিবর্তনই আগামীকাল থেকে দেখা শুরু হবে,তা নয়। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলী এজেন্ডা চীনা স্বার্থের সাথে হাত ধরাধরি করে এগুবে। বিশ্বের শক্তিকেন্দ্রের নতুন মেরুকরণে ইসরাইল নিজের সুবিধাটুকু অক্ষুণ্ণ রাখতে কসুর করবে না মোটেও। যেহেতু নতুন শক্তিকেন্দ্র প্রত্যক্ষ যুদ্ধের মাধ্যমে নয়,বরং পারস্পরিক বুঝাপড়ার মাধ্যমে বিকশিত হচ্ছে, অতএব বড় ধরণের কোনো পরিবর্তন সহসা চোখে পড়বে না। কিন্তু দুনিয়া যে আর আগের জায়গায় নেই, সেটা ক্রমে ক্রমে অর্থনীতি,বিশ্বরাজনীতি,সংস্কৃতি ইত্যাদির চক্রে নিরন্তর লক্ষ্য করবে সবাই।


 লেখক: মুসা আল হাফিজ
কবি, লেখক ও গবেষক 



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য