শাইখুল হাদীস রহ. কে নিয়ে আমাদের তারাবিহ পড়ার স্মৃতি


মুহাম্মদ এহসানুল হক ৷৷

তখন সবেমাত্র হেফজ শেষ করেছি। মসজিদে তারাবিহ পড়ানোর বয়স হয়নি। আমাদের বাসায় তখন তারাবিহ এর বেশ বড় একটা জামাত হতো। একান্তই পারিবারিক আয়োজন। জামাতের নেগরানী করতেন আমাদের বড় খালু অধ্যাপক মাওলানা গিয়াসুদ্দীন আহমদ।পরিারের বড়দের সাথে নবীন হাফেজদেরও সেখানে তারাবিহ পড়াতো। হাফেজ হওয়ার পর আমারও পড়ানোর পালা আসলো। 

আমি আর আমার এক খালাতো ভাই নামাজ পড়াতাম। পড়ানোর নিয়ম ছিল অনেক কঠিন। সম্পূর্ণ পারা ভালোভাবে ইয়াদ করে অন্য কাউকে শুনিয়ে তারপর নামাজে দাঁড়াতে হতো। এশার জামাতের পর খালুজি লটারি করতেন। লটারির মাধ্যমে নির্ধারিত হতো কে আগে পড়াবে আর কে পরে। শুধু নিজের অংশটুকু ইয়াদ করার কল্পনাও করা যেত না। 

নানাজান শাইখুল হাদীস রহ. তখন মসজিদেই তারাবিহ পড়তেন। শুধু খতমের দিন আসতেন বাসায়। আমাদের সাথে নামাজ পড়তেন। প্রথম যেদিন নানাজীকে নামাজ পড়াই সেদিনের কথা মনে পড়ে। আমি অনেক ভয় পেয়েছিলাম। কত রকমের চিন্তা! নানাজী কী আমার পড়া পছন্দ করবেন! যদি ভুল হয় তাহলে কী হবে! এত ভয় লাগা সত্বেও ফাঁকি দেয়ার কোন উপায় ছিল না। পড়াতেই হবে। সাহস করে নামাজে দাঁড়ালাম।

তখন হেফজখানার ছাত্র আমি। তিলাওয়াত এখনকার চেয়ে ভালো ছিল। আমার পড়ার ধরণ ছিল- আমি মসজিদের মতো দ্রুত পড়তাম না। একটু ধীরে উচ্চস্বরে পড়তাম। আল্লাহর উপর ভরসা করে দুই রাকাত পড়ানো শেষ করলাম। সালাম ফিরাতেই কানে আসলো, নানাজী অন্যদের বলছেন, কিরে ও দেখি বেশ সুন্দর পড়াইলো, তারাবি পড়াইলে এমনেই পড়ানো দরকার। 

নানাজির পাশেই ছিলেন আব্বা । মনে হলো তিনিও খুব খুশি হলেন। পরের দু‘রাকাত শুরু করার জন্য অভ্যাসবশত পাঞ্জাবির হাতাটা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে যেই নিয়ত বাঁধতে গেলাম, পিছন থেকে নানাজী ধমক দিয়ে উঠলেন- কিরে আস্তিন নামাবি না! কথাগুলো এখনো আমার কানে বাজে! 

রমজানের স্মৃতি মনে করলে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে আমাদের তারাবিহ খতমের কথা। খতমের দিন আমাদের বাসায় নানাজিকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠান হতো। প্রথম পর্যায়ে শুধু খতমে তারাবির অনুষ্ঠান থাকলেও পরবর্তীতে সেটা আরও বড় হয়ে শাইখুল হাদীস ফ্যামেলির পারিবারিক দস্তারবন্দি সম্মেলনে পরিণত হয়েছিল। 

২০০৩ সালে পল্টন ময়দানে শাইখুল হাদীস রহ. বুখারি শরিফের দরস প্রদানের ৫০ বছর পূর্তি সম্মেলন হয়েছিল। ঐ বছরই লোকচক্ষুর আড়ালে বাসায় অনুষ্ঠিত হয় আরেক দস্তারবন্দি সম্মেলন। সে বছর আমাদের পরিবারের ছেলে মেয়েদের মধ্যে প্রায় ৫০জন হাফেজ/হাফেজাকে পাগড়ি/খেমার প্রদান করা হয়। গত সতের বছরে হাফেজের সংখ্যা একশত ছাড়িয়ে গেছে। আলহামদুলিল্লাহ। ছেলেদের মধ্যে কেউ হাফেজ হলে তাকে দেওয়া হতো পাগড়ি আর মেয়েদের মধ্যে কেউ হাফেজা হলে তাকে দেওয়া হতো খেমার বা ওড়না। 

মাওলানা মামুনুল হক এর উপস্থাপনায় দারুন এক আয়োজন হতো। শায়েখের শানে নিবেদিত সঈীত পরিবেশন করতেন আমার বড় ভাই মাওলানা এনামুল হক। সঙ্গ থাকতাম আনিস ভাই, আরিফ, আমি ওয়াসিফ। প্রতি বছর শাইখুল হাদীস রহ. এর শানে একটি নতুন নতুন গজল পরিবেশন করা হতো। সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতো নানাজীর শানে রচিত এই সঙ্গীত। 

আমাদের পরিবারের সব আত্মীয়স্বজন এক সাথে হতাম। সব নাতি-পুতিদের মিলনমেলায় শাইখুল হাদীস রহ. কী পরিমাণ খুশি হতেন, তা ভাষায় ব্যক্ত করার মতো না। আনন্দে যেন আত্মহারা হয়ে যেতেন। পরম তৃপ্তিতে কুরআনের একটি সুসংবাদ আমাদেরকে শোনাতেন। ‘আলহাকনাবিহিম যুররিইয়াতাহুম ওয়ামা আলাতনাহুম মিন আমালিহিম মিন শাই’ জান্নাতে তার সাথে তার পরিবারকে মিলিয়ে দেওয়া হবে। তিনি আশা ব্যক্ত করে বলতেন, ইনশাআল্লাহ কেয়ামতের দিন আমি হাফেজদের মিছিল নিয়ে জান্নাতে ঢুকবো। 

পরিবারের উদ্দেশে তিনি বিশেষ নসিহত করতেন। এরপর লম্বা দোয়ার মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হতো। সেই অনুষ্ঠান আমাদের কাছে ঈদের চেয়ে বেশি আনন্দের ছিল। শাইখুল হাদীস রহ. দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পরও আমাদের এই অনুষ্ঠান অব্যাহত আছে। মাওলানা মামুনুল হক এর পরিচালনায় মূল বক্তব্য রাখেন মাওলানা মাহফুজুল হক। পরিবারের অন্যান্য মুরুব্বিগণও কথা বলেন। মধ্যমণি হিসেবে গত বছরও ছিলেন আমাদের নানীজান। এবার তিনিও নেই। এভাবেই একদিন সব শেষ হয়ে যাবে... 

লেখক : সহকারী সম্পাদক,মাসিক রাহমানী পয়গাম

জাগো প্রহরী/এফআর



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য